ম্মু ও কাশ্মীরের উঁচু পার্বত্য এলাকাগুলি সমতলের তুলনায় অনেক দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। গত দু’দশকে গুলমার্গ, পহেলগাম ও ভদেরওয়ার মতো কয়েকটি অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠান, খড়্গপুরের এক নতুন গবেষণায় উঠে আসা এই প্রবণতাকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের আশঙ্কা, উষ্ণায়নের এই গতি অব্যাহত থাকলে হিমবাহ ও মৌসুমি তুষার দ্রুত গলবে, নদীতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়বে এবং কৃষি, পানীয় জল, জলবিদ্যুৎ ও শীতকালীন পর্যটনের উপরে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।

খড়্গপুর আইআইটির সমুদ্র, নদী, বায়ুমণ্ডল ও ভূমিবিজ্ঞান কেন্দ্রের জয়নারায়ণন কুট্টিপুরথ, জি এস গোপীকৃষ্ণন এবং ভি এম প্রণব চন্দ্রন এই গবেষণা করেছেন। ১৯৮০ থেকে ২০২৪—এই ৪৪ বছরের ভূমিভিত্তিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং বায়ুমণ্ডলীয় পুনর্বিশ্লেষণ তথ্য তাঁরা পরীক্ষা করেছেন। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানপত্রিকা ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ।  অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীরের দশটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য এই বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান হল ‘উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়ন’। অর্থাৎ, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা যত বাড়ছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির গতিও তত বেশি হচ্ছে। বার্ষিক হিসাবে প্রতি এক কিলোমিটার উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার প্রায় ০.১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতকালে প্রতি কিলোমিটার উচ্চতায় প্রতি দশকে এই হার বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ০.৪৩ ডিগ্রি। কয়েকটি মধ্যম উচ্চতার অঞ্চলে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা প্রতি দশকে ০.৩ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়েছে।

অন্য দিকে, জম্মুর সমতল এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা দুর্বল; কোথাও সামান্য শীতল হওয়ার লক্ষণও পাওয়া গিয়েছে। গবেষকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে তুষার থাকলেও সমতলে সেই আবরণ নেই। তা ছাড়া জম্মুর সমতলে সেচনির্ভর কৃষির প্রসার মাটিতে আর্দ্রতা বাড়িয়েছে। জল বাষ্পীভূত হওয়ার সময়ে চারপাশ থেকে তাপ শোষণ করায় স্থানীয় ভাবে কিছুটা শীতলতা তৈরি হতে পারে।

পাহাড়ে উষ্ণায়নের গতি বাড়ার অন্যতম কারণ তুষারের প্রতিফলন-চক্র। সাদা তুষার সূর্যালোকের বড় অংশ মহাকাশে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়লে তুষার আগেই গলে যায় এবং তার নীচের গাঢ় রঙের পাথর ও মাটি উন্মুক্ত হয়। এই পৃষ্ঠ সূর্যের তাপ বেশি শোষণ করে। ফলে তাপমাত্রা আরও বাড়ে, আরও তুষার ও বরফ গলে—এইভাবে একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হয়।

আরও একটি উদ্বেগজনক দিক হল, দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার তুলনায় রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে বর্ষার আগের সময়ে কোথাও রাতের তাপমাত্রা প্রতি দশকে ০.৬ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়েছে। বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প বৃদ্ধির কারণে দিনের সঞ্চিত তাপ রাতে সহজে বেরিয়ে যেতে পারছে না। জলীয় বাষ্প অনেকটা কম্বলের মতো কাজ করে পাহাড়ের স্বাভাবিক রাত্রিকালীন শীতলতা আটকে দিচ্ছে। উষ্ণ রাত তুষার ও বরফ গলার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহের ছন্দ বদলে দেয়।

হিমালয়কে ভারতীয় উপমহাদেশের ‘জলস্তম্ভ’ বলা হয়। এখানকার হিমবাহ ও মৌসুমি তুষার থেকে উৎপন্ন নদীগুলির জলের উপরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ নির্ভরশীল। তুষার দ্রুত গললে প্রথম দিকে নদীতে জল বেড়ে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়বে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে হিমবাহ সংকুচিত হলে শুষ্ক ঋতুতে নদীর জল কমে যেতে পারে। তার অভিঘাত পড়বে উত্তর ভারতের পানীয় জল, সেচ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে।

কাশ্মীরের আপেল, জাফরান ও অন্যান্য উদ্যানচাষেও নির্দিষ্ট সময়ের শীত প্রয়োজন। শীতের মেয়াদ কমে যাওয়া কিংবা তুষারপাতের ধরন বদলে গেলে ফলন ও গুণমান দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গুলমার্গের মতো অঞ্চলে বরফনির্ভর পর্যটনের মরসুম ছোট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ি বন, তৃণভূমি, জীববৈচিত্র্য এবং উচ্চতার সঙ্গে অভিযোজিত প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল সঙ্কুচিত হবে।

গবেষকদের বক্তব্য, এই ফলাফল কেবল জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য সতর্কবার্তা নয়। সমগ্র হিমালয় অঞ্চলে আরও ঘন আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, দীর্ঘমেয়াদি তুষার ও হিমবাহ নজরদারি এবং উচ্চতাভিত্তিক অভিযোজন পরিকল্পনা প্রয়োজন। নির্বিচার নির্মাণ, যানবাহনের চাপ ও দুর্বল ভূমি-ব্যবস্থাপনা বিশ্ব উষ্ণায়নের বিপদ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। পাহাড়ের তাপমাত্রা বৃদ্ধি তাই স্থানীয় কোনও বিচ্ছিন্ন পরিবর্তন নয়; তা উত্তর ভারতের জল ও খাদ্যনিরাপত্তার সামনে ক্রমশ বড় হয়ে ওঠা বিপদসংকেত। গবেষণাটিও সেই বিপদেরই পরিমাপযোগ্য প্রমাণ হাজির করেছে।