খবর

অন্নপূর্ণার ক্ষোভ: স্বতঃস্ফূর্ত, না কি রাজনৈতিক?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না-পাওয়াকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় মহিলাদের বিক্ষোভ—এ কি বিরোধীদের পরিকল্পিত আন্দোলন, নাকি প্রকল্পের বাস্তব সমস্যা থেকে তৈরি স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ?
  • গত কয়েক দিনের ঘটনাস্থল, বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, সরকারি পরিসংখ্যান এবং রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা পাশাপাশি রাখলে আপাতত সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে উত্তর মেলে না।
  • তবে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রবণতা স্পষ্ট: ক্ষোভের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না-পাওয়াকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় মহিলাদের বিক্ষোভ—এ কি বিরোধীদের পরিকল্পিত আন্দোলন, নাকি প্রকল্পের বাস্তব সমস্যা থেকে তৈরি স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ? গত কয়েক দিনের ঘটনাস্থল, বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, সরকারি পরিসংখ্যান এবং রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা পাশাপাশি রাখলে আপাতত সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে উত্তর মেলে না।

তবে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রবণতা স্পষ্ট: ক্ষোভের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। সেই ক্ষোভের সূচনা মূলত স্থানীয় ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে হলেও, তাকে রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ দেওয়ার চেষ্টা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।

প্রথম সূত্রটি মিলছে বিক্ষোভের ভৌগোলিক বিস্তারে। কোচবিহারের শীতলখুচি থেকে জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, ইংলিশবাজার, আসানসোল, রঘুনাথপুর, গুসকরা, চণ্ডীতলা, বনগাঁ, রাজপুর-সোনারপুর হয়ে পশ্চিম মেদিনীপুর—পরস্পর থেকে দূরে থাকা বহু এলাকায় প্রায় একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।

কোথাও বিডিও বা মহকুমাশাসকের দফতর ঘেরাও হয়েছে, কোথাও পুরসভার সামনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেছেন মহিলারা, কোথাও হয়েছে পথ বা রেল অবরোধ। কিন্তু এখনও পর্যন্ত অধিকাংশ ঘটনাতেই একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, অভিন্ন স্লোগান, নির্দিষ্ট দাবি-পত্র কিংবা একযোগে ঘোষিত কর্মসূচির স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি।

এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কোনও আন্দোলন যদি শুরু থেকেই একটি রাজনৈতিক সংগঠনের পরিকল্পিত কর্মসূচি হয়, সাধারণত তার সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্ব এবং কর্মসূচির মধ্যে কিছু মিল দেখা যায়। অন্নপূর্ণা-বিক্ষোভের ক্ষেত্রে অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে সেই অভিন্ন কাঠামোটি স্পষ্ট নয়।

বিক্ষোভকারীদের বক্তব্যেও উঠে আসছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাই। কারও আবেদন অনুমোদিত দেখাচ্ছে, অথচ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকেনি। কেউ জানেন না, তাঁর আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে। কারও আবেদন বাতিল হয়েছে সম্পত্তিগত যোগ্যতার মাপকাঠিতে—যেমন বাড়িতে তিনটি ঘর থাকার কারণে। আবার অনেকের অভিযোগ, তাঁরা আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা পেলেও অন্নপূর্ণার তালিকায় জায়গা পাননি।

মালদহে শতাধিক মহিলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুরসভার সামনে অপেক্ষা করেছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। রঘুনাথপুরে মহিলারাই রাজ্য সড়ক অবরোধ করেন। শীতলখুচিতেও প্রায় চার ঘণ্টা অবরোধের পরে প্রশাসনের আশ্বাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

এই ঘটনাগুলির অধিকাংশের ক্ষেত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিরোধী দলের পতাকা, ঘোষিত নেতৃত্ব বা দলীয় কর্মসূচির সরাসরি উল্লেখ নেই। আনন্দবাজার পত্রিকার জেলা-ভিত্তিক প্রতিবেদন এবং উত্তরবঙ্গের পরবর্তী পরিস্থিতির প্রতিবেদন সেই ছবিরই ইঙ্গিত দেয়।

সরকারি হিসাবেই বাকি কয়েক লক্ষ

ক্ষোভের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে প্রশাসনিক পরিসংখ্যানে।

সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অন্নপূর্ণা যোজনায় মোট আবেদন প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ। তার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৬২ লক্ষ আবেদনের যাচাই শেষ হয়েছে। নির্বাচিত প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলার মধ্যে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৩৭ লক্ষের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছেছে।

অর্থাৎ সরকারের প্রকাশিত হিসাবেই নির্বাচিত প্রায় ৮ লক্ষ মহিলা তখনও অর্থ পাননি। এর বাইরে রয়েছে যাচাই-অসম্পূর্ণ, বাতিল কিংবা আপত্তি জানানো আবেদন।

সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে আড়াই লক্ষের বেশি দাবি ও আপত্তি জমা পড়ার ঘটনাও সমস্যাটিকে নিছক বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ কমায়। সরকার তৃতীয় কিস্তির অর্থ পাঠানোর সময়সীমা বাড়িয়েছে এবং কিছু বাতিল আবেদন পুনর্বিবেচনা করে অনুমোদনও করা হচ্ছে। অর্থপ্রদানের সাম্প্রতিক হিসাব

অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলি বিষয়টিকে ব্যবহার করছে কি না, সেই প্রশ্নের বাইরে একটি প্রশাসনিক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যাঁরা যোগ্য বলে নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের একটি অংশের টাকা এখনও পৌঁছল না কেন?

রাজনীতি ঢুকছে কোথা থেকে?

তা বলে রাজনৈতিক সংগঠনের ভূমিকা একেবারেই নেই—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছনোর কারণ নেই।

উত্তরবঙ্গে বিজেপির দলীয় কর্মশালায় মহিলা মোর্চার নেত্রীরা বঞ্চিতদের টাকা দেওয়ার দাবি তুলেছেন। অন্য দিকে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং সরকারের কয়েক জন মন্ত্রী বিক্ষোভের পিছনে তৃণমূলের উসকানি বা চক্রান্তের অভিযোগ করেছেন। পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও তৃণমূলের কিছু সদস্য প্রকল্পে গোলমাল তৈরির চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

কিন্তু এখানেই তথ্য ও রাজনৈতিক দাবির মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও প্রকাশ্য নথি, অর্থের লেনদেনের তথ্য, যোগাযোগের রেকর্ড বা জেলাভিত্তিক সমন্বয়ের প্রমাণ সামনে আসেনি, যা দিয়ে বলা যায়—এই বিক্ষোভগুলি মূলত তৃণমূলের পরিকল্পিত কর্মসূচি।

ফলে ‘সবটাই তৃণমূলের সংগঠিত আন্দোলন’—এই মুহূর্তে একটি রাজনৈতিক অভিযোগ, প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়।

অন্য দিকেও রাজনীতি স্পষ্ট

তবে গল্পের অন্য দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না।

কিছু এলাকায় বিক্ষোভকারীদের মুখে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ফিরিয়ে আনার দাবি কিংবা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে স্লোগান শোনা গিয়েছে। তৃণমূলও অন্নপূর্ণা যোজনাকে বিজেপি সরকারের প্রতিশ্রুতিভঙ্গের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে।

অর্থাৎ যে ক্ষোভের শুরু হয়তো হয়েছিল “টাকা কোথায়?” প্রশ্ন থেকে, তার উপর দ্রুত বসতে শুরু করেছে রাজনৈতিক ভাষ্য।

স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা লোক জড়ো করা, স্মারকলিপি দেওয়া কিংবা অবরোধ দীর্ঘায়িত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা নিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু কোনও বিক্ষোভে রাজনৈতিক কর্মীদের উপস্থিতি বা হস্তক্ষেপ থাকলেই সেই বিক্ষোভের মূল অভিযোগটি রাজনৈতিক ভাবে বানানো—এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না।

একটি আন্দোলন একই সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত এবং রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।

তাহলে আসল ছবি কী?

এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট শতাংশে বলা সম্ভব নয়—কত জন বিক্ষোভকারী নিজের ক্ষোভে পথে নেমেছেন আর কত জন রাজনৈতিক সংগঠনের আহ্বানে এসেছেন। তার জন্য স্বাধীন ও প্রতিনিধিত্বশীল মাঠসমীক্ষা প্রয়োজন, যা এখনও নেই।

তবে প্রকাশ্যে আসা তথ্যগুলিকে পাশাপাশি রাখলে ছবিটি মোটামুটি এমন:

অন্নপূর্ণার টাকা না-পাওয়ার অভিযোগ বাস্তব। প্রশাসনিক জটিলতা ও বঞ্চনার অভিজ্ঞতা থেকেই বহু জায়গায় ক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সেই ক্ষোভের প্রথম স্তরটি মূলত স্থানীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু ক্ষোভ যত ছড়াচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলিও তত দ্রুত তার উপর নিজেদের ভাষ্য চাপিয়ে দিচ্ছে এবং তাকে সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করার চেষ্টা করছে।

তাই আপাতত সবচেয়ে সতর্ক এবং তথ্যসম্মত সিদ্ধান্ত হল—

অন্নপূর্ণার বিক্ষোভ ‘বানানো’—এমন প্রমাণ নেই। আবার এটি পুরোপুরি রাজনীতিমুক্ত—এমন দাবিও এখন করা যায় না।

প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত তাই শুধু “কে বিক্ষোভ করাচ্ছে?” নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—যাঁরা পথে নেমেছেন, তাঁদের অভিযোগের কতটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং কতটা রাজনৈতিক প্রচার?

সেই উত্তরই ঠিক করবে, অন্নপূর্ণার ক্ষোভ আগামী দিনে বিচ্ছিন্ন স্থানীয় বিক্ষোভ হয়ে থাকবে, নাকি বাংলার রাজনীতিতে একটি সংগঠিত আন্দোলনের রূপ নেবে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles