রাহুলের মঞ্চ, মেয়েদের গুঞ্জন

যা জানা জরুরি
- অরিজিৎ মিত্র পুনের অল ইন্ডিয়া শ্রী শিবাজি মেমোরিয়াল সোসাইটির মাঠে শনিবার বিকেলে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো মানুষটি রাহুল গান্ধী ছিলেন না।
- তাঁর সামনে বসে থাকা হাজার হাজার তরুণীই যেন হয়ে উঠেছিলেন আসল দৃশ্য।
- কেউ মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত জেলা থেকে আসা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিপ্রার্থী, কেউ কলেজছাত্রী, কেউ সদ্য কর্মজীবনে পা রাখা তরুণী।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
অরিজিৎ মিত্র
পুনের অল ইন্ডিয়া শ্রী শিবাজি মেমোরিয়াল সোসাইটির মাঠে শনিবার বিকেলে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো মানুষটি রাহুল গান্ধী ছিলেন না। তাঁর সামনে বসে থাকা হাজার হাজার তরুণীই যেন হয়ে উঠেছিলেন আসল দৃশ্য। কেউ মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত জেলা থেকে আসা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিপ্রার্থী, কেউ কলেজছাত্রী, কেউ সদ্য কর্মজীবনে পা রাখা তরুণী। হাতে মুঠোফোন, কাঁধে ব্যাগ, চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের উদ্বেগ। সেই ক্লান্তির উপরেই চাপানো উৎসবের উজ্জ্বল আবরণ।
আয়োজকেরা প্রথমে প্রায় আট হাজার ছাত্রীর সমাগমের কথা পুলিশকে জানিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে সংবাদমাধ্যমের হিসাব, মাঠে হাজির ছিলেন প্রায় ১৫ হাজার ছাত্রী ও তরুণী। পুরুষের উপস্থিতি ছিল কার্যত সীমিত—নিরাপত্তারক্ষী, সংবাদকর্মী, আয়োজক এবং কয়েক জন রাজনৈতিক কর্মী ছাড়া দর্শকাসনে ছেলেদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। নির্ভরযোগ্য ভাবে আলাদা পুরুষ-সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি ছিল মেয়েদেরই সভা।
রাহুল মঞ্চে ওঠার আগেই মাঠে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত অপেক্ষা। সাধারণ রাজনৈতিক সভার অধৈর্য স্লোগান নয়, বরং এক ধরনের ব্যক্তিগত উত্তেজনা। মেয়েরা পরস্পরের ছবি তুলছিলেন, কেউ মঞ্চের দিকে মুঠোফোন তুলে রেখেছিলেন, কেউ আবার নিজের প্রশ্নটি শেষবারের মতো লিখে নিচ্ছিলেন।
অনেকে এসেছিলেন রাহুলকে দেখতে। আবার অনেকে এসেছিলেন তাঁকে কিছু বলতে। এক জন তারকা-রাজনীতিককে কাছ থেকে দেখার আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতাবান কাউকে নিজের সমস্যার কথা শোনানোর তাগিদ—দুই স্রোত মিশে গিয়েছিল মাঠের উচ্ছ্বাসে।
রাহুলের প্রবেশে সেই অপেক্ষা আচমকাই শব্দে পরিণত হল। হাততালি, নাম ধরে ডাক, মুঠোফোনের আলো আর সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। বক্তৃতার কোনও বাক্য পছন্দ হলেই হাততালির ঢেউ পৌঁছে যাচ্ছিল মাঠের শেষ প্রান্তে। তিনি যখন বললেন, “জোরে বলো, নিজের পরিচয় নিয়ে গর্বিত হও, সমাজে নিজের জায়গার জন্য লড়ো,” তখন সেই সাড়া প্রায় স্লোগানে পরিণত হল।
আর “পিতৃতন্ত্র ভেঙে দাও” বলতেই মেয়েদের একাংশ হাত তুলে তাঁর সঙ্গে গলা মেলালেন।
তবে সেই উচ্ছ্বাসের ভিতরেও ছিল কয়েক জোড়া অশ্রুসজল চোখের গল্প।
সরযূ চোপড়ে নিজেকে ফার্মাসিস্ট এবং মহারাষ্ট্র লোকসেবা কমিশনের পরীক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিলেন। তাঁর অভিযোগ, ২০ থেকে ২২ মার্চের মধ্যে হওয়া ওষুধ পরিদর্শক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। পরীক্ষার্থীরা দিনরাত প্রস্তুতি নিয়েছেন, অথচ অসাধু কয়েক জন আগেই প্রশ্ন পেয়ে গিয়েছেন বলে অভিযোগ। তদন্ত চলছে। কিন্তু পরীক্ষার্থীদের জীবন তো তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত থেমে থাকে না।
সরযূর একটি কথাই যেন গোটা সভার সবচেয়ে নিঃশব্দ অথচ তীক্ষ্ণ বক্তব্য হয়ে উঠল। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে ছেলে-মেয়ে সকলেরই ক্ষতি হয়। কিন্তু মেয়েদের ক্ষতির সঙ্গে যেন আরও একটি ঘড়ি টিকটিক করতে থাকে—বিয়ের বয়স, পরিবারের চাপ, দায়িত্ব নেওয়ার সামাজিক সময়সীমা।
একটি পরীক্ষা বাতিল হওয়া কিংবা নিয়োগ দু’বছর পিছিয়ে যাওয়া কোনও তরুণের কর্মজীবনে বড় ধাক্কা। বহু তরুণীর ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে উঠতে পারে নিজের জীবন নিজের মতো করে বেছে নেওয়ার সুযোগ হারানোর কারণ।
“আমরা শুধু একটি নিরপেক্ষ পরীক্ষা চাই,” বললেন সরযূ।
রাহুল তাঁকে থামিয়ে কোনও তৈরি রাজনৈতিক উত্তর দেননি। বরং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সংক্রান্ত নথি, স্ক্রিনশট এবং অন্যান্য প্রমাণ তাঁর কাছে পৌঁছে দিতে বলেন। পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করার আশ্বাসও দেন।
এই মুহূর্তগুলিতেই অনুষ্ঠানটি সাময়িক ভাবে রাজনৈতিক সভা থেকে গণশুনানির চেহারা নিচ্ছিল। বক্তৃতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল মাইক্রোফোন হাতে পাওয়া। কেউ বলছিলেন পরীক্ষার অনিয়মের কথা, কেউ নিরাপত্তাহীনতার, কেউ অনলাইন হেনস্থার। জনতার উচ্ছ্বাসের মধ্যে হঠাৎ কোনও এক তরুণীর ব্যক্তিগত বিপন্নতা উঠে আসছিল। কয়েক মুহূর্তের জন্য গোটা মাঠ চুপ করে শুনছিল।
ভোজপুরি লোকশিল্পী নেহা সিং রাঠোরকে রাহুল মঞ্চে ডাকতেই উচ্ছ্বাস আরও বাড়ল। সরকারের কাছে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন গালিগালাজ ও হেনস্থার শিকার হওয়ার অভিযোগ জানান তিনি। তাঁর প্রশ্ন সরল—প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করাই যদি অপরাধ হয়, তবে সেটি কেমন গণতন্ত্র?
রাহুল তাঁকে ভয় না পাওয়ার বার্তা দেন। মেয়েদের সারি থেকে উঠে আসা প্রতিক্রিয়ায় শুধু নেহার প্রতি সহমর্মিতাই ছিল না, ছিল নিজেদের অভিজ্ঞতারও প্রতিধ্বনি। মঞ্চে এক পরিচিত শিল্পী যে অনলাইন আক্রমণের কথা বলছিলেন, তার ছোট-বড় সংস্করণ শ্রোতাদের অনেকেই নিজেদের জীবনে দেখেছেন।
এরপর রাহুল তাঁর বক্তৃতার অন্যতম রাজনৈতিক মুহূর্তটি তৈরি করেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি পুরনো ভিডিয়ো দেখিয়ে যন্তর মন্তরের আন্দোলনে মেয়েদের মুখে অশালীন ভাষা শুনে ‘সাংস্কৃতিক ধাক্কা’ লাগার মন্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। প্রশ্ন ছুড়ে দেন—একই ভাষা ছেলেরা ব্যবহার করলে সমাজ কেন একই ভাবে বিস্মিত হয় না?
“ছেলেরা গালাগালি করলে সমস্যা নেই, মেয়েরা করলেই সাংস্কৃতিক ধাক্কা!”
বাক্যটি শুনে মাঠে হাসির ঢেউ উঠেছিল। কিন্তু সেটি নিছক কৌতুকের হাসি ছিল না। তার মধ্যে ছিল পরিচিত এক দ্বিচারিতাকে হঠাৎ প্রকাশ্যে দেখতে পাওয়ার স্বস্তি। রাহুল গালিগালাজকে সমর্থন করেননি; তাঁর লক্ষ্য ছিল শালীনতার নিয়ম নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে আলাদা ভাবে প্রয়োগ করার মানসিকতা।
মনুস্মৃতির সেই বহুল আলোচিত ধারণারও সমালোচনা করেন তিনি, যেখানে নারীকে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বাবা, স্বামী ও পুত্রের অধীনে থাকার কথা বলা হয়েছে।
“তুমি কারও সম্পত্তি নও। তুমি তোমার নিজের।”
এই কথাতেই মাঠের প্রতিক্রিয়া ছিল সবচেয়ে প্রবলগুলির একটি।
তবে নারীর স্বাধীনতা নিয়ে বলতে গিয়ে রাহুলের একটি মন্তব্য প্রশ্নের অবকাশও রাখে। মহিলারা প্রকৃতিগত ভাবে পুরুষদের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল, কোমল ও সহানুভূতিশীল—এমন মন্তব্য সমর্থকদের কাছে প্রশংসা পেলেও নারীর জন্য ফের একটি ‘স্বভাবগত’ ছাঁচ তৈরি করছে কি না, সেই বিতর্ক থাকতেই পারে।
কিন্তু শনিবারের মাঠে উপস্থিত মেয়েরা সেই দার্শনিক বিতর্কের জন্য আসেননি। তাঁরা শুনতে চেয়েছিলেন, জাতীয় রাজনীতির প্রথম সারির কোনও নেতা তাঁদের ভয়, ক্ষোভ এবং আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন কি না।
মাঠের বাইরে অবশ্য রাজনীতির পরিচিত কোলাহল ছিলই। পুলিশ তিরিশটি শর্তে সভার অনুমতি দিয়েছিল। আপত্তিকর ছবি বা ব্যানার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায় দেওয়া হয়েছিল আয়োজকদের, নজরদারির জন্য ক্যামেরা বসানোর নির্দেশও ছিল।
আগের দিন পুনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের বাইরে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ এবং কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনার অভিযোগ উঠেছিল। বিজেপির তরফে আবার দাবি করা হয়, সমাজমাধ্যমের প্রভাবশালীদের টাকা দিয়ে সভায় আনা হয়েছিল। কংগ্রেস সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দাবিগুলির স্বাধীন সমর্থন এখনও মেলেনি।
কিন্তু মাঠের ভিতরের রাজনীতি ছিল অন্য রকম।
এই ১৫ হাজার তরুণী যে ভবিষ্যতের ভোটার, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। রাহুল গান্ধীর ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ তাই শুধু ছাত্রদের অসন্তোষ শোনার কর্মসূচি নয়; কংগ্রেসের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরির চেষ্টাও।
রাহুলের নাম ধরে উল্লাস, তাঁর প্রতিটি তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক মন্তব্যে হাততালি এবং তাঁকে এক ঝলক দেখার জন্য মুঠোফোন তুলে ধরার দৃশ্য অন্তত একটি কথা স্পষ্ট করে দিয়েছে—এই শ্রোতাদের মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত আকর্ষণ এখনও যথেষ্ট।
তবু রাহুলকে ঘিরে উচ্ছ্বাসের চেয়েও বড় ছিল মাইক্রোফোন পাওয়ার উচ্ছ্বাস।
এত দিন রাজনৈতিক সভায় মেয়েরা প্রায়ই মঞ্চের নীচে বসে থেকেছেন, আর পুরুষেরা তাঁদের হয়ে কথা বলেছেন। পুনেতে ব্যবস্থাটি সাময়িক ভাবে উল্টে গিয়েছিল। একজন পুরুষ নেতা মঞ্চে ছিলেন বটে, কিন্তু সভার বিষয়, কণ্ঠস্বর এবং আবেগ—সবই ছিল মেয়েদের।
সভা শেষে মাঠ ছাড়ার সময় কেউ রাহুলের বক্তৃতা নিয়ে আলোচনা করছিলেন, কেউ নিজের তোলা ভিডিয়ো দেখাচ্ছিলেন, কেউ আবার প্রশ্ন করার সুযোগ না পাওয়ার হতাশা জানাচ্ছিলেন।
রাজনৈতিক সভা সাধারণত নেতার শেষ বাক্যের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। এই সভাটি যেন সেখানেই শেষ হল না।
পরীক্ষার ন্যায়বিচার, নিজের পেশা বেছে নেওয়া, বিয়ের চাপ ঠেকানো, প্রশ্ন করার অধিকার—যে কথাগুলি নিয়ে মেয়েরা মাঠে এসেছিলেন, সেগুলি তাঁদের সঙ্গেই মাঠের বাইরে বেরিয়ে গেল।
রাহুল গান্ধী পনেরো হাজার মেয়েকে বলেছিলেন, দেশ তাঁদের কথা শুনবে।
পুনের মাঠে দেশ ছিল না। ছিল ক্যামেরা, রাজনৈতিক দল এবং এক জন বিরোধী নেতা।
দেশ সত্যিই শুনল কি না, তার পরীক্ষা হবে হাততালির শব্দ থেমে যাওয়ার পরে।
সভার লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ভিত্তিতে লেখা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



