খবর

গানে-নাচে বদলাবে খাবার!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • মুম্বই: ‘স্বাস্থ্যকর খাবার, আনন্দের নড়াচড়া, সুস্থ তুমি’—হাতে ফল, শাকসবজি ও আটা-রুটির ছবি আঁকা ফলক।
  • আর নাচের ছন্দেই প্রশ্ন—কোন খাবার শরীর ভাল রাখে?
  • দেখে নাচের ক্লাস মনে হলেও মুম্বইয়ের উত্তর প্রান্তের নালাসোপারার একটি স্কুলে আসলে চলছে অভিনব পুষ্টি-পরীক্ষা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

মুম্বই: ‘স্বাস্থ্যকর খাবার, আনন্দের নড়াচড়া, সুস্থ তুমি’—হাতে ফল, শাকসবজি ও আটা-রুটির ছবি আঁকা ফলক। সমস্বরে স্লোগান দিচ্ছে একদল শিশু। মুহূর্তেই বেজে উঠছে গান, শুরু হচ্ছে নাচ। আর নাচের ছন্দেই প্রশ্ন—কোন খাবার শরীর ভাল রাখে? কোনটি অসুস্থ করে? কোন খাবার খেলে মুখে হাসি ফুটবে?

দেখে নাচের ক্লাস মনে হলেও মুম্বইয়ের উত্তর প্রান্তের নালাসোপারার একটি স্কুলে আসলে চলছে অভিনব পুষ্টি-পরীক্ষা। গান, নাচ এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে হাতিয়ার করে শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা হচ্ছে। লক্ষ্য শুধু পুষ্টি সম্পর্কে জানানো নয়, শিশুরা বাস্তবে কী খাচ্ছে, সেই পছন্দও বদলানো যায় কি না, তার উত্তর খোঁজা।

ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী আরনা জি-র কাছে পুষ্টির পাঠ এখন গানের সুরেই মনে থাকে। তার কথায়, একটি বিশেষ গান ও নাচের ভঙ্গি শুনলেই মনে পড়ে যায়—‘পনির খাও, ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন পাও।’ আরনার কথায়, গান-নাচের মাধ্যমে শেখা বিষয় অনেক দিন মনে থাকে।

এই উদ্যোগের নাম ‘হিপ হপ নিউট্রিশন ইন্ডিয়া’। আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং মুম্বইয়ের সোসাইটি ফর নিউট্রিশন, এডুকেশন অ্যান্ড হেলথ অ্যাকশন বা ‘স্নেহা’ যৌথ ভাবে ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির উপযোগী করে কর্মসূচিটি তৈরি করছে। নালাসোপারার স্কুলটিতে আপাতত চলছে পরীক্ষামূলক পর্যায়ের কাজ। পড়ুয়া, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে দলগত আলোচনা ও সমীক্ষার মাধ্যমে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টি-সচেতনতা এবং খাবার বেছে নেওয়ার পিছনের কারণগুলি বোঝার চেষ্টা চলছে।

এই পরীক্ষা এমন সময়ে, যখন মহারাষ্ট্র সরকার স্কুলের চারপাশের খাদ্য পরিবেশ নিয়েও কড়া পদক্ষেপ করেছে। রাজ্যের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন ২০২০ সালের নিরাপদ খাদ্য ও সুষম আহারবিধি কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে। সেই নিয়ম অনুযায়ী, স্কুল চত্বর এবং প্রবেশপথের ৫০ মিটারের মধ্যে অতিরিক্ত চর্বি, চিনি ও লবণযুক্ত খাবার বা পানীয় বিক্রি, বিজ্ঞাপন কিংবা বিনামূল্যে বিতরণ নিষিদ্ধ।

কিন্তু গবেষকদের প্রশ্ন আরও গভীরে—স্কুলের বাইরে অস্বাস্থ্যকর খাবার আটকালেই কি হবে? শিশুর নিজের পছন্দ না বদলালে দীর্ঘমেয়াদি ফল মিলবে কী ভাবে?

পরীক্ষামূলক স্কুল সেন্ট উইলিব্রর্ড স্কুলসের প্রতিষ্ঠাতা উইলিব্রর্ড জর্জ জানান, শিশুদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের গোড়ায় পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে। বাড়িতে তারা কী খায়, টিফিনে কী আনে, স্কুলের খাবারের দোকান ব্যবহার করে কি না, সামনে কী ধরনের স্বাস্থ্যকর খাবারের বিকল্প রয়েছে—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবারের খাদ্যপ্রাপ্যতা, অভিভাবকদের ক্রয়ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত, পারিবারিক অভ্যাস এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও গবেষণার অংশ।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিটি হেলথ কেন্দ্রের সহ-অধিকর্তা ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর ওলাজিদে উইলিয়ামসের মতে, শুধু তথ্যের অভাবেই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি হয় না। খাবারের দাম, সহজলভ্যতা, পারিবারিক সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞাপনের প্রভাবও শিশুর পছন্দ গড়ে দেয়। তাই প্রকল্পের লক্ষ্য স্বাস্থ্যকর খাবারকে সাংস্কৃতিক ভাবে এতটাই আকর্ষণীয় করে তোলা, যাতে শিশুরা নিজেরাই সেটিকে বেছে নিতে চায়।

অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রচারে বিপুল অর্থ ঢালে খাদ্য সংস্থাগুলি। বিজ্ঞাপনে সেই খাবারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় আনন্দ, আধুনিকতা, তারকাখ্যাতি ও সাফল্যের ছবি। বিপরীতে ফল, শাকসবজি বা ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার অনেক কম প্রচার পায়। উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য অবশ্য বিজ্ঞাপনী খরচে শিল্পসংস্থাগুলির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া নয়। তাঁদের কৌশল—গান, নাচ, জনপ্রিয় মুখ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সাহায্যে স্বাস্থ্যকর খাবারকেই আকর্ষণের কেন্দ্রে নিয়ে আসা।

কর্মসূচিটির ভিত্তি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হিপ হপ হেলদি ইটিং অ্যান্ড লিভিং ইন স্কুলস’ পাঠক্রম। আমেরিকায় হিপ হপ, গল্প ও গণিতকে মিলিয়ে শিশুদের পুষ্টি শেখানো হয়েছিল। আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এর ফলে শিশুরা খাবারের ক্যালরি সম্পর্কে ভাল ভাবে বুঝতে পেরেছে এবং কেনা খাবারে ক্যালরির পরিমাণও কমেছে।

তবে হারলেমে সফল হওয়া মডেলটি নালাসোপারায় হুবহু কাজ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। জর্জের মতে, হারলেমের শিশুদের কাছে হিপ হপ পরিচিত সংস্কৃতির অংশ। ভারতের সব জায়গায় সেই একই সাংস্কৃতিক আবেদন নেই। কোথাও স্থানীয় গান বা নাচ বেশি কার্যকর হতে পারে। তাই ভারতীয় পড়ুয়া, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতামত নিয়েই পাঠক্রমের সাংস্কৃতিক রূপ বদলানো হচ্ছে।

সমীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ১১টি ভাগে মোট ৪০ ঘণ্টার পাঠক্রম তৈরি করা হবে। থাকবে গানভিত্তিক দৃশ্যায়ন, ছবির গল্প, অনুশীলনপুস্তিকা ও শিক্ষক-সহায়িকা। গণিতের সাহায্যে শেখানো হবে শতাংশ, ক্যালরি, খাবারের প্যাকেটের পুষ্টিতথ্য এবং পরিমাণের হিসাব। গান ও শরীরচর্চা মিশিয়ে পাঠকে আরও আনন্দদায়ক করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু শিশুর প্লেট বদলানো নয়, পুরো পরিবারের খাবারের অভ্যাসে প্রভাব ফেলা। প্রাক্‌-কিশোর বয়সে শিশুরা পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকলেও নিজেদের পছন্দ তৈরি করতে শুরু করে। তারা বাড়িতে পুষ্টির বার্তা পৌঁছে দিয়ে বাজার করা বা রান্নার সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তাও খতিয়ে দেখা হবে।

পরবর্তী পর্যায়ে নালাসোপারার স্কুলে নতুন পাঠক্রম চালু করে কর্মসূচির আগে ও পরে শিশুদের পুষ্টি-জ্ঞান এবং খাদ্যাভ্যাসের তুলনা করা হবে। ফল ভাল হলে বিভিন্ন রাজ্য ও ভাষায় এই মডেল ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় গান, সংলাপ ও অ্যানিমেশন তৈরিতে কৃত্রিম মেধার ব্যবহারও হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা একটাই—পুষ্টির পাঠ যদি বইয়ে নয়, গানের সুরে শেখানো হয়, তবে কি বদলাবে শিশুর প্লেট?

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles