ইডির ক্ষমতা নিয়ে ২০২২ সালের রায় পুনর্বিবেচনায় নতুন বেঞ্চ গঠন সুপ্রিম কোর্টের

যা জানা জরুরি
- অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডিকে দেওয়া গ্রেফতার, তল্লাশি, সম্পত্তি আটক এবং জিজ্ঞাসাবাদের বিস্তৃত ক্ষমতা নিয়ে আবারও বিচারিক পর্যালোচনার পথ খুলল সুপ্রিম কোর্ট।
- ২০২২ সালের বহুচর্চিত ‘বিজয় মদনলাল চৌধুরী বনাম ভারত সরকার’ রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পুনর্বিবেচনার আবেদনগুলি শুনতে নতুন করে তিন বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে।
- নতুন বেঞ্চের নেতৃত্বে থাকবেন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডিকে দেওয়া গ্রেফতার, তল্লাশি, সম্পত্তি আটক এবং জিজ্ঞাসাবাদের বিস্তৃত ক্ষমতা নিয়ে আবারও বিচারিক পর্যালোচনার পথ খুলল সুপ্রিম কোর্ট। ২০২২ সালের বহুচর্চিত ‘বিজয় মদনলাল চৌধুরী বনাম ভারত সরকার’ রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পুনর্বিবেচনার আবেদনগুলি শুনতে নতুন করে তিন বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে।
নতুন বেঞ্চের নেতৃত্বে থাকবেন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। অন্য দুই সদস্য বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনা। বৃহস্পতিবার মামলার সব পক্ষ নতুন বেঞ্চ গঠনে সম্মতি জানানোর পর আদালত এই সিদ্ধান্ত নেয়। তবে মূল শুনানির দিন এখনও ঘোষণা করা হয়নি। আদালত জানিয়েছে, বিষয়টির জরুরি গুরুত্ব বিবেচনা করে শীঘ্রই দিন স্থির করা হবে।
এর আগে আবেদনগুলি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া এবং বিচারপতি এন কোটিশ্বর সিংহের বেঞ্চে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু বিচারপতি ভুঁইয়া ও বিচারপতি সিংহ বর্তমানে পৃথক বেঞ্চে রয়েছেন। প্রধান বিচারপতি জানান, আগের বিন্যাস বজায় রাখতে গেলে সুপ্রিম কোর্টের তিনটি চালু বেঞ্চ ভাঙতে হত। সেই প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতেই পক্ষগুলির মতামত নিয়ে নতুন বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে।
ইডির হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এবং আবেদনকারীদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিবাল নতুন বেঞ্চে শুনানির প্রস্তাবে সম্মতি দেন। কংগ্রেস সাংসদ কার্তি পি চিদম্বরম-সহ একাধিক আবেদনকারী ২০২২ সালের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছেন।
২০২২ সালের ২৭ জুলাই বিচারপতি এ এম খানউইলকর, বিচারপতি দীনেশ মাহেশ্বরী এবং বিচারপতি সি টি রবিকুমারের তিন সদস্যের বেঞ্চ পিএমএলএ-র একাধিক বিতর্কিত ধারা বৈধ বলে ঘোষণা করেছিল। প্রায় ২৪১টি আবেদনের নিষ্পত্তি করে আদালত বলেছিল, অর্থপাচার সাধারণ অপরাধের তুলনায় আলাদা এবং গুরুতর প্রকৃতির। ফলে তা দমনে ইডিকে দেওয়া বিশেষ ক্ষমতা অসাংবিধানিক নয়।
ওই রায়ে পিএমএলএ-র ১৯ নম্বর ধারায় গ্রেফতারের ক্ষমতা, ৫ নম্বর ধারায় সম্পত্তি সাময়িক আটক, ১৭ নম্বর ধারায় তল্লাশি ও বাজেয়াপ্তকরণ, ২৪ নম্বর ধারায় প্রমাণের দায় অভিযুক্তের উপরে চাপানো এবং ৪৫ নম্বর ধারায় জামিনের জন্য কঠোর জোড়া শর্ত বহাল রাখা হয়েছিল। আদালত আরও বলেছিল, ইডির আধিকারিকরা সাধারণ পুলিশের সমতুল নন এবং তাঁদের কাছে দেওয়া বক্তব্য নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
রায়ের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক ছিল ‘এনফোর্সমেন্ট কেস ইনফরমেশন রিপোর্ট’ বা ইসিআইআর নিয়ে আদালতের অবস্থান। সাধারণ ফৌজদারি মামলার এফআইআরের মতো ইসিআইআর-এর প্রতিলিপি অভিযুক্তকে দেওয়া বাধ্যতামূলক নয় বলে রায় দিয়েছিল আদালত। ইসিআইআর-কে ইডির অভ্যন্তরীণ নথি হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল নির্দোষ বলে ধরে নেওয়ার প্রচলিত নীতি। সাধারণ ফৌজদারি আইনে অভিযোগ প্রমাণের দায় রাষ্ট্রের। কিন্তু পিএমএলএ-র ২৪ নম্বর ধারায় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অভিযুক্তকেই দেখাতে হয় যে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি অপরাধলব্ধ নয়। একই সঙ্গে জামিন পেতে আদালতকে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট করতে হয় যে অভিযুক্ত অপরাধী নন এবং জামিনে মুক্ত থাকলে ফের অপরাধ করবেন না। আবেদনকারীদের বক্তব্য, বিচারের আগেই একজনকে কার্যত নিজের নির্দোষতা প্রমাণ করতে বাধ্য করা ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায়সঙ্গত বিচারপ্রক্রিয়ার পরিপন্থী।
২০২২ সালের ২৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এন ভি রামানার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণ করেছিল। তখন আদালত প্রাথমিকভাবে দু’টি বিষয়ে পর্যালোচনার প্রয়োজন স্বীকার করে—অভিযুক্তকে ইসিআইআর না দেওয়ার বিধান এবং প্রমাণের দায় উল্টে দেওয়ার সাংবিধানিক বৈধতা। তবে আবেদনকারীরা মোট ১৩টি প্রশ্নের বিচার চান। তার মধ্যে রয়েছে আইনের পূর্ববর্তী সময় থেকে প্রয়োগ, ইডি আধিকারিকদের পুলিশের মর্যাদা না দেওয়া, তাঁদের সামনে দেওয়া বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা, গ্রেফতার ও তল্লাশির ক্ষমতা এবং কঠোর জামিনের শর্ত।
অন্য দিকে, ইডি ও কেন্দ্রের যুক্তি, পুনর্বিবেচনার আবেদনকে আপিলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। রায়ের নথিতেই স্পষ্ট কোনও ভুল রয়েছে—আবেদনকারীরা তা দেখাতে পারেননি। তাই বিস্তৃত পরিসরে গোটা রায় নতুন করে খোলা উচিত নয়। আদালতও এর আগে জানিয়েছিল, প্রথমে আবেদনগুলির গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে; তার পর প্রয়োজন হলে মূল সাংবিধানিক প্রশ্নে প্রবেশ করা হবে।
নতুন বেঞ্চের সিদ্ধান্তের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। ২০২২ সালের রায় বদলালে শুধু ভবিষ্যতের ইডি তদন্ত নয়, বর্তমানে চলা বহু রাজনৈতিক ও আর্থিক মামলার প্রক্রিয়াও প্রভাবিত হতে পারে। আর রায় বহাল থাকলে অর্থপাচার মামলায় ইডির বর্তমান বিস্তৃত ক্ষমতার উপর সর্বোচ্চ আদালতের সিলমোহর আরও দৃঢ় হবে। মামলার পটভূমি ও বিচার্য প্রশ্ন
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



