ত মাসে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর এবং দেশের অন্যত্র ছাত্র-বিক্ষোভ চলাকালীন হিংসার অভিযোগ স্বাধীন ভাবে খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগের অভিযোগ যেমন কমিটি পরীক্ষা করবে, তেমনই নিরাপত্তাকর্মীদের উপর বিক্ষোভকারীদের কথিত হামলা এবং তার ফলে পুলিশকর্মীদের আহত হওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে।

সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি আর সুবাষ রেড্ডি এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দেবেন। কমিটির অন্য সদস্যেরা হলেন পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রবিশঙ্কর ঝা, দিল্লি হাই কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি শালিন্দর কৌর, সিবিআইয়ের প্রাক্তন অধিকর্তা ঋষিকুমার শুক্ল এবং মেঘালয়ের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ মহানির্দেশক ডক্টর এল আর বিষ্ণোই।

ছাত্র-বিক্ষোভ চলাকালীন হিংসার ঘটনা নিয়ে দায়ের হওয়া একগুচ্ছ রিট আবেদনের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়েছে।

আদালত জানিয়েছে, শুনানির প্রথম দিনেই তারা লক্ষ করেছিল যে আবেদনকারী ও বিবাদীপক্ষের উত্থাপিত অভিযোগগুলি প্রাথমিক ভাবে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি করছে। সেই কারণেই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ছররা বন্দুক, বৈদ্যুতিক লাঠি, নির্বিচার লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার এবং সাদা পোশাকের কর্মীদের কথিত হিংসাত্মক আচরণ।

তদন্তের পরিধি

উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি কোন কোন বিষয় পরীক্ষা করবে, তা নির্ধারণ করতে গিয়ে আবেদনকারী এবং বিবাদীপক্ষের পৃথক প্রস্তাব নথিভুক্ত করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

আবেদনকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কমিটিকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি খতিয়ে দেখতে হবে—

  • বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ এবং অন্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলির অতিরিক্ত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগ হয়েছিল কি না।
  • যথেষ্ট সতর্কতা না দিয়েই কিংবা পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি না রেখে ছররা বন্দুক, বৈদ্যুতিক লাঠি, লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছিল কি না।
  • বিক্ষোভ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সময় পুলিশের প্রতিক্রিয়া পরিমিত এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না।
  • গ্রেফতার অথবা বলপ্রয়োগের সময় পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীরা যথাযথ উর্দি এবং দৃশ্যমান নামফলক পরেছিলেন কি না, যাতে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে শনাক্ত করে ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করা যায়।
  • বিক্ষোভকারীদের উপর নজরদারি চালানো হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল কি না।
  • মহিলা বিক্ষোভকারীদের নিশানা করে হিংসা, হেনস্থা, শ্লীলতাহানি এবং ঘটনার পরে তাঁদের পুনরায় হয়রানির শিকার করা হয়েছিল কি না।
  • পুলিশের কথিত নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের যথেষ্ট চিকিৎসা ও অন্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না এবং তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনও সুযোগ রয়েছে কি না।
  • ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩-এর ১৬৩ ধারায় সার্বিক নিষেধাজ্ঞা জারি করার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার কি না। আবেদনকারীদের বক্তব্য, জনশৃঙ্খলার সামনে বাস্তব ও আসন্ন বিপদের আশঙ্কা না থাকলে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ আটকাতে ওই ধারা নিয়মিত বা আগাম ব্যবহার করা উচিত নয়।

বিবাদীপক্ষের বক্তব্য

বিবাদীপক্ষও কমিটির সামনে কয়েকটি বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সেগুলি হল—

  • পুলিশ ও অন্য নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীরা বলপ্রয়োগ বা হিংসা করেছিলেন কি না।
  • বিক্ষোভ চলাকালীন সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করা হয়েছিল কি না। এর মধ্যে সরকারি স্থাপনা, যানবাহন এবং রাষ্ট্র ও সাধারণ নাগরিকদের মালিকানাধীন অন্য সম্পদের কথিত ধ্বংস বা ক্ষতির ঘটনাও রয়েছে।
  • কর্তব্যরত অবস্থায় পুলিশকর্মীদের আহত হওয়ার ঘটনা। বিবাদীপক্ষের বক্তব্য, আহত পুলিশকর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মানসিক ও আবেগগত আঘাতকেও আবেদনকারীদের অভিযোগের সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।

উভয় পক্ষের অভিযোগই খতিয়ে দেখা হবে

দুই পক্ষের বক্তব্য বিবেচনার পরে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, আবেদনকারী ও বিবাদীপক্ষের উত্থাপিত সমস্ত বিষয়ই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটির পরীক্ষা করা উচিত।

মহিলা বিক্ষোভকারীদের নিশানা করে হিংসা ও যৌন হেনস্থার অভিযোগকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তদন্ত করতে বলেছে আদালত। পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের কথিত বলপ্রয়োগে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও কমিটিকে পরীক্ষা করতে হবে। এর পাশাপাশি নির্দেশদানের শৃঙ্খল, কথিত বাড়াবাড়ির জন্য কার দায় কতটা এবং প্রচলিত আইন, বিধি বা নিয়ম লঙ্ঘিত হয়েছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে।

প্রয়োজনে ফরেন্সিক, প্রযুক্তি এবং অন্য বিশেষ ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কমিটিকে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলি কমিটির কাছে নথি, প্রমাণসামগ্রী এবং পরামর্শ জমা দিতে পারবে। অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের পরিচয় সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজন হলে নাম-পরিচয় গোপন রেখেও তথ্য জমা দেওয়া যাবে।

ছাত্র-বিক্ষোভ সংক্রান্ত সিসিটিভি ও ড্রোনচিত্র, দেহে ধারণযোগ্য ক্যামেরার দৃশ্য, অন্য ভিডিয়ো, বেতার যোগাযোগের নথি এবং পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষের ফোনের তথ্য সংরক্ষণ করার জন্য পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী ও তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে দেওয়া আগের নির্দেশও পুনর্ব্যক্ত করেছে সুপ্রিম কোর্ট। সমস্ত নথি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটির হাতে তুলে দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালত স্পষ্ট করেছে, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হলেও আচরণবিধি লঙ্ঘনে অভিযুক্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর কোনও বাধা থাকবে না।

অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং মহিলা বিক্ষোভকারীদের নিশানা করে হিংসার অভিযোগগুলি দ্রুত পরীক্ষা করে প্রথম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দিতে কমিটিকে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।