পরীক্ষা যখন ভবিষ্যতের ফয়সালা: ভারত থেকে মেক্সিকো, ক্ষোভে ফুঁসছে ছাত্রসমাজ

যা জানা জরুরি
- পরীক্ষার মরসুমে কিশোর-কিশোরীদের পরিবারে উদ্বেগ নতুন নয়।
- ফল কেমন হবে, পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া যাবে কি না, একটি ভুলে ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে কি না—এই আশঙ্কা সাধারণত ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই…
- কিন্তু এ বছর সেই ব্যক্তিগত উৎকণ্ঠা বিভিন্ন দেশে প্রকাশ্য বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পরীক্ষার মরসুমে কিশোর-কিশোরীদের পরিবারে উদ্বেগ নতুন নয়। ফল কেমন হবে, পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া যাবে কি না, একটি ভুলে ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে কি না—এই আশঙ্কা সাধারণত ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এ বছর সেই ব্যক্তিগত উৎকণ্ঠা বিভিন্ন দেশে প্রকাশ্য বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। ভারত, মেক্সিকো ও পর্তুগালের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, পরীক্ষাব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হলে ছাত্রদের ক্ষোভ কত দ্রুত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ধাবিত হতে পারে।
মেক্সিকোয় সন্দেহজনক ভাবে বহু পরীক্ষার্থীর অস্বাভাবিক বেশি নম্বর পাওয়ার পর প্রায় ৫৮ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়-আবেদনকারীকে নতুন করে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসতে বলা হয়েছে। দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অব মেক্সিকো জানিয়েছে, ব্যাপক নকল বা প্রশ্নফাঁসের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতেই পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত। কিন্তু যাঁরা সততার সঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁদের প্রশ্ন—প্রশাসনের ব্যর্থতার শাস্তি তাঁরা কেন ভোগ করবেন? সেই ক্ষোভ থেকেই রাস্তায় নেমেছেন ছাত্রছাত্রীরা।
পর্তুগালে সংকটের উৎস প্রযুক্তিনির্ভর মূল্যায়নব্যবস্থা। শিক্ষামন্ত্রী ফের্নান্দো আলেকজান্দ্রে পরীক্ষার খাতা দেখা সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ব্যবস্থায় গুরুতর ভুল ধরা পড়ে। বহু শিক্ষার্থীর নম্বর নিয়ে প্রশ্ন ওঠে; ফল সংশোধন ও পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে অভিভাবক, শিক্ষক ও ছাত্রেরা একযোগে আন্দোলন শুরু করেন। কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা-সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে ঘটনাটিকে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।
সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটেছে ভারতে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী। এই সংকটের সঙ্গে একাধিক ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনাও যুক্ত হয়েছে। আন্দোলনের চাপে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। প্রথমে পরীক্ষার স্বচ্ছতার দাবি দিয়ে শুরু হলেও বিক্ষোভ দ্রুত বেকারত্ব, সুযোগের অভাব এবং শিক্ষা-ব্যবসার বিরুদ্ধে বৃহত্তর যুব-আন্দোলনে পরিণত হয়।
এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠে যুবদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। অনলাইনে একটি ব্যঙ্গাত্মক রসিকতা হিসেবে যার যাত্রা শুরু, সেটিই পরে দেশজোড়া প্রতিবাদের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরা সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, পরীক্ষা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, কোচিং ব্যবসা, দালাল এবং অসাধু আধিকারিকদের যোগসাজশে তৈরি হয়েছে একটি শক্তিশালী ‘শিক্ষা মাফিয়া’। তারা ছাত্রদের অসহায়তা ও প্রবল প্রতিযোগিতাকে পুঁজি করে প্রশ্নপত্র চুরি ও বিক্রি করছে।
কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্কলান্ড স্কুল অব এডুকেশনের শিক্ষাবিদ সারা ইটনের মতে, বিশ্বজুড়েই পরীক্ষা আগের চেয়ে অনেক বেশি উত্তেজনা ও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। গত এক দশকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে, প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। ফলে একটি পরীক্ষার ফলই যখন একজন তরুণের উচ্চশিক্ষা, চাকরি ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করে দেয়, তখন তার উপরে তৈরি হয় অসহনীয় চাপ।
এই ব্যবস্থায় নকলকে কেবল ব্যক্তিগত অসততা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছনো যায় না। একটি পরীক্ষার ফলের সঙ্গে যখন গোটা জীবনের সম্ভাবনা জড়িয়ে যায়, তখন অনিয়মেরও প্রাতিষ্ঠানিক বাজার তৈরি হয়। আর বৃহৎ জালিয়াতির সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যর্থতা যুক্ত হলে পরীক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে। ইটনের সতর্কবাণী, একবার সেই বিশ্বাস নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার সমস্যায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আগে পরীক্ষায় নকল বলতে জামার হাতায় লেখা চিরকুট বা বইয়ের পাতা লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া বোঝাত। এখন ক্ষুদ্র ক্যামেরা, অদৃশ্য ইয়ারপিস ও যোগাযোগের আধুনিক সরঞ্জামের সাহায্যে পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে থাকা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব। বাইরে বসা ব্যক্তি ইন্টারনেটে উত্তর খুঁজে দিতে পারেন; প্রয়োজনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যও নিতে পারেন।
ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের কম্পিউটার বিজ্ঞানী টমাস ল্যাঙ্কাস্টারের ভাষায়, পরীক্ষায় নকল এখন প্রায় গুপ্তচরবৃত্তির প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে। পুরনো কায়দায় পরীক্ষার্থীকে সঠিক তথ্য আগে থেকে লিখে নিয়ে যেতে হত এবং অল্প সময়ে তা বুঝে ব্যবহার করতে হত। আধুনিক যোগাযোগ-প্রযুক্তিতে পরীক্ষাকক্ষের বাইরে কার্যত একটি সহায়ক দল তৈরি রাখা যায়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিও তাই নতুন পথ খুঁজছে। ডেনমার্ক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে কিশোর-কিশোরীদের লিখিত প্রবন্ধের পাশাপাশি মৌখিক ভাবে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। উদ্দেশ্য, লেখাটি সত্যিই সংশ্লিষ্ট ছাত্রের কি না এবং সে বিষয়টি বুঝেছে কি না, তা যাচাই করা। ইটনের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক সেকেন্ডে নিখুঁত প্রবন্ধ লিখতে পারলে শুধু প্রবন্ধ দিয়ে শেখার মূল্যায়ন আর নির্ভরযোগ্য নয়। তাই বিকল্প মূল্যায়ন-পদ্ধতি তৈরি করা দরকার।
তবে প্রযুক্তিগত নজরদারি দিয়েই সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষক ও পরীক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না দিয়ে সস্তা প্রযুক্তির হাতে মূল্যায়নের দায়িত্ব তুলে দিলে পর্তুগালের মতো বিপর্যয় ঘটতে পারে। বৃহৎ আকারের যান্ত্রিক পরীক্ষাব্যবস্থা শিক্ষা থেকে মানবিক সম্পর্কটিকেই মুছে দিচ্ছে।
ভারত থেকে মেক্সিকো—ছাত্রবিক্ষোভের মূল বার্তা তাই একই: পরীক্ষা শিক্ষার সহায়ক না হয়ে যদি ভবিষ্যৎ বণ্টনের একমাত্র দরজা হয়ে ওঠে, তবে সামান্য অনিয়মও সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। পরীক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই ধারণা থেকে সরে এসে শেখাকেই আবার শিক্ষার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা এখন জরুরি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



