নাজরানে ড্রোন-দাবি

যা জানা জরুরি
- সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান শহর ফের হুথিদের নিশানায়।
- বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী দাবি করেছে, নাজরান বিমানবন্দর এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় পৃথক দু’টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা।
- হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির দাবি, দু’টি অভিযানই ‘সফল’।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান শহর ফের হুথিদের নিশানায়। বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী দাবি করেছে, নাজরান বিমানবন্দর এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় পৃথক দু’টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির দাবি, দু’টি অভিযানই ‘সফল’। তবে সৌদি আরব বা আরামকোর তরফে এখনও হামলার কোনও নিশ্চিতকরণ মেলেনি।
হুথিদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম ড্রোনটি নাজরান বিমানবন্দরের একটি ‘সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুতে’ আঘাত হানে। দ্বিতীয়টি নিশানা করে আরামকোর একটি স্থাপনা। তবে ঠিক কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, কিংবা বিমান চলাচল ও তেল উৎপাদনে কোনও প্রভাব পড়েছে কি না—সেসব নিয়ে বিস্তারিত জানায়নি হুথিরা।
কেন নাজরান গুরুত্বপূর্ণ
ইয়েমেন সীমান্তের কাছে নাজরান সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল। ইয়েমেন যুদ্ধের সময় বহু বার হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নিশানা হয়েছে এই এলাকা। ফলে বিমানবন্দর ও তেল পরিকাঠামোয় একসঙ্গে হামলার দাবি নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই, ৪ আগস্ট, নাজরান বিমানবন্দরের একটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দাবি করেছিল হুথিরা। সেই দাবিও সৌদি আরব নিশ্চিত করেনি। দু’দিন পর সৌদি সামরিক কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছিল, নাজরান অঞ্চলে হুথিদের গোলাবর্ষণে এক শিশুসহ ১১ জন অসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।
এ বার আরামকোর স্থাপনাকে নিশানা করার দাবি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সৌদি অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ তেলশিল্প। উৎপাদন, পরিশোধন বা পরিবহণ পরিকাঠামোয় বড় ধরনের ক্ষতি হলে তার প্রভাব শুধু সৌদি আরবে নয়, আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও পড়তে পারে। অতীতেও হুথি হামলায় সৌদির তেল স্থাপনায় আগুন লাগা এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
তেল পরিকাঠামোয় চাপ
নাজরানের আগে ৯ আগস্ট জিজান অঞ্চলে আরামকোর একটি তেল শোধনাগারে হামলার দাবিও করেছিল হুথিরা। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, সেখানে আগুন লাগলেও পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ধারাবাহিক ভাবে তেল পরিকাঠামোকে নিশানা করার দাবি থেকে বোঝা যায়, সৌদি শক্তি-ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়ানো হুথিদের অন্যতম কৌশল হয়ে উঠছে।
সংঘাতের আঁচ ছড়িয়েছে সমুদ্রপথেও। ইয়েমেনের মোখা বন্দরে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তাদের দাবি, ২৫টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাত জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ফের ভাঙছে শান্তির বাঁধ
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা-সহ ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই সংঘাত তীব্র হয়। আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করতে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যুদ্ধে নামে। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতিকে অনেকটাই শান্ত করেছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেই ভঙ্গুর শান্তি ফের নড়বড়ে হতে শুরু করেছে। ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বেড়েছে। হুথিরাও সৌদি জাহাজ চলাচলের উপর সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করেছে। এর পর থেকেই সৌদি জাহাজ, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাকে ঘিরে একের পর এক হামলার দাবি সামনে আসছে।
সর্বশেষ নাজরান অভিযানকে হুথিরা সৌদি ড্রোনের সাদা প্রদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের ‘জবাব’ হিসাবেও তুলে ধরেছে। একই সময়ে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর তরফে সৌদি আরবকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ফলে ঘটনাটি ক্রমশ স্থানীয় সৌদি-হুথি সংঘাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার অংশ হয়ে উঠছে।
এখন নজর সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়ার দিকে। হামলার দাবি সত্যি হলে রিয়াধ কী সামরিক জবাব দেয়, আরামকোর স্থাপনায় আদৌ কোনও ক্ষতি হয়েছে কি না এবং নাজরান বিমানবন্দরের পরিষেবা স্বাভাবিক রয়েছে কি না—এই তিনটি বিষয়ই পরবর্তী পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেবে। আপাতত অবশ্য হুথিদের দাবির বাইরে হামলার ক্ষয়ক্ষতির কোনও স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



