ট্রাম্পের দূতের কাশ্মীর সফর: দিল্লির অবস্থানেই সিলমোহর আমেরিকার

যা জানা জরুরি
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন সের্গিও গোর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার জন্য তাঁর বিশেষ দূতও।
- জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার সঙ্গে গোরের বৈঠকটি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
- ২০১৯ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের পরে জম্মু ও কাশ্মীরে গঠিত প্রথম নির্বাচিত সরকারের প্রতি এটি একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের স্বীকৃতি এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বার্তা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন সের্গিও গোর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার জন্য তাঁর বিশেষ দূতও। জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার সঙ্গে গোরের বৈঠকটি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৯ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের পরে জম্মু ও কাশ্মীরে গঠিত প্রথম নির্বাচিত সরকারের প্রতি এটি একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের স্বীকৃতি এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বার্তা।
শ্রীনগরে দাঁড়িয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সের্গিও গোর ঘোষণা করেছেন, জম্মু ও কাশ্মীর ‘‘ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ’’। তাঁর এই মন্তব্যকে কেবল জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের অবস্থানের প্রতি ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য সমর্থন হিসেবেই দেখা হচ্ছে না; পহেলগাম সন্ত্রাসবাদী হামলা এবং অপারেশন সিঁদুরের পরে এটি ইসলামাবাদ ও বেজিংয়ের প্রতিও একটি স্পষ্ট বার্তা বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
কাশ্মীরকে ভারতের ‘‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’’ হিসেবে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্প তাঁর প্রথম দফার শাসনকাল থেকেই গ্রহণ করেছিলেন, শ্রীনগর থেকে গোর কার্যত সেই অবস্থানকেই আরও জোরালো করলেন।
২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার পরে কোনও কর্মরত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এটিই প্রথম স্বতন্ত্র কাশ্মীর সফর।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেনেথ জাস্টার কাশ্মীর সফর করেছিলেন। তবে সেটি ছিল ভারত সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত ১৫ জন বিদেশি দূতের একটি প্রতিনিধিদলের সফর। ওই সময়েই ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের ভারত সফরের প্রস্তুতি চলছিল।
জাস্টার ও গোরের সফরের মধ্যবর্তী সময়ে অন্তত দু’টি মার্কিন প্রতিনিধিদল কাশ্মীরে গিয়েছে। ২০২৩ সালের মে মাসে পর্যটন সংক্রান্ত জি২০ কার্যগোষ্ঠীর বৈঠকে একটি মার্কিন প্রতিনিধিদল যোগ দিয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচনের আগে মার্কিন দূতাবাসের আরও একটি প্রতিনিধিদল কাশ্মীর সফর করে। সেই প্রতিনিধিদল ন্যাশনাল কনফারেন্স সভাপতি হিসেবে ওমর আবদুল্লা এবং উপরাজ্যপাল মনোজ সিনহার সঙ্গে বৈঠক করেছিল।
৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পরে মার্কিন অবস্থানের বিবর্তন
২০১৯ সালে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পর থেকে কাশ্মীর প্রশ্নে আমেরিকার অবস্থানে যে পরিবর্তন এসেছে, ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৯-২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন কাশ্মীর বিষয়ে তুলনামূলক ভাবে সবচেয়ে কম হস্তক্ষেপ করেছিল। তবে মার্কিন প্রশাসনের বিবৃতিগুলি তখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা হত।
২০১৯ সালের ৫ আগস্ট জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বিলোপের দিন মার্কিন বিদেশ দপ্তরের মুখপাত্র মরগ্যান অর্টাগাস বলেছিলেন, ‘‘আটকের খবর নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা ব্যক্তির অধিকারকে সম্মান জানানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছি।’’
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্যও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন অর্টাগাস।
৮ আগস্ট মার্কিন বিদেশ দপ্তরের আর এক মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, আঞ্চলিক অস্থিরতা বৃদ্ধির আশঙ্কা-সহ এই ঘটনাপ্রবাহের বৃহত্তর প্রভাবের দিকে আমেরিকা ‘‘ঘনিষ্ঠ নজর’’ রাখছে।
তিনি বলেছিলেন, ‘‘কাশ্মীর এবং অন্য উদ্বেগের বিষয়গুলি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি আলোচনাকে আমরা সমর্থন করে চলেছি।’’ একই সঙ্গে সব পক্ষকে শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল ওয়াশিংটন।
ওই বছরের ১৬ আগস্ট রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীর নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। তার তিন দিন পরে, ১৯ আগস্ট, ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কথা বলেন। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা কমানো এবং অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখার গুরুত্বের কথা তিনি মোদীকে জানিয়েছিলেন।
পরের দিন মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব মার্ক এসপার ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে কথা বলেন। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীরের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ভারতের ‘‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’’—নয়াদিল্লির এই অবস্থানের প্রশংসা করেন এসপার।
এই প্রথম আমেরিকা প্রকাশ্যে বলেছিল, জম্মু ও কাশ্মীরের ঘটনাপ্রবাহ ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তার আগে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলির মধ্যে রাশিয়াই প্রথম জানিয়েছিল, জম্মু ও কাশ্মীরের পরিবর্তনগুলি ‘‘ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে’’ সম্পন্ন হয়েছে।
তবে ২২ আগস্ট এক মাসের মধ্যে তৃতীয়বার কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। কিন্তু চার দিন পরে ফ্রান্সে জি৭ শীর্ষ বৈঠকের ফাঁকে মোদীর সঙ্গে আলোচনার পরে তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী সত্যিই মনে করেন পরিস্থিতি তাঁর ‘‘নিয়ন্ত্রণে রয়েছে’’।
রাজনৈতিক বন্দিত্ব ও নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগও জানিয়েছিল আমেরিকা
রাজনৈতিক নেতাদের আটক এবং জম্মু ও কাশ্মীরজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিধিনিষেধ আরোপের এক মাস পরে, ২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, আমেরিকা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজনের জন্য নয়াদিল্লির কাছে আবেদনও জানিয়েছিল ওয়াশিংটন।
এর কয়েক সপ্তাহ পরে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে হিউস্টনে প্রবাসী ভারতীয়দের ‘হাউডি মোদী’ অনুষ্ঠানে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের প্রসঙ্গ তোলেন মোদী।
তিনি বলেছিলেন, গত ৭০ বছর ধরে দেশ আরও একটি সমস্যার মুখোমুখি ছিল এবং অল্প কিছুদিন আগেই ভারত সেই সমস্যাকে বিদায় জানিয়েছে। মোদীর দাবি ছিল, ৩৭০ অনুচ্ছেদ জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের মানুষকে উন্নয়ন এবং সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল। সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদে অর্থ জোগানো শক্তিগুলি সেই পরিস্থিতির সুযোগ নিত। দেশের অন্যান্য নাগরিক ভারতীয় সংবিধানের যে অধিকারগুলি পান, জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের মানুষকেও এখন সেই অধিকার দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানকে নিশানা করে মোদী বলেছিলেন, ভারত নিজের সীমানার মধ্যে যে ব্যবস্থা নিয়েছে, তা এমন কিছু মানুষের অস্বস্তির কারণ হয়েছে, যারা নিজেদের দেশই সামলাতে পারে না। তারা অশান্তি চায়, সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন ও লালন করে। আমেরিকার ৯/১১ অথবা মুম্বইয়ের ২৬/১১ সন্ত্রাসবাদী হামলার ষড়যন্ত্রকারীদের কোথায় পাওয়া গিয়েছিল, সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন তিনি।
সন্ত্রাসবাদ এবং তার মদতদাতাদের বিরুদ্ধে নির্ণায়ক লড়াইয়ের সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেছিলেন মোদী। তাঁর দাবি ছিল, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
দিল্লি-ওয়াশিংটন কৌশলগত সম্পর্কের নতুন বার্তা
ছ’বছর পরে ট্রাম্পের বিশেষ দূতের জম্মু ও কাশ্মীর সফর ভারত ও আমেরিকার কৌশলগত সম্পর্ককেই আরও একবার সামনে নিয়ে এল। বিশেষত পহেলগাম হামলা, অপারেশন সিঁদুর এবং তার পরবর্তী ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের শৈত্যের প্রেক্ষাপটে গোরের মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ।
মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার সঙ্গে তাঁর বৈঠকও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের পরে গঠিত জম্মু ও কাশ্মীরের প্রথম নির্বাচিত সরকারের অস্তিত্বকে আমেরিকা যে স্বীকার করছে এবং তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে আগ্রহী, এই বৈঠক তারই ইঙ্গিত।
একই সঙ্গে ‘‘জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ’’—গোরের এই ঘোষণায় ইসলামাবাদের উদ্দেশে কড়া বার্তা রয়েছে। পরিবর্তিত বিশ্ব ভূরাজনীতি এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় নতুন কৌশলগত সমীকরণের মধ্যে বেজিংও যে সেই বার্তার অন্যতম শ্রোতা, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে বিশেষ সংশয় নেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



