কাশ্মীরকে ‘ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ’ বললেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত

যা জানা জরুরি
- জম্মু ও কাশ্মীরকে ‘ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ’ বলে মন্তব্য করেছেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর।
- তাঁর এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসলামাবাদে নিযুক্ত আমেরিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ন্যাটালি বেকারকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানাল পাকিস্তান।
- বুধবার পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকে বেকারকে ডেকে পাঠিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র দেওয়া হয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
জম্মু ও কাশ্মীরকে ‘ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ’ বলে মন্তব্য করেছেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। তাঁর এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসলামাবাদে নিযুক্ত আমেরিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ন্যাটালি বেকারকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানাল পাকিস্তান। বুধবার পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকে বেকারকে ডেকে পাঠিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নেওয়ার পরে এই প্রথম জম্মু ও কাশ্মীর সফরে গিয়েছেন গোর। বুধবার শ্রীনগরে মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার সঙ্গে বৈঠকের পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “এটি ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমি প্রথমবার এখানে এসেছি। জায়গাটি অবিশ্বাস্য রকম সুন্দর এবং এখানে আসতে পেরে আমি আনন্দিত।”
এই মন্তব্যের বিরুদ্ধেই তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে বলেছে, গোরের বক্তব্য ‘তথ্যগত ভাবে ভুল’ ও ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’। জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করার ভাষ্য পাকিস্তান ‘দৃঢ় ভাবে প্রত্যাখ্যান’ করছে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
পাকিস্তানের দাবি, জম্মু ও কাশ্মীর একটি ‘আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত বিতর্কিত অঞ্চল’। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব এবং কাশ্মীরি জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী অঞ্চলটির চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। গোরের বক্তব্য কাশ্মীর নিয়ে আমেরিকার দীর্ঘদিনের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও দাবি করেছে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের প্রাধান্য রক্ষার বিষয়ে ওয়াশিংটনের অঙ্গীকারেরও পরিপন্থী। কাশ্মীর প্রশ্নে আমেরিকার সরকারি প্রতিনিধিদের প্রকাশ্য বক্তব্য যাতে অঞ্চলটির ‘বিতর্কিত অবস্থান’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, ন্যাটালি বেকারের কাছে সেই দাবিও জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গত বছরের চার দিনের সামরিক সংঘর্ষের পরে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতার প্রস্তাবের প্রশংসা করেছে পাকিস্তান। প্রসঙ্গত, সংঘর্ষবিরতি কার্যকর করার কৃতিত্ব বারবার ট্রাম্পকে দিয়েছে ইসলামাবাদ। ভারত অবশ্য গোড়া থেকেই জানিয়েছে, দুই দেশের সামরিক কর্তৃপক্ষের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই সংঘর্ষ বন্ধ হয়েছিল; কোনও তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা ছিল না।
কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের আপত্তির আরও একটি কারণ গোরের সফরের প্রতীকী তাৎপর্য। মার্কিন রাষ্ট্রদূত শুধু শ্রীনগরে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকই করেননি, ডাল হ্রদে শিকারাতেও চড়েছেন। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায় জম্মু ও কাশ্মীর সম্পর্কে আমেরিকার ভ্রমণ-সতর্কতা পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
বর্তমানে জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রে আমেরিকার সর্বোচ্চ স্তরের ‘ভ্রমণ করবেন না’ সতর্কতা বহাল রয়েছে। গোর বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার এবং ওমর আবদুল্লার প্রশাসন অঞ্চলটিকে আরও নিরাপদ করার জন্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ করেছে। এখনই কোনও বড় ঘোষণা করা সম্ভব নয়। তবে ভ্রমণ-সতর্কতা কমানো যায় কি না, তা ওয়াশিংটন খতিয়ে দেখবে। তাঁর কথায়, কাশ্মীরের সৌন্দর্য ও সম্ভাবনা বহু মার্কিন পর্যটককে আকৃষ্ট করতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাও বৈঠকটিকে ‘অত্যন্ত সফল’ বলে বর্ণনা করেছেন। পর্যটন, উদ্যানপালন এবং নতুন অর্থনীতির মতো ক্ষেত্রে জম্মু ও কাশ্মীরের সঙ্গে আমেরিকার যোগাযোগ প্রসারিত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে বৈঠকের আগেই ওমর স্পষ্ট করেছিলেন, জম্মু ও কাশ্মীরের সমস্যার সমাধান দিল্লিকেই করতে হবে, ওয়াশিংটনকে নয়। কোনও বিদেশি রাষ্ট্রদূতের কাছে নিজের প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক অভিযোগ জানানো তাঁর অভ্যাস নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গোরের বক্তব্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ অংশ’ শব্দবন্ধটি তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সরাসরি ‘অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ’ বলেননি। তা সত্ত্বেও ভারতের ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ হিসেবে প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দেওয়া এবং একই সঙ্গে ভ্রমণ-সতর্কতা শিথিল করার সম্ভাবনা উল্লেখ করা,দুই পদক্ষেপকেই কূটনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের পক্ষে কাশ্মীর দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বিষয়টি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ। পাকিস্তান সেই অবস্থান অস্বীকার করে কাশ্মীর প্রশ্নে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ চেয়ে এসেছে। ফলে গোরের শ্রীনগর সফর ও তাঁর মন্তব্যকে ইসলামাবাদ কেবল একটি তাৎক্ষণিক বক্তব্য হিসেবে দেখছে না; দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার কূটনৈতিক অবস্থানে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও বিবেচনা করছে। সেই কারণেই দ্রুত মার্কিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



