চিনকে ঘিরে তিন সংকেত

যা জানা জরুরি
- শি-র স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনা, তাইওয়ানে মার্কিন এফ-১৬, দক্ষিণ চিন সাগরে নতুন ঘাঁটি—এক সপ্তাহে তিন ঘটনাই নজরে এক সপ্তাহে তিনটি ঘটনা চিনকে ঘিরে নতুন করে…
- আমেরিকা সফরের সময় শি জিনপিংয়ের কর্মীদের বার বার বিশ্রামের বিরতি চাওয়া নিয়ে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
- একই সময়ে তাইওয়ানে পৌঁছেছে বহু প্রতীক্ষিত মার্কিন এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
শি-র স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনা, তাইওয়ানে মার্কিন এফ-১৬, দক্ষিণ চিন সাগরে নতুন ঘাঁটি—এক সপ্তাহে তিন ঘটনাই নজরে
এক সপ্তাহে তিনটি ঘটনা চিনকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে। আমেরিকা সফরের সময় শি জিনপিংয়ের কর্মীদের বার বার বিশ্রামের বিরতি চাওয়া নিয়ে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে তাইওয়ানে পৌঁছেছে বহু প্রতীক্ষিত মার্কিন এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান। আর উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, বিতর্কিত দক্ষিণ চিন সাগরের অ্যান্টিলোপ প্রবালপ্রাচীরে পূর্ণাঙ্গ রানওয়ে তৈরি করছে বেজিং।
তিন ঘটনার কোনওটির সঙ্গেই সরাসরি যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু এগুলি চিনের রাজনীতি, তাইওয়ান ঘিরে নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ চিন সাগরে সামরিক উপস্থিতি—তিনটি আলাদা ক্ষেত্রে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শি-র স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনা কেন
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সম্প্রতি আমেরিকা সফরের সময় শি-র কর্মীরা একাধিক বার বিশ্রামের বিরতি চেয়েছিলেন। এমনকি কয়েকটি অনুষ্ঠানের সময়সীমা কমানোর অনুরোধও করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনটির জন্য রাষ্ট্রীয় সফরের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত প্রাক্তন মার্কিন কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলেছে সংবাদপত্রটি। তাঁদের দাবি, চিনা প্রতিনিধিদল হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইংয়ে শি-র জন্য একটি আলাদা ঘরের ব্যবস্থাও চেয়েছিল, যাতে দু’টি অনুষ্ঠানের মাঝখানে তিনি বিশ্রাম নিতে পারেন। ওই ঘরে শুধু শি-র স্ত্রী পেং লিয়ুয়ান থাকার অনুমতি চাওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এই তথ্য থেকেই শি-র স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। তবে এর অর্থ যে তিনি অসুস্থ, এমন কোনও স্বাধীন প্রমাণ সামনে আসেনি।
এর আগেও শি-র স্বাস্থ্য নিয়ে একই ধরনের জল্পনা হয়েছে। ২০১২ সালে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হওয়ার কয়েক মাস আগে কয়েক দিন তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা না যাওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠেছিল। সম্প্রতি সেপ্টেম্বরের গোড়ায় নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে তাঁর ভারত সফরের সময়ও একই ধরনের আলোচনা ছড়িয়েছিল।
চিনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তথ্যপ্রবাহের উপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এই ধরনের জল্পনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নিয়ে সাধারণত খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে আসে না। ফলে শি-র মতো ক্ষমতাশালী নেতার চলাফেরা, শরীরী ভাষা বা প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের সূচিতে সামান্য পরিবর্তনও পর্যবেক্ষকদের নজরে পড়ে।
তবে এই ক্ষেত্রেও বিকল্প ব্যাখ্যা রয়েছে। দীর্ঘ বিমানযাত্রা, বয়স এবং ব্যস্ত সফরসূচির কারণেও কোনও রাষ্ট্রনেতার বিশ্রামের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে আপাতত শি-র স্বাস্থ্য নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা মূলত প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি জল্পনা—নিশ্চিত তথ্য নয়।
দেরিতে হলেও তাইওয়ানে এফ-১৬
অন্য দিকে, এই সপ্তাহেই তাইওয়ানে পৌঁছেছে দু’টি মার্কিন এফ-১৬ভি ব্লক ৭০ যুদ্ধবিমান। ২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদে তাইওয়ানের কাছে ৬৬টি এফ-১৬ভি বিক্রির জন্য প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের চুক্তি অনুমোদন করেছিল আমেরিকা। কিন্তু বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হয়।
২ অক্টোবর তাইওয়ানের শাসক ডেমোক্র্যাটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির আমেরিকাস্থ মিশন জানায়, প্রথম দু’টি যুদ্ধবিমান পৌঁছেছে। দলটির বক্তব্য, এর ফলে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
তবে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র গ্লোবাল টাইমস এই ঘটনাকে অন্য ভাবে দেখেছে। তাদের প্রতিবেদনে তাইওয়ানের উচ্ছ্বাসকে রাজনৈতিক প্রচার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে তাইওয়ানের জন্য নতুন মার্কিন অস্ত্র বিক্রির একটি বড় প্রস্তাব এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকায় এই সরবরাহের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ওই যুদ্ধবিমানগুলি তাইওয়ানে পৌঁছনোর কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের তুলনায় সরবরাহ অনেকটাই পিছিয়ে গিয়েছে।
এর মধ্যেই তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১,৪০০ কোটি ডলারের একটি নতুন মার্কিন অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনুমোদিত হলে সেটিই হবে তাইওয়ানের জন্য এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মার্কিন অস্ত্র প্যাকেজ।
শি জিনপিংয়ের আমেরিকা সফরের সময় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে এ বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের লাইল মরিস। তাঁর মতে, চিনের সঙ্গে সম্পর্কের বৃহত্তর সমীকরণ এবং বেজিংয়ের আপত্তি বিবেচনায় নিয়েই ট্রাম্প প্রশাসন ওই অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোতে পারে।
তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চিন। দ্বীপটির স্বাধীনতার যে কোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে বেজিং। অন্য দিকে, তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকা অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। ফলে এফ-১৬ সরবরাহের প্রতিটি পদক্ষেপেরই বৃহত্তর কৌশলগত তাৎপর্য রয়েছে।
দক্ষিণ চিন সাগরে রানওয়ে
তৃতীয় ঘটনাটি আরও সরাসরি সামরিক পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।
উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, বিতর্কিত দক্ষিণ চিন সাগরের অ্যান্টিলোপ প্রবালপ্রাচীরে একটি পূর্ণাঙ্গ রানওয়ে তৈরি করছে চিন। সামরিক অ্যাটাশে ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কাজ শেষ হলে এটি ওই অঞ্চলে চিনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলির একটি হয়ে উঠতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ঘাঁটিটি চিনা নৌবাহিনীর জাহাজ এবং সামরিক বিমানের কার্যপরিধি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি, হাইনান দ্বীপের দিকে যাতায়াতের জলপথের উপরও নজরদারি বাড়াতে পারবে চিন। হাইনানেই চিন তার পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতাসম্পন্ন সাবমেরিন মোতায়েন করে।
দক্ষিণ চিন সাগর দীর্ঘদিন ধরেই চিন ও একাধিক প্রতিবেশী দেশের বিরোধের কেন্দ্র। ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স-সহ বেশ কয়েকটি দেশ এই অঞ্চলের বিভিন্ন অংশের উপর নিজেদের দাবি জানায়। বিপুল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাব্য মজুতের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হওয়ায় অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্বও অনেক।
গত এক দশকে ওই অঞ্চলে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি, রানওয়ে এবং অন্যান্য সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে চিন তার উপস্থিতি বাড়িয়েছে। আমেরিকা ও তার মিত্ররা এই তৎপরতাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখে। বেজিং অবশ্য দক্ষিণ চিন সাগরে নিজের দাবিকে সার্বভৌম অধিকার হিসেবে তুলে ধরে।
২০১৬ সালে দক্ষিণ চিন সাগর নিয়ে ফিলিপিন্সের করা মামলায় সালিশি ট্রাইব্যুনাল চিনের বিস্তৃত ‘ঐতিহাসিক অধিকার’-ভিত্তিক দাবির পক্ষে আইনি ভিত্তি নেই বলে রায় দিয়েছিল। চিন সেই রায় প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিল, ওই ট্রাইব্যুনালের বিষয়টি বিচার করারই এক্তিয়ার ছিল না।
রায়ের দশ বছর পরেও দক্ষিণ চিন সাগরে চিনের সামরিক ও পরিকাঠামোগত তৎপরতা থামেনি। ফলে নতুন রানওয়ে তৈরির খবরটি ওই বৃহত্তর প্রবণতারই আর একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শি-র স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনা থেকে তাইওয়ানে মার্কিন যুদ্ধবিমান, সেখান থেকে দক্ষিণ চিন সাগরে নতুন সামরিক পরিকাঠামো—তিনটি ঘটনা একই সপ্তাহে সামনে এসেছে। সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও তিন ক্ষেত্রেই চিনকে ঘিরে একটি বিষয় স্পষ্ট: বেজিংকে ঘিরে কৌশলগত প্রতিযোগিতা শুধু কূটনীতির টেবিলে নেই, তার ছাপ পড়ছে নেতৃত্ব, অস্ত্র এবং সমুদ্র—তিন ক্ষেত্রেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



