করোচ জনতা পার্টির কর্মী শেখ আব্দুল হাফিজের বাবা শেখ মহম্মদ মাফিকের মৃত্যুর ঘটনায় খুনের মামলা রুজু করে আট জনকে গ্রেফতার করেছে বাঁকুড়া জেলা পুলিশ। অথচ ঘটনার পাঁচ দিন পরে রাজ্য পুলিশের দাবি, পঞ্চাশ বছর বয়সি মাফিক কোনও ‘নৃশংস শারীরিক আক্রমণের’ শিকার হননি। তাঁর মাথায় সামান্য আঘাত লেগেছিল, যার জন্য মাত্র একটি সেলাই করতে হয়েছিল। রক্তচাপের তীব্র ওঠানামার পরে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশের এই ব্যাখ্যা ঘিরেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—আঘাত যদি সামান্যই হয়ে থাকে, তা হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা কেন?

ককরোচ জনতা পার্টির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা মাফিকের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করার এক দিন পরেই রাজ্য পুলিশ বিবৃতি প্রকাশ করে। সমাজমাধ্যমে ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করে পুলিশ জানায়, ১৩ আগস্ট রাতে বাঁকুড়ার ইন্দাসে হাফিজের বাড়িতে একদল দুষ্কৃতী হাজির হয়েছিল। ওই দিন সকালেই হাফিজ করিসুন্দা পশ্চিমপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে পরিকাঠামোর অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছিলেন। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই রাতে তাঁকে বাড়িতে গিয়ে হেনস্থা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে।

পুলিশের বক্তব্য, ওই ঘটনার সময় হাফিজের বাবা মাফিক সামান্য আঘাত পান। ক্ষতস্থানে একটি সেলাই করতে হয়েছিল। ১৫ আগস্ট সকালে রক্তচাপ মারাত্মক ভাবে ওঠানামা করায় তিনি নিজেই বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে প্রাণঘাতী কোনও আঘাত খুঁজে পাননি বলেও পুলিশের দাবি। ওই দিন রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।

অন্য দিকে, পরিবারটির বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। হাফিজের অভিযোগ, সরকারি বিদ্যালয়ের দুরবস্থা প্রকাশ্যে আনার অপরাধেই স্থানীয় বিজেপি-ঘনিষ্ঠ লোকজন তাঁদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাঁকে মারধর করা হয়। ছেলেকে বাঁচাতে গেলে মাফিকের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল বলে হাফিজের দাবি। হামলাকারীরা তাঁদের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যেতেও বাধা দেয়। পরে চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরেও দ্বিতীয় দফায় তাঁদের উপরে হামলা চালানো হয়েছিল বলে পরিবার অভিযোগ করেছে।

হাফিজ আরও দাবি করেছেন, হামলাকারীরা তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে ঘটনার ভিডিয়ো মুছে দেয়। বিদ্যালয়ের বেহাল দশা এবং হামলার কিছু দৃশ্য তিনি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। সেই ভিডিয়ো অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক মানুষ দেখেছিলেন। অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছতেও প্রায় দু’ঘণ্টা সময় নেয়। ফলে আহত অবস্থায় মাফিককে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

মাফিকের মৃত্যুর পরে দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ এখনও পর্যন্ত আট জনকে গ্রেফতার করেছে। তাঁদের মধ্যে তিন জনের নাম প্রাথমিক অভিযোগপত্রে ছিল; তদন্তে আরও পাঁচ জনের নাম উঠে আসে। আদালত ধৃতদের আট দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। আরও দুই অভিযুক্ত পলাতক। তাঁদের সন্ধানে তল্লাশি চলছে। হাফিজের বাড়িতে পুলিশি প্রহরাও বসানো হয়েছে। পুলিশ মানুষকে ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য’ প্রচার থেকে বিরত থাকার আবেদন জানিয়েছে এবং গুজব ছড়ালে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য ইতিমধ্যেই অভিযুক্তদের সঙ্গে বিজেপির যোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, অভিযুক্তরা অপরাধী; বিজেপি কর্মী নন। আইন অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু পরিবারটির বক্তব্য, হামলাকারীরা এলাকায় পরিচিত বিজেপি সমর্থক। ফলে ঘটনাটি এখন রাজনৈতিক সংঘর্ষের রূপ নিয়েছে।

আশুতোষ রাঙ্কা এবং সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ মাফিকের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন। ঘটনায় জড়িত প্রত্যেককে গ্রেফতার করার জন্য রাজ্য সরকারকে দশ দিনের সময়সীমাও দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। দাবি পূরণ না হলে যন্তর মন্তরের আন্দোলনের আদলে পশ্চিমবঙ্গেও বৃহত্তর আন্দোলন শুরু করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের বিবৃতি অবশ্য কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। মাফিকের আঘাত যদি সত্যিই সামান্য হয়ে থাকে, তবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী? ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কী পাওয়া গিয়েছে? হামলা, চিকিৎসায় বিলম্ব এবং পরবর্তী মৃত্যুর মধ্যে কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। পরিবারটি প্রথম থেকেই গুরুতর আক্রমণের অভিযোগ তুললেও পুলিশ কেন এত দিন পরে ‘একটি সেলাই’-এর ব্যাখ্যা সামনে আনল, সেই প্রশ্নও উঠছে।

খুনের ধারায় মামলা এবং একই সঙ্গে ‘সামান্য আঘাত’-এর সরকারি দাবি—এই দুই অবস্থানের আপাত অসঙ্গতিই বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে। ময়নাতদন্ত, চিকিৎসার নথি এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত মাফিকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে সংশয় কাটার সম্ভাবনা কম।