শান্ত স্বভাব, মৃদুভাষী এবং ভদ্র রাজনীতিক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। আড়াই দশক ধরে নির্বাচনী রাজনীতিতে থাকলেও বিরোধীদের আক্রমণ করতে তাঁকে সচরাচর চড়া সুর ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। তবে অধ্যাপনা থেকে রাজনীতিতে আসা এই নেতার দীর্ঘ পথ একেবারে বিতর্কমুক্তও ছিল না। জীবনের শেষ পর্বে দুর্নীতির অভিযোগ, দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং নির্বাচনী পরাজয় তাঁকে প্রবল মানসিক চাপের মধ্যে ফেলেছিল বলে ঘনিষ্ঠদের দাবি।

১৯৫১ সালে রামপুরহাটে জন্ম আশিসের। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি করার পরে তিনি রামপুরহাট কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচিত হয়েছিলেন। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি ছিলেন সময়নিষ্ঠ ও দায়িত্ববান শিক্ষক। তাঁর উদ্ধার হওয়া কথিত শেষ চিঠিতেও বিনা পারিশ্রমিকে বহু ছাত্রকে পড়ানোর কথা রয়েছে।

১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আশিস। ২০০১ সালে প্রথম রামপুরহাট থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। তারপর ২০০৬, ২০১১, ২০১৬ ও ২০২১—পরপর পাঁচবার আসনটি ধরে রাখেন। তৃণমূল সরকারে আয়ুষ, শিক্ষা, কৃষি-সহ একাধিক দফতরের দায়িত্ব সামলানোর পরে ২০২১ সালে বিধানসভার উপাধ্যক্ষ হন।

তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের পিছনে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অনুব্রত মণ্ডলের নেতৃত্বাধীন বীরভূমের শক্তিশালী তৃণমূল সংগঠনের ভূমিকাও ছিল। কিন্তু জেলার গোষ্ঠী-রাজনীতিতে আশিসের অবস্থান বরাবরই কিছুটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। অনুব্রতর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও ঘনিষ্ঠ, কখনও দূরত্বপূর্ণ ছিল বলে দলীয় সূত্রের দাবি। প্রকাশ্যে সংঘাত এড়ালেও জেলার সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর অসন্তোষ চাপা থাকেনি।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে ২৪ হাজারের বেশি ভোটে পরাজয় ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা। নির্বাচনের পরে তিনি তৃণমূলের বীরভূম জেলা কোর কমিটির চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দেন। কমিটির কাজকর্ম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশকারী প্রাক্তন লাভপুর বিধায়ক অভিজিৎ সিংহের বক্তব্যকেও সমর্থন করেছিলেন। এরপর থেকেই সক্রিয় রাজনীতি থেকে তিনি ক্রমশ দূরে সরে যান।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় তারাপীঠ–রামপুরহাট উন্নয়ন পর্ষদের কাজকর্ম নিয়ে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। উদ্ধার হওয়া কথিত চিঠিতে আশিস দাবি করেছেন, পর্ষদের সাধারণ সভায় উপস্থিত থাকা ছাড়া তাঁর কোনও প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল না। তিনি দরপত্র কমিটির সদস্য ছিলেন না, চেকে স্বাক্ষর করতেন না এবং নির্মাণ পরিকল্পনার অনুমোদন বা অনাপত্তিপত্র দেওয়ার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন না। তাঁকে পরিকল্পিতভাবে কলঙ্কিত করা হয়েছে বলেও চিঠিতে অভিযোগ রয়েছে। তবে চিঠিটির সত্যতা এবং সমস্ত অভিযোগই এখনও তদন্তাধীন।

একজন মৃদুভাষী অধ্যাপক কীভাবে ক্ষমতার রাজনীতির জটিলতার মধ্যে ক্রমে একা হয়ে পড়েছিলেন, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন তারই করুণ দৃষ্টান্ত। পাঁচবারের বিধায়ক, মন্ত্রী ও উপাধ্যক্ষ হওয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাঁর কথিত উপলব্ধি ছিল—রাজনীতিতে আসাই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

আশিস বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের আত্মহত‍্যা, চিরকুটে দাবি—‘কাজের বিনিময়ে একটি পয়সাও নিইনি’