ছুটির রাতে হাওয়া চার অমূল্য ছবি!

যা জানা জরুরি
- মেসিনার রাস্তায় তখন ‘লা ভারা’ উৎসবের ব্যস্ততা।
- আর সেই সুযোগেই শহরের আঞ্চলিক জাদুঘরে হানা দিয়ে রেনেসাঁর অমূল্য চার শিল্পকর্ম নিয়ে চম্পট চোরেরা।
- উধাও শিল্পী আন্তোনেল্লো দা মেসিনার চারটি কাজ—যার তিনটি তাঁর বিখ্যাত পলিত্তিকো দি সান গ্রেগোরিও বেদিচিত্রের অংশ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ইতালির জাতীয় ছুটির রাত। মেসিনার রাস্তায় তখন ‘লা ভারা’ উৎসবের ব্যস্ততা। আর সেই সুযোগেই শহরের আঞ্চলিক জাদুঘরে হানা দিয়ে রেনেসাঁর অমূল্য চার শিল্পকর্ম নিয়ে চম্পট চোরেরা। উধাও শিল্পী আন্তোনেল্লো দা মেসিনার চারটি কাজ—যার তিনটি তাঁর বিখ্যাত পলিত্তিকো দি সান গ্রেগোরিও বেদিচিত্রের অংশ।
ঘটনাটি শুধু একটি দুঃসাহসিক চুরি নয়, মেসিনার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে বড় আঘাত। কারণ ভূমিকম্প, ধ্বংস আর পাঁচ শতাব্দীর ঝড়ঝাপটা পেরিয়েও যে শিল্পকর্মগুলি টিকে ছিল, সেগুলিই এবার হারিয়ে গেল জাদুঘরের নিরাপদ প্রদর্শনীকক্ষ থেকে।
উৎসবের ভিড়ে জাদুঘরে হানা
শনিবার সন্ধ্যায় মেসিনার আঞ্চলিক জাদুঘর—‘মিউজেও রেজিওনালে দি মেসিনা’, স্থানীয়দের কাছে ‘মুমে’—এ ঢোকে চোরেরা। ১৫ আগস্টের ‘লা ভারা’ উৎসব এবং গোটা ইতালির ‘ফেরাগোস্তো’ জাতীয় ছুটির ব্যস্ততাকে তারা কাজে লাগিয়েছিল বলেই প্রাথমিক তদন্তে অনুমান।
জাদুঘরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অ্যালার্ম কীভাবে অকার্যকর করা হয়েছিল, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে চোরেরা একটি সুরক্ষিত প্রদর্শনী বাক্স ভেঙে সেখান থেকে কাঠের চারটি চিত্রফলক তুলে নেয়।
আরও চমকপ্রদ বিষয়, জাদুঘর থেকে মোট ছ’টি ছবি বাইরে নিয়ে গিয়েছিল তারা। কিন্তু পরে দু’টি ছবি একটি নিচু দেওয়ালের উপর ফেলে রেখে যায়। কেন? তাড়াহুড়ো, বহনে অসুবিধা, নাকি পরিকল্পনার কোনও পরিবর্তন—এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা।
হারাল ‘সান গ্রেগোরিও’-র তিন অংশ
চুরি যাওয়া চারটি কাজের মধ্যে তিনটি আন্তোনেল্লোর বিখ্যাত পলিত্তিকো দি সান গ্রেগোরিও-র অংশ। মেসিনার সান গ্রেগোরিও মঠের জন্য তৈরি এই বেদিচিত্রটি একসময় ছ’টি পৃথক চিত্রফলক নিয়ে গঠিত ছিল। সময়ের সঙ্গে একটি হারিয়ে যায়। এত দিন টিকে থাকা পাঁচটির মধ্যে তিনটিই এবার চুরি হয়ে গেল।
শিল্পকর্মটির ইতিহাসও কম নাটকীয় নয়। ১৯০৮ সালের ভয়াবহ মেসিনা ভূমিকম্পে সান গ্রেগোরিও মঠ ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের সেই বিপর্যয়েও আন্তোনেল্লোর কাজগুলি বেঁচে ছিল। তাঁর জন্মশহরে টিকে থাকা অল্প কয়েকটি শিল্পকর্মের মধ্যে এটিই ছিল একমাত্র কাজ, যা কখনও মেসিনার বাইরে যায়নি।
অর্থাৎ পাঁচ শতাব্দী ধরে শহরের ইতিহাসের সঙ্গে থাকা শিল্পকর্মগুলি শেষ পর্যন্ত হারাল জাদুঘরের ভিতর থেকেই।
ছোট ছবিটিও অমূল্য
চুরি যাওয়া চতুর্থ কাজটি আকারে ছোট হলেও গুরুত্বে কোনও অংশে কম নয়। দুই পাশে আঁকা এই চিত্রটির এক দিকে দেখা যায় শিশু যিশুকে কোলে নিয়ে কুমারী মেরি এবং তাঁদের সামনে হাঁটু গেড়ে থাকা এক ফ্রান্সিসকান সন্ন্যাসী। অন্য পাশে রয়েছে যিশুখ্রিস্টের প্রতিকৃতি।
একসময় ছবিটি ছিল উইলহেল্ম সোলডান সংগ্রহে। ২০০৩ সালে ক্রিস্টিজের নিলামের মাধ্যমে এটি সিসিলির আঞ্চলিক সরকারের সংগ্রহে আসে। একই বছর কাজটি আন্তোনেল্লো দা মেসিনার বলে শনাক্ত করা হয়। ফলে শিল্পমূল্যের পাশাপাশি এর উৎস ও পরিচয় নিয়েও গবেষণামূলক গুরুত্ব রয়েছে।
‘অপরিসীম ক্ষতি’
জাদুঘরের অধিকর্তা মারিসা মেরকুরিও ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত গুরুতর ও তাৎপর্যপূর্ণ ক্ষতি’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, চুরি যাওয়া কাজগুলির সাংস্কৃতিক, শিল্পগত ও প্রতীকী মূল্য শুধু মেসিনা নয়, গোটা সিসিলির জন্যই অপরিসীম। এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য দ্রুত শিল্পকর্মগুলি উদ্ধার করা।
শিল্প-ইতিহাসবিদ ভ্যালেন্তিনা চের্তোর কাছেও ঘটনাটি নিছক চুরি নয়। মেসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত এই গবেষক মনে করেন, শহরের ঐতিহাসিক স্মৃতিতেই যেন গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে।
চের্তোর মতে, ভূমিকম্প, ধ্বংস এবং পাঁচ শতাব্দীর ইতিহাস পেরিয়ে বেঁচে থাকা এই শিল্পকর্মগুলি মেসিনার অতীতের সঙ্গে বর্তমানের দৃশ্যমান সেতু ছিল। সেগুলিকে এভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া তাই অর্থমূল্যে মাপার মতো ক্ষতি নয়।
রেনেসাঁয় নতুন আলো এনেছিলেন আন্তোনেল্লো
আনুমানিক ১৪৩০ সালে জন্ম নেওয়া আন্তোনেল্লো দা মেসিনা নেপলসে শিল্পশিক্ষা লাভ করেন। সেখানে প্রোভঁস ও ফ্লেমিশ শিল্পীদের কাজের সঙ্গে পরিচিত হন। পরে সেই প্রভাব মিশে যায় তাঁর নিজস্ব শিল্পভাষায়।
ইতালীয় শিল্পে ফ্লেমিশ তৈলচিত্রের কৌশল জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে আন্তোনেল্লোর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ছবিতে দেখা যায় কোমল রঙ, স্বচ্ছ স্তরের সূক্ষ্ম ব্যবহার এবং আলো-ছায়ার মৃদু পরিবর্তন। ছোট চিত্রফলকেও অসাধারণ সূক্ষ্মতা ও বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতে পারতেন তিনি।
কালোবাজারে বিক্রি কতটা সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক কালোবাজারে এই ছবিগুলি গোপনে বিক্রি করা সহজ হবে না। আন্তোনেল্লোর কাজ বিশ্বজোড়া পরিচিত, প্রতিটি শিল্পকর্মের নথিও রয়েছে। ফলে প্রকাশ্যে এগুলির লেনদেন করা প্রায় অসম্ভব।
তবে চুরি যাওয়া বিখ্যাত শিল্পকর্ম অতীতে গোপন সংগ্রাহকের হাতে পৌঁছেছে। কখনও আবার অপরাধীচক্র সেগুলিকে মুক্তিপণ আদায় বা দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেছে। তাই উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
মেসিনার কাছে এই চুরি তাই চারটি ছবির অনুপস্থিতির গল্প নয়। এটি এমন এক শহরের স্মৃতিতে নতুন ক্ষত, যে শহর ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়েছে, বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজের শিল্পঐতিহ্য আঁকড়ে থেকেছে।
সেই ইতিহাসের সাক্ষী চারটি ছবি এখন নেই। জাদুঘরের ফাঁকা প্রদর্শনী বাক্স তাই শুধু একটি নিরাপত্তাব্যর্থতার চিহ্ন নয়—মেসিনার অতীতের একটি টুকরো যেন রাতারাতি অদৃশ্য হয়ে গেছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



