বাংলাস্ফিয়ার: বিনায়ক দামোদর সাভারকর সম্পর্কে মন্তব্যের জেরে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মানহানির মামলা খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে লখনউয়ের নিম্ন আদালতের জারি করা সমনও বাতিল করা হয়েছে। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, রাহুলের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নেওয়া হয়নি। আইনে যেখানে সেই অনুমোদন বাধ্যতামূলক, সেখানে তা ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়া এগোতে পারে না।

২০২২ সালে মহারাষ্ট্রে একটি বক্তৃতায় রাহুল গান্ধী সাভারকরকে ব্রিটিশদের ‘চাকর’ বলে উল্লেখ করেছিলেন বলে অভিযোগ। তিনি নাকি বলেছিলেন, সাভারকর ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে পেনশন নিতেন। ওই মন্তব্যকে অবমাননাকর দাবি করে লখনউয়ের আইনজীবী নৃপেন্দ্র পাণ্ডে একটি ব্যক্তিগত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে লখনউয়ের একটি আদালত রাহুলকে সমন পাঠায়।

নিম্ন আদালতের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাহুল প্রথমে ইলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল হাইকোর্ট তাঁর আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপর তিনি সুপ্রিম কোর্টে যান। তাঁর পক্ষে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি।

গত ২৫ এপ্রিল মামলাটির শুনানির সময় সাভারকর সম্পর্কে রাহুলের মন্তব্যে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি মনমোহনের বেঞ্চ। আদালত তখন বলেছিল, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পর্কে এভাবে মন্তব্য করা যায় না। ভবিষ্যতে একই ধরনের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করলে রাহুলের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার প্রক্রিয়া শুরু করা হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছিল।

বিচারপতি দত্ত শুনানির সময় প্রশ্ন করেছিলেন, মহাত্মা গান্ধীও যে ভাইসরয়কে লেখা চিঠিতে ‘আপনার বিশ্বস্ত সেবক’ ধরনের সম্ভাষণ ব্যবহার করেছিলেন, রাহুল তা জানেন কি না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাহুলের ঠাকুমা তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও সাভারকরের প্রশংসা করে চিঠি লিখেছিলেন। ইতিহাস না জেনে বা তার প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পর্কে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করা উচিত নয় বলে বেঞ্চ মন্তব্য করেছিল।

রাহুলের বক্তব্য নিয়ে আদালত কঠোর মনোভাব দেখালেও মামলার আইনি ভিত্তি সম্পর্কে তখনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছিল। বেঞ্চ জানিয়েছিল, মামলা চালানোর জন্য সরকারি অনুমোদনের প্রশ্নে রাহুলের আইনি যুক্তিতে যথেষ্ট জোর রয়েছে। সেই কারণে নিম্ন আদালতে চলা বিচারপ্রক্রিয়ার উপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়।

শুক্রবার মামলাটি ফের শুনানির জন্য উঠলে বিচারপতি দত্ত উত্তরপ্রদেশ সরকারের আইনজীবীর কাছে জানতে চান, রাহুলের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর সরকারি অনুমোদন কোথায়। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতেই হবে। রাজ্য সরকারের আইনজীবী এমন কোনও অনুমোদন আদালতের সামনে পেশ করতে পারেননি।

অভিযোগকারীর আইনজীবীও স্বীকার করে নেন, এই মামলায় সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন ছিল এবং তা নেওয়া হয়নি। তবে তাঁর আবেদন ছিল, নিম্ন আদালতের নির্দেশ বাতিল করে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনার জন্য আবার ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হোক। অর্থাৎ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন সংগ্রহের সুযোগ রেখে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার পথ খোলা থাকুক।

কিন্তু সেই আবেদন মানতে অস্বীকার করে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি দত্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, অনুমোদন যখন আবশ্যক এবং সেই অনুমোদন যখন নেই, তখন সেখানেই বিষয়টির সমাপ্তি। ফলে মামলাটি নিম্ন আদালতে ফেরত পাঠানোর কোনও প্রশ্ন ওঠে না। আদালত ফৌজদারি মানহানির অভিযোগ এবং রাহুলের বিরুদ্ধে জারি করা সমন দু’টিই বাতিল করে দেয়।

এই রায়ে রাহুল গান্ধী বড় আইনি স্বস্তি পেলেও তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের আগের সতর্কবার্তা বহাল রয়েছে। আদালত তাঁর মন্তব্যের সত্যতা বা সাভারকরের ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। মামলাটি খারিজ হয়েছে মূলত নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার কারণে।

রায়টির তাৎপর্য এখানেই যে, কোনও বক্তব্য আপত্তিকর বা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত মনে হলেই ফৌজদারি মামলা চালানো যায় না। অভিযোগ গ্রহণ থেকে সমন জারি—প্রতিটি পর্যায়ে আইনের শর্ত মানতে হয়। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন না থাকলে গোটা বিচারপ্রক্রিয়াই আইনি বৈধতা হারায়। একই সঙ্গে আদালতের বার্তা, জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাক্‌স্বাধীনতা থাকলেও ইতিহাস ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে মন্তব্য করার সময় তাঁদের দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।