ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৫ আগস্ট কেন, পাকিস্তান এক দিন আগে উদ্যাপন করে কেন

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: একই ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য ভেঙে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম।
- দুটি দেশের স্বাধীনতার আইনি ভিত্তিও ছিল একই—১৯৪৭ সালের ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন’।
- সেই আইনেই বলা হয়েছিল, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন অধিরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: একই ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য ভেঙে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম। দুটি দেশের স্বাধীনতার আইনি ভিত্তিও ছিল একই—১৯৪৭ সালের ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন’। সেই আইনেই বলা হয়েছিল, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন অধিরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে। তা হলে পাকিস্তান কেন ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করে? আর ১৫ আগস্ট দিনটিই বা কে, কেন বেছে নিয়েছিলেন?
ক্ষমতা হস্তান্তর এগিয়ে আনা হয় কেন
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলি প্রথমে ঘোষণা করেছিলেন, ১৯৪৮ সালের জুন মাসের মধ্যে ভারতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু শেষ ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ভারতে এসে বুঝতে পারেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মধ্যে সহযোগিতা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানের দাবি ক্রমশ কঠোর হচ্ছিল। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছিল সাম্প্রদায়িক হিংসা। এই পরিস্থিতিতে মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় দশ মাস এগিয়ে ১৯৪৭ সালের আগস্টে নিয়ে আসেন।
‘মাউন্টব্যাটেন অ্যান্ড দ্য পার্টিশন অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, ধীরগতিতে এগোনোর সুযোগ আর ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। ১৯৪৮ সালের জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করলে গোটা প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারত। তাই নির্দিষ্ট ও কাছাকাছি একটি তারিখ ঘোষণা করাই তাঁর কাছে জরুরি বলে মনে হয়েছিল।
১৫ আগস্ট কেন বেছে নিয়েছিলেন মাউন্টব্যাটেন
১৫ আগস্ট তারিখটি বেছে নেওয়ার পিছনে ভারতের ইতিহাস বা সংস্কৃতির কোনও বিশেষ তাৎপর্য ছিল না। দিনটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল মাউন্টব্যাটেন এবং ব্রিটিশ সামরিক ইতিহাসের কাছে।
মাউন্টব্যাটেন নিজেই জানিয়েছিলেন, জাপানের আত্মসমর্পণের বার্ষিকী স্মরণে তিনি ১৫ আগস্টকে বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে সম্রাট হিরোহিতো জাপানের আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির বিজয়ের অন্যতম স্মরণীয় দিন ছিল সেটি।
ভারতের ভাইসরয় হওয়ার আগে মাউন্টব্যাটেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। ১৯৪৩ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৪৬ সালের জুন পর্যন্ত তিনি বার্মা, ভারত এবং সংলগ্ন অঞ্চলে জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ফলে ১৫ আগস্ট তাঁর কাছে ব্যক্তিগত এবং সামরিক—দুই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
মাউন্টব্যাটেন পরে স্বীকার করেছিলেন, তাঁকে একটি তারিখ ঘোষণা করতেই হত এবং জাপানের আত্মসমর্পণের বার্ষিকী তাঁর কাছে ‘ভাল তারিখ’ বলে মনে হয়েছিল। অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার দিন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভারতীয়দের আবেগ বা দেশভাগের সম্ভাব্য পরিণতির চেয়ে ব্রিটিশ সামরিক বিজয়ের স্মৃতিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল।
মাত্র কয়েক সপ্তাহে দেশভাগের আইন
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ছিল অত্যন্ত দ্রুত। ১৯৪৭ সালের ৪ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ভারতীয় স্বাধীনতা বিল পেশ করা হয়। মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যে আইনটি পাশ হয়ে যায়। সেই আইন অনুসারে ১৫ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি নতুন অধিরাজ্যের জন্ম হওয়ার কথা নির্ধারিত হয়।
স্বাধীন ভারতের গভর্নর জেনারেল হিসেবে ১৫ আগস্ট গণপরিষদে ভাষণ দিতে গিয়ে মাউন্টব্যাটেন তাঁর দ্রুত সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ভারতে পৌঁছনোর এক সপ্তাহের মধ্যেই বুঝেছিলেন, ১৯৪৮ সালের জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করা বিপজ্জনক। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও দাঙ্গা এমন মাত্রায় পৌঁছেছিল, যার গভীরতা তিনি ইংল্যান্ডে থাকার সময় উপলব্ধি করতে পারেননি। গোটা উপমহাদেশে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
অনেক ইতিহাসবিদ অবশ্য মনে করেন, ব্রিটিশরা এত তাড়াহুড়ো না করলে দেশভাগের অভিঘাত সামলানোর জন্য উন্নততর প্রশাসনিক ব্যবস্থা করা যেত। সীমান্ত নির্ধারণ, জনবিনিময়, শরণার্থীদের পুনর্বাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যথাযথ প্রস্তুতি থাকলে বিপুল প্রাণহানি অন্তত কিছুটা কমানো সম্ভব হত।
মাউন্টব্যাটেন অবশ্য আজীবন নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল, একবার দেশভাগের নীতি মেনে নেওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব তা কার্যকর করাই সব পক্ষের স্বার্থে ছিল।
পাকিস্তান কেন ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করে
আইন অনুসারে পাকিস্তানের জন্মও ১৫ আগস্টই হয়েছিল। পাকিস্তানের প্রথম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ডাকটিকিটেও ১৫ আগস্টকে স্বাধীনতার দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা পাকিস্তানে সম্পন্ন হয় ১৪ আগস্ট, করাচিতে।
এর পিছনে ছিল মূলত প্রশাসনিক ও যাতায়াতজনিত কারণ। মাউন্টব্যাটেন তখনও অবিভক্ত ভারতের ভাইসরয়। পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তাঁকে উপস্থিত থাকতে হয়েছিল। আবার ১৫ আগস্ট তাঁকেই স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব নিতে এবং দিল্লির অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হত।
একই দিনে করাচি ও নয়াদিল্লিতে দুটি অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠান এক দিন আগে, ১৪ আগস্ট করাচিতে করা হয়। মাউন্টব্যাটেন অনুষ্ঠান শেষ করে দিল্লিতে ফিরে ভারতের স্বাধীনতা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
১৯৪৮ সাল থেকে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ আগস্টকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে। যদিও আইনি বিচারে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল ১৫ আগস্টই।
দিনটি বেছে নেওয়ার পিছনে একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ইসলামি বর্ষপঞ্জি অনুসারে রমজান মাসের ২৭তম রাতের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যা মুসলমানদের কাছে পবিত্র বলে বিবেচিত। তবে পাকিস্তানের ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালনের প্রধান ঐতিহাসিক কারণ ছিল মাউন্টব্যাটেনের দুই রাজধানীতে দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন।
ফলে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার আইনি তারিখ এক হলেও, ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠানের সময়সূচিই শেষ পর্যন্ত দুই দেশের স্বাধীনতা দিবসকে আলাদা করে দিয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



