এআইও কি ‘চুপ’?

যা জানা জরুরি
- চিনের কোনও কৃত্রিম মেধা-চালিত কথোপকথন-যন্ত্রকে দেশের রাজনীতি, তিয়েনআনমেনের ঘটনা কিংবা শি চিনফিং সম্পর্কে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করলে উত্তরটা প্রায়ই একই রকম—প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া, নয়তো চিনা…
- কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, গল্পটা শুধু চিনের প্রযুক্তিতে আটকে নেই।
- আমেরিকায় তৈরি ChatGPT, Claude, Gemini এবং Llama-র মতো কৃত্রিম মেধা ব্যবস্থার উত্তরের মধ্যেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
চিনের কোনও কৃত্রিম মেধা-চালিত কথোপকথন-যন্ত্রকে দেশের রাজনীতি, তিয়েনআনমেনের ঘটনা কিংবা শি চিনফিং সম্পর্কে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করলে উত্তরটা প্রায়ই একই রকম—প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া, নয়তো চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সরকারি ভাষ্যই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, গল্পটা শুধু চিনের প্রযুক্তিতে আটকে নেই। আমেরিকায় তৈরি ChatGPT, Claude, Gemini এবং Llama-র মতো কৃত্রিম মেধা ব্যবস্থার উত্তরের মধ্যেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
কেন এমন হচ্ছে?
গবেষকদের একটি বড় অংশের মতে, এর শিকড় রয়েছে কৃত্রিম মেধার প্রশিক্ষণ-পদ্ধতিতেই। বিপুল পরিমাণ অনলাইন লেখা, সংবাদ, সরকারি নথি এবং সামাজিক মাধ্যমের তথ্য ঘেঁটে বৃহৎ ভাষা-প্রযুক্তি বা এলএলএমকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই বিপুল তথ্যভান্ডারে চিনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম এবং সরকারি প্রচারসামগ্রীও থাকে।
সমস্যা হল, একটি কৃত্রিম মেধা ব্যবস্থা সব সময় বুঝতে পারে না কোন তথ্য নিরপেক্ষ সংবাদ, আর কোনটি কোনও কর্তৃত্ববাদী সরকারের পরিকল্পিত প্রচার। অস্ট্রেলিয়ার আইনবিদ এবং মেটার স্বাধীন তদারকি পর্ষদের সদস্য নিকোলাস সুজর এই বিষয়টিকে প্রশিক্ষণ-প্রক্রিয়ার একটি ‘অনিচ্ছাকৃত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
শাসকের সমালোচনায় এআইয়ের দ্বিধা
মেটার তদারকি পর্ষদের গবেষণায় আরও চমকপ্রদ একটি বিষয় উঠে এসেছে। OpenAI, Anthropic, Google এবং Meta-র তৈরি কৃত্রিম মেধা ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সমালোচনা করার তুলনায় কর্তৃত্ববাদী শাসকদের সমালোচনা করতে বেশি দ্বিধা দেখিয়েছে বলে দাবি গবেষকদের।
একটি পরীক্ষায় Anthropic-এর Claude Sonnet 4 ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক প্রচারপত্র তৈরি করতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু শি চিনফিং এবং তাইল্যান্ডের রাজা মহা ভাজিরালংকর্নের বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রচারপত্র তৈরিতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ হিসেবে দেখানো হয় নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ।
Gemini এবং Llama-র ক্ষেত্রেও কিছু পরীক্ষায় একই ধরনের অসাম্য দেখা গিয়েছে।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে সব ক্ষেত্রেই চিনা প্রচার সরাসরি আমেরিকান কৃত্রিম মেধার উত্তর নিয়ন্ত্রণ করছে। সমস্যার আর একটি দিক রয়েছে—নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
চিন বা তাইল্যান্ডের মতো দেশে রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করলে ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা, এমনকি কারাদণ্ডও হতে পারে। ফলে ব্যবহারকারীকে সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা করতে কৃত্রিম মেধার ব্যবস্থায় কিছু নিরাপত্তাবিধি রাখা হয়। কিন্তু সেই নিরাপত্তাই যদি শাসকের সমালোচনা আটকে দেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটি কি ব্যবহারকারীর সুরক্ষা, নাকি অজান্তেই রাজনৈতিক সেন্সরশিপ?
এক ভাষায় এক উত্তর, অন্য ভাষায় আরেক
উদ্বেগের আরেকটি জায়গা হল ভাষা।
ইংরেজিতে চিনের রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যাচ্ছে, একই প্রশ্ন চিনা ভাষায় করলে কখনও কখনও তা অনেক বেশি বেজিং-ঘেঁষা হয়ে উঠছে। Nature-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় OpenAI এবং Anthropic-এর চারটি ব্যবস্থার উত্তরে এই প্রবণতা দেখা গিয়েছে।
এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও রয়েছে। চিনা ভাষার অনলাইন জগতে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত এবং সরকারি প্রচারসামগ্রীর উপস্থিতি তুলনামূলক ভাবে বেশি। অন্যদিকে ইংরেজি ভাষার অনলাইন পরিসরে চিন সম্পর্কে স্বাধীন সংবাদ, গবেষণা এবং নানা ধরনের মতামতের পরিমাণ অনেক বেশি। ফলে একই ঘটনা নিয়ে দুই ভাষার তথ্যভান্ডার থেকে তৈরি উত্তরেও পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ, কৃত্রিম মেধা যদি তথ্যের বিশাল সমুদ্র থেকে শেখে, সেই সমুদ্রের জলই যদি এক জায়গায় বেশি নোনা হয়, তার উত্তরের স্বাদও বদলে যেতে পারে।
নিরপেক্ষতা কি শুধু কথার কথা?
OpenAI জানিয়েছে, কোনও বিষয় সংবেদনশীল বা বিতর্কিত হলেই তাদের প্রযুক্তির সেটি এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। Anthropic-ও দাবি করেছে, সাম্প্রতিক সংস্করণগুলিতে অপ্রয়োজনীয় ভাবে প্রশ্ন প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা কমানো হয়েছে।
কিন্তু গবেষকদের বক্তব্য, শুধু নিরপেক্ষ থাকার প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। ব্যবহারকারীর জানা দরকার—কৃত্রিম মেধা কোন ধরনের তথ্যের উপর প্রশিক্ষিত, রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমের উপাদান সেখানে কতটা প্রভাব ফেলেছে এবং একই প্রশ্নের উত্তর ভাষা বদলালে কেন পাল্টে যাচ্ছে।
কারণ কৃত্রিম মেধা এখন শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যন্ত্র নয়। কোটি কোটি মানুষ খবর বোঝা, ইতিহাস জানা, রাজনীতি নিয়ে ধারণা তৈরি করা এবং বিতর্কিত বিষয় সম্পর্কে মত গড়ে তুলতেও এর উপর নির্ভর করছেন।
সেন্সরশিপের নতুন ঠিকানা?
কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলি বহু বছর ধরেই অনলাইন পরিসরকে নিজেদের প্রচারে ব্যবহার করে আসছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যমের প্রচার এবং পরিকল্পিত তথ্যপ্রবাহের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা নতুন কিছু নয়।
কিন্তু সেই প্রচার যদি ধীরে ধীরে কৃত্রিম মেধার প্রশিক্ষণ-তথ্যের অংশ হয়ে যায়, তখন বিপদটা আরও বড়। কারণ তখন সেন্সরশিপ কোনও নির্দিষ্ট দেশের ইন্টারনেটের সীমানায় আটকে থাকবে না।
চিনের প্রচার হয়তো চিনেই তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তার ছায়া যদি আমেরিকান কৃত্রিম মেধার উত্তরে এসে পড়ে, তা হলে সেন্সরশিপের সীমান্তও আর ভৌগোলিক থাকে না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



