হাইলাইটস

  • বারুইপুরে ১১ বছরের নাবালিকার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় উত্তাল রাজ্য।
  • নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ভিড়।
  • তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের নেতারা এলাকায় পৌঁছতেই বিক্ষোভ।
  • ‘চোর’, ‘গদ্দার’, ‘গো ব্যাক’ স্লোগানে সরব একদল বিক্ষোভকারী।
  • বিদ্রোহী নেতাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে তাঁদের কর্মসূচি ভণ্ডুলের চেষ্টা হয়েছে।
  • পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র।

বাংলাস্ফিয়ার: ১১ বছরের এক নাবালিকার ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্কে স্তব্ধ বারুইপুর। সেই আবহেই মৃতার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দাবিতে একের পর এক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এলাকায় পৌঁছতে শুরু করেছেন। কিন্তু সমবেদনার রাজনীতি খুব দ্রুতই রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক সংঘাতে। বিশেষ করে তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের নেতারা এলাকায় পৌঁছতেই তাঁদের লক্ষ্য করে ওঠে ‘চোর’, ‘গদ্দার’, ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

ঘটনার পর থেকেই নিহত নাবালিকার বাড়িতে মানুষের ভিড় লেগেই রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা, সামাজিক সংগঠন, শিশু অধিকারকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা পরিবারের সঙ্গে দেখা করছেন। প্রত্যেকেই দ্রুত বিচার এবং দোষীদের কঠোরতম শাস্তির দাবি তুলেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের এই ধারাবাহিক সফরকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।

মঙ্গলবার তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের এক প্রতিনিধিদল বারুইপুরে পৌঁছলে তাঁদের ঘিরে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, একটি দল তাঁদের উদ্দেশে ‘চোর’, ‘গদ্দার’, ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিতে থাকে। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে আলাদা করে দেয়। পরে নিরাপত্তার বলয়ে প্রতিনিধিদলটি নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে।

বিদ্রোহী শিবিরের নেতাদের অভিযোগ, তাঁদের সফরকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এক নেতা বলেন, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি করতে যাননি; শুধুমাত্র শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সংগঠিতভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে পরিবেশ উত্তপ্ত করার চেষ্টা হয়েছে। তাঁর দাবি, এই ধরনের আচরণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী।

অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের একাংশের বক্তব্য, যাঁরা এত দিন ক্ষমতায় থেকে এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেননি, তাঁদের এখন সমবেদনা জানাতে আসার নৈতিক অধিকার নেই। সেই ক্ষোভ থেকেই প্রতিবাদ হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। তবে বিক্ষোভকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি সামনে এসেছে। পুলিশ এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি।

ঘটনার জেরে এলাকায় নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। নিহত নাবালিকার বাড়ির আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের আগমনকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তার জন্য প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সফরের আগে ও পরে পরিস্থিতির উপর নজরদারি চালানো হচ্ছে।

বারুইপুরের এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অব্যাহত। শাসক ও বিরোধী—উভয় পক্ষই সরকারের ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং তদন্তের গতি নিয়ে একে অপরকে আক্রমণ করছে। বিরোধীদের অভিযোগ, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ব্যর্থ। শাসকপক্ষের পাল্টা দাবি, এই মর্মান্তিক ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে।

এদিকে নিহত নাবালিকার পরিবারের বক্তব্য একেবারেই স্পষ্ট। তাঁদের দাবি, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক বিতর্কে যেতে চান না। পরিবারের এক সদস্য বলেন, তাঁদের একমাত্র চাওয়া, প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। রাজনৈতিক তরজার বদলে বিচারই তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তদন্তকারী সংস্থা ইতিমধ্যেই তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ফরেনসিক রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান, ডিজিটাল তথ্য এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহের কাজও এগোচ্ছে। তদন্তকারীদের বক্তব্য, আদালতে শক্তিশালী মামলা উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ঘটনার পর থেকেই এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ প্রবল। বহু মানুষ মোমবাতি মিছিল, প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ ছিল। এই ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই আরও প্রকট করে তুলেছে।

রাজনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে অতীতে বহু সংবেদনশীল অপরাধের ঘটনাতেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্রুত উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। কিন্তু বারুইপুরের ঘটনায় সেই প্রতিযোগিতা আরও স্পষ্ট। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করা যেমন রাজনৈতিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তেমনই প্রতিপক্ষ অভিযোগ করছে, এই সফরগুলির লক্ষ্য মূলত রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া।

তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা ‘চোর’, ‘গদ্দার’, ‘গো ব্যাক’ স্লোগান সেই রাজনৈতিক সংঘাতকেই আরও সামনে এনে দিয়েছে। যদিও বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, এই ধরনের স্লোগান তাঁদের অবস্থান বদলাবে না এবং তাঁরা ভবিষ্যতেও মানুষের পাশে থাকবেন। অন্যদিকে শাসক শিবিরের একাংশের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভকেই প্রতিফলিত করেছে ওই বিক্ষোভ।

পুলিশ জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাই তাদের প্রথম দায়িত্ব। কোনও পক্ষ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকায় এখনও টহল জোরদার রয়েছে এবং পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে।

নাবালিকার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যেমন এগোচ্ছে, তেমনই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপও ক্রমশ বাড়ছে। তবে নিহতের পরিবারের আবেদন একটাই—রাজনৈতিক সংঘাত নয়, দ্রুত বিচার হোক। সেই দাবিই এখন বারুইপুরের শোকাহত মানুষের কণ্ঠে সবচেয়ে জোরালোভাবে ধ্বনিত হচ্ছে।