হাইলাইটস
- ইন্দোনেশিয়ার সংসদে ভাষণে বিজু পট্টনায়কের ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রশংসা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
- স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ডাচ অবরোধ ভেঙে ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ নেতাদের ভারতে নিয়ে আসার ঘটনাকে স্মরণ করেন তিনি।
- বলেন, ওই অভিযান ভারত-ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করেছিল।
- তবে এই অভিযানের নেপথ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগ বা নির্দেশের কথা তাঁর ভাষণে উঠে আসেনি।
- স্বাধীনতার পর থেকেই ইন্দোনেশিয়ার পাশে ভারতের অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেন মোদি।
বাংলাস্ফিয়ার: ইন্দোনেশিয়া সফরে সে দেশের সংসদে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর কূটনৈতিক ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় স্মরণ করলেন। ভাষণের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে ছিল Biju Patnaik-এর সেই দুঃসাহসিক অভিযানের কথা, যা শুধু ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামকেই নতুন গতি দেয়নি, দুই দেশের বন্ধুত্বের ভিতও মজবুত করেছিল। তবে ইতিহাসের সেই ঘটনার প্রসঙ্গ তুললেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী Jawaharlal Nehru-এর ভূমিকাকে তিনি উল্লেখ করেননি।
জাকার্তার সংসদে ভাষণ দিতে গিয়ে মোদি বলেন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ১৯৪৫ সালে এবং ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই ভারত আন্তর্জাতিক স্তরে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার দাবিকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছিল। রাষ্ট্রসংঘেও ভারত ছিল ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম প্রধান সমর্থক।
এরপরই তিনি বিজু পট্টনায়কের প্রসঙ্গ তোলেন। মোদির কথায়, সেই সংকটময় সময়ে বিজু পট্টনায়ক যেভাবে ইন্দোনেশিয়ার প্রধানমন্ত্রী Sutan Sjahrir এবং উপরাষ্ট্রপতি Mohammad Hatta-কে নিরাপদে ভারতে নিয়ে এসেছিলেন, তা দুই দেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। তাঁর এই সাহসিকতা আজও ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার বন্ধুত্বের অন্যতম প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়।
ইতিহাস বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। জাপানের আত্মসমর্পণের পর ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট প্রেসিডেন্ট Sukarno ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শক্তি নেদারল্যান্ডস সেই স্বাধীনতাকে মেনে নিতে অস্বীকার করে। ডাচ বাহিনী আবারও ইন্দোনেশিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক অভিযান শুরু করে। দেশের বিভিন্ন অংশে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী সুতান স্যাহরির এবং উপরাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ হাত্তাসহ একাধিক নেতাকে কার্যত নজরবন্দি করে রাখা হয়। ডাচ প্রশাসন স্থল, জল ও আকাশ—তিন পথেই কঠোর অবরোধ গড়ে তোলে, যাতে কোনও নেতা বিদেশে গিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায় করতে না পারেন।
ঠিক এই সময় ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী Jawaharlal Nehru ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান এবং বিশ্বমঞ্চে তাদের বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। তাঁর অনুরোধেই অভিজ্ঞ বৈমানিক বিজু পট্টনায়ক নিজের বিমান নিয়ে ডাচ অবরোধ ভেঙে জাকার্তায় প্রবেশ করেন।
অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সেই অভিযানে বিজু পট্টনায়ক ডাচ বাহিনীর নজর এড়িয়ে সুতান স্যাহরির ও মোহাম্মদ হাত্তাকে নিয়ে ভারতে পৌঁছে আসেন। সেই সময় এই অভিযান ছিল কার্যত মৃত্যুকে তুচ্ছ করার সামিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এর ফলে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার প্রশ্নটি বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে এবং ডাচদের উপর কূটনৈতিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
পরবর্তী সময়ে ইন্দোনেশিয়া বিজু পট্টনায়কের এই অবদানের বিশেষ স্বীকৃতি দেয়। তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানগুলির অন্যতম বিনতাং জাসা উতামা প্রদান করা হয়। ইন্দোনেশিয়ায় আজও তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিদেশি বন্ধু হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। তাঁর নামে রাস্তা, স্মারক এবং বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা নিবেদনের নজির রয়েছে।
মোদির ভাষণে ভারত-ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কের বর্তমান দিকও উঠে আসে। তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক নয়, হাজার বছরের সাংস্কৃতিক, সামুদ্রিক ও সভ্যতাগত যোগাযোগের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, সমুদ্র নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশ ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও নয়াদিল্লি ও জাকার্তার সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে ভাষণের একটি বিষয় রাজনৈতিক মহলেও নজর কেড়েছে। বিজু পট্টনায়কের বীরত্বপূর্ণ অভিযানের প্রশংসা করলেও, সেই অভিযানের নেপথ্যে থাকা Jawaharlal Nehru-এর উদ্যোগ বা নির্দেশের কোনও উল্লেখ করেননি প্রধানমন্ত্রী। ঐতিহাসিক নথি ও বিভিন্ন গবেষণায় এই অভিযানের পরিকল্পনা ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে নেহরুর সক্রিয় ভূমিকার কথা বারবার উঠে এসেছে। ফলে ভাষণে তাঁর অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে এই বিতর্কের বাইরে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্কের ইতিহাসে বিজু পট্টনায়কের সেই দুঃসাহসিক উড়ান আজও এক অনন্য অধ্যায়। স্বাধীনতার লড়াইয়ে এক প্রতিবেশী দেশের পাশে ভারতের দাঁড়িয়ে থাকার যে ঐতিহাসিক নজির তিনি সৃষ্টি করেছিলেন, জাকার্তার সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি সেই স্মৃতিকেই নতুন করে বিশ্বদরবারে তুলে ধরলেন।