কলকাতায় ২০৯, হাওড়ায় ৬৮ ওয়ার্ড: বিধানসভায় পাশ দুই বিল, উৎসবের পরেই পুরভোটের প্রস্তুতি

যা জানা জরুরি
- কলকাতা ও হাওড়া—রাজ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ পুরনিগমের নির্বাচনী মানচিত্র আমূল বদলাতে চলেছে।
- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এক দিনের বিশেষ অধিবেশনে বুধবার ধ্বনিভোটে পাশ হয়েছে দু’টি সংশোধনী বিল।
- নতুন ব্যবস্থায় কলকাতা পুরনিগমের ওয়ার্ডসংখ্যা ১৪৪ থেকে বেড়ে হবে ২০৯।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কলকাতা ও হাওড়া—রাজ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ পুরনিগমের নির্বাচনী মানচিত্র আমূল বদলাতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এক দিনের বিশেষ অধিবেশনে বুধবার ধ্বনিভোটে পাশ হয়েছে দু’টি সংশোধনী বিল। নতুন ব্যবস্থায় কলকাতা পুরনিগমের ওয়ার্ডসংখ্যা ১৪৪ থেকে বেড়ে হবে ২০৯। অন্য দিকে, হাওড়া পুরনিগমে ৫০টির পরিবর্তে থাকবে ৬৮টি ওয়ার্ড। বিল দু’টি রাজ্যপালের সম্মতি পাওয়ার পরেই শুরু হবে ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। সব কাজ সময়মতো শেষ হলে চলতি বছরের উৎসবের মরসুমের পরেই দুই পুরনিগমে নির্বাচন হতে পারে।
বিধানসভায় পাশ হওয়া বিল দু’টি হল কলকাতা পুরনিগম (সংশোধনী) বিল, ২০২৬ এবং হাওড়া পুরনিগম (দ্বিতীয় সংশোধনী) বিল, ২০২৬। কলকাতায় নতুন করে ৬৫টি এবং হাওড়ায় ১৮টি ওয়ার্ড যুক্ত হবে। সরকারের যুক্তি, গত কয়েক দশকে জনসংখ্যার বিন্যাস, বসতি বিস্তার এবং শহরের ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক চরিত্রে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। পুরনো ওয়ার্ড কাঠামো ধরে রেখে বিপুল সংখ্যক নাগরিককে যথাযথ পরিষেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিল পেশ করে পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, ওয়ার্ড পুনর্গঠনের মূল লক্ষ্য নাগরিক পরিষেবা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কোনও কোনও ওয়ার্ডে জনসংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, আবার অন্যত্র তুলনায় কম। নতুন সীমানা নির্ধারিত হলে এক জন কাউন্সিলরের অধীনে নাগরিকের সংখ্যা আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে বলে সরকারের দাবি। ফলে রাস্তা, পানীয় জল, নিকাশি, জঞ্জাল অপসারণ এবং স্থানীয় শংসাপত্রের মতো পরিষেবা পরিচালনাও সহজ হওয়ার কথা।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় জানান, বিল পাশ মানেই সরকার নিজে ওয়ার্ডের সীমানা স্থির করে দিচ্ছে না। রাজ্যপালের সম্মতি পাওয়ার পরে রাজ্য নির্বাচন কমিশন পুর দফতর, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতর এবং অন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সহায়তায় সীমানা পুনর্নির্ধারণ করবে। প্রথমে খসড়া মানচিত্র প্রকাশিত হবে। তার আগে একটি সর্বদলীয় বৈঠক এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে আরও একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হবে। আপত্তি ও পরামর্শ জানানোর সুযোগও দেওয়া হবে। গোটা প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় ৬০ দিন লাগতে পারে।
তবে বিরোধীরা ওয়ার্ড বাড়ানোর নীতির সরাসরি বিরোধিতা না করলেও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ও তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক ফিরহাদ হাকিম বলেন, সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভাবে আমলাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা প্রয়োজন। কোন নীতি, জনসংখ্যার হিসাব বা ভৌগোলিক মাপকাঠিতে নতুন ওয়ার্ড তৈরি হবে, সরকারকে তা স্পষ্ট করতে হবে। কোনও বিশেষ সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে সীমানা বদলানো হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তিনি তুলেছেন।
বিধায়ক জাভেদ খান দাবি করেন, কলকাতার বর্তমান জনসংখ্যা বিবেচনা করলে ২০৯টিরও বেশি ওয়ার্ডের প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষত দক্ষিণ কলকাতা, কসবা ও যাদবপুর অঞ্চলে জনবসতি দ্রুত বেড়েছে। তাঁর প্রস্তাব, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের আবেদন ও আপত্তি গ্রহণ করে ওয়ার্ডভিত্তিক শুনানির ব্যবস্থা করা হোক।
হাওড়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন দীর্ঘদিন বকেয়া থাকায় এই বিলের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেশি। শেষ নির্বাচিত পুরবোর্ডের মেয়াদ ২০১৮ সালে শেষ হওয়ার পর থেকে সেখানে স্থায়ী নির্বাচিত বোর্ড নেই। বালি পুরসভাকে হাওড়া পুরনিগম থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রশ্ন এবং সংশ্লিষ্ট আইনি জটিলতায় নির্বাচন আটকে ছিল। ফেব্রুয়ারিতে পাশ হওয়া আগের সংশোধনী বিলটি রাজ্যপাল অতিরিক্ত তথ্য চেয়ে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। নতুন সরকার সেটি প্রত্যাহার করে ওয়ার্ডসংখ্যা ৬৮ করার নতুন বিল এনেছে।
অগ্নিমিত্রা পাল হাওড়ার জন্য ৪৬২ কোটি টাকার বিশেষ উন্নয়ন-পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন। এতে রাস্তা মেরামত, পরিশোধিত পানীয় জলের সরবরাহ বাড়ানো এবং জল জমার দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে স্থায়ী নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। কাজ শুরু হতে পারে ২০২৭ সালে। মন্ত্রীর অভিযোগ, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে নির্বাচন না হওয়া এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থার কারণে হাওড়া পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের প্রায় ২০০ কোটি টাকার বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কর্মী ও ঠিকাদারদের পাওনা মিলিয়ে পুরনিগমের দায় ৪০০ কোটি টাকারও বেশি।
সরকার জানিয়েছে, নির্বাচনের দিন দলীয় দফতরে বসে নির্ধারণ করা হবে না; রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা হবে। তবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহকে সম্ভাব্য সময় ধরে প্রশাসনিক প্রস্তুতি এগোচ্ছে। অর্থাৎ রাজ্যপালের সম্মতি, সীমানা পুনর্নির্ধারণ, আপত্তি নিষ্পত্তি এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডের তালিকা তৈরির কাজ নির্বিঘ্নে মিটলে দুর্গাপুজো ও কালীপুজোর পরেই কলকাতা ও হাওড়া—দুই শহর এক বড় পুরনির্বাচনের মুখোমুখি হতে চলেছে।
কলকাতা ও হাওড়ায় ওয়ার্ড বাড়ানো হচ্ছে কেন
সরকারের ঘোষিত কারণ মূলত তিনটি—জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অসম জনবণ্টন এবং নাগরিক পরিষেবা উন্নত করা। তবে এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে।
কলকাতা পুরনিগমের বর্তমান ১৪৪টি ওয়ার্ডের আয়তন ও জনসংখ্যা সমান নয়। বিশেষত কসবা, যাদবপুর, গড়িয়া, ঠাকুরপুকুর এবং দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার নতুন আবাসন এলাকাগুলিতে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। অথচ মধ্য ও উত্তর কলকাতার কয়েকটি পুরনো এলাকায় জনসংখ্যা স্থির রয়েছে বা কমেছে। ফলে কোনও কাউন্সিলরকে বিপুল সংখ্যক মানুষের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে, আবার কোনও ওয়ার্ডে ভোটার তুলনায় অনেক কম। এই বৈষম্য কমাতেই কলকাতায় ৬৫টি নতুন ওয়ার্ড তৈরির কথা বলা হয়েছে।
সরকারের দ্বিতীয় যুক্তি, ওয়ার্ড ছোট হলে নাগরিক পরিষেবা দেওয়া সহজ হবে। রাস্তা, পানীয় জল, নিকাশি, জঞ্জাল অপসারণ, পথবাতি এবং স্থানীয় শংসাপত্রের মতো পরিষেবার উপরে কাউন্সিলরের নজরদারি বাড়বে। কাউন্সিলর-পিছু নাগরিকের সংখ্যা কমলে সাধারণ মানুষও জনপ্রতিনিধির কাছে সহজে পৌঁছতে পারবেন।
হাওড়ার সমস্যাটি কিছুটা আলাদা। বালি পুরসভাকে হাওড়া পুরনিগমের সঙ্গে যুক্ত করা এবং পরে ফের বিচ্ছিন্ন করার কারণে ওয়ার্ডসংখ্যা ও সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা ছিল। তার সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নির্মাণ, জল জমা, পানীয় জল এবং নিকাশির সমস্যা যুক্ত হয়েছে। তাই বর্তমান ৫০টি ওয়ার্ডকে ভেঙে ৬৮টি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বিরোধীদের বক্তব্য, এই সিদ্ধান্তের পিছনে শুধুই প্রশাসনিক প্রয়োজন নেই। ওয়ার্ডের সীমানা বদলালে প্রতিটি এলাকার ভোটার বিন্যাসও বদলে যায়। কোনও একটি বিরোধী-প্রভাবিত ওয়ার্ডকে কয়েক ভাগে ভাগ করা অথবা তার অংশ অন্য ওয়ার্ডে জুড়ে দেওয়া হলে নির্বাচনী ফল পাল্টে যেতে পারে। কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম তাই প্রশ্ন তুলেছেন, কোনও বিশেষ সম্প্রদায় বা রাজনৈতিক সমর্থকগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে সীমানা আঁকা হচ্ছে কি না।
অর্থাৎ, আইন দু’টি শুধু ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়িয়েছে। কোন পাড়া কোন ওয়ার্ডে যাবে, কোথায় সীমানা টানা হবে এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে কত ভোটার থাকবেন—এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। রাজ্য নির্বাচন কমিশনই সেই পুনর্বিন্যাস করবে। খসড়া প্রকাশের পরে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ আপত্তি জানাতে পারবেন।
সুতরাং প্রশাসনিক ভাষায় কারণ হল—বর্ধিত জনসংখ্যার সঙ্গে পুর পরিষেবার সামঞ্জস্য আনা। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নতুন সীমানাই অনেকাংশে নির্ধারণ করতে পারে আসন্ন কলকাতা ও হাওড়া পুরভোটে কোন দল কতটা সুবিধা পাবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



