ব্রাসেলস: পৃথিবীর উষ্ণায়নের দৌড়ে সবাইকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে ইউরোপ। শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় মহাদেশটির গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই প্রায় ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। বিশ্বজুড়ে গড় বৃদ্ধি যেখানে প্রায় ১.৪ ডিগ্রি, ইউরোপে তা প্রায় দ্বিগুণ।
আর এই উষ্ণতা এখন আর শুধু আবহাওয়ার পরিসংখ্যান নয়। তাপপ্রবাহ, দাবানল, খরা, আকস্মিক বন্যা ও ঝড়ের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমশ আরও ঘনঘন এবং ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, উষ্ণায়নের এই গতি থামানো না গেলে পরিস্থিতি আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে।
কেন ইউরোপ এত দ্রুত গরম হচ্ছে?
এর পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, উত্তর মেরু পৃথিবীর গড় হারের তুলনায় অনেক দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। ইউরোপের বড় অংশ মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মহাদেশটির আবহাওয়ায়।
বরফ ও তুষারের আস্তরণ কমে যাওয়ায় সূর্যের আলো আগের মতো মহাশূন্যে প্রতিফলিত হচ্ছে না। বরং তা শোষিত হচ্ছে স্থলভাগ ও সমুদ্রের পৃষ্ঠে। ফলে আরও বাড়ছে তাপমাত্রা—আর তাপমাত্রা বাড়ায় আরও দ্রুত গলছে বরফ। তৈরি হচ্ছে এক ভয়ংকর চক্র।
দ্বিতীয় কারণ বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তিত গতিপ্রকৃতি। অনেক সময় শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় ইউরোপের উপর দীর্ঘদিন আটকে থাকে। তৈরি হয় তথাকথিত ‘তাপগম্বুজ’। শীতল বাতাসের প্রবেশ বাধা পেয়ে একই এলাকায় বন্দি হয়ে থাকে উষ্ণ বায়ু। দিনের পর দিন চলতে থাকে তাপপ্রবাহ, রাতেও তাপমাত্রা খুব একটা নামে না।
ফলে শরীরও রাতের শীতলতার সুযোগ পায় না। বাড়তে থাকে তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি।
তৃতীয় কারণটি খানিকটা অপ্রত্যাশিত। ইউরোপে বায়ুদূষণ কমানোর সাফল্যের ফলে সালফার-জাতীয় দূষণকণার পরিমাণও কমেছে। এই কণাগুলি সূর্যের আলো আংশিক প্রতিফলিত করে সাময়িক শীতলতার আবরণ তৈরি করত।
দূষণ কমা নিঃসন্দেহে জনস্বাস্থ্যের জন্য ভাল খবর। কিন্তু এর ফলে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে তৈরি প্রকৃত উষ্ণায়ন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অর্থাৎ সমাধান দূষণ বাড়ানো নয়—গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমানো।
গরমে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি
উষ্ণায়নের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে মানুষের শরীরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, গত দুই দশকে ইউরোপে গরমজনিত মৃত্যুর হার প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
বয়স্ক মানুষ, শিশু, গর্ভবতী নারী, হৃদ্রোগী, শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষ এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। দীর্ঘ সময় প্রবল গরমে থাকলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। বাড়ে হৃদ্রোগ, কিডনির সমস্যা, জলশূন্যতা এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি।
২০২২ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপে গরমের সঙ্গে সম্পর্কিত ৬০ হাজারের বেশি মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন হিসাব জানিয়েছে। পরের বছরও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৭ হাজারের বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ইউরোপে জলবায়ু-সম্পর্কিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে তীব্র তাপ।
নদী শুকোচ্ছে, ফসল কমছে, বাড়ছে আগুন
উষ্ণায়নের অভিঘাত শুধু মানুষের শরীরে থেমে নেই। দীর্ঘস্থায়ী খরায় নদী ও জলাধারের জল কমছে। রাইন ও দানিউবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীতে জলস্তর নেমে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে পণ্য পরিবহণ।
পরমাণু ও তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিও সমস্যায় পড়ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের শীতলীকরণে প্রয়োজন পর্যাপ্ত জল, কিন্তু খরার সময় সেই জলই হয়ে উঠছে দুর্লভ।
কৃষিতেও তার প্রভাব স্পষ্ট। ভুট্টা, সূর্যমুখী এবং বিভিন্ন ফলের উৎপাদন কমছে। শুকিয়ে যাওয়া মাটি সামান্য স্ফুলিঙ্গকেও বড় দাবানলে পরিণত করছে।
আবার উষ্ণ বাতাস বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে। ফলে বৃষ্টি এলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ জল নেমে আসছে। তৈরি হচ্ছে আকস্মিক বন্যা। পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ গলার ফলে বাড়ছে ভূমিধস ও হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণের আশঙ্কা।
সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ায় উপকূলীয় এলাকাতেও তৈরি হচ্ছে নতুন ঝুঁকি। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র, বাড়ছে চরম আবহাওয়ার আশঙ্কা।
কোপার্নিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবা এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পর্যবেক্ষণেও ইউরোপের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে উষ্ণায়নের কোনও না কোনও গুরুতর প্রভাবের ছবি উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা—তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রতিটি অতিরিক্ত দশমিকও মানুষের জীবন ও অর্থনীতির উপর ঝুঁকি বাড়ায়।
শুধু ছাতা-গাছ দিয়ে কি ঠেকবে বিপদ?
ইউরোপের বহু শহর ইতিমধ্যেই তাপ মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনা নিচ্ছে। তৈরি হচ্ছে শীতল আশ্রয়কেন্দ্র, বাড়ছে ছায়াযুক্ত রাস্তা ও সবুজ এলাকা, বসানো হচ্ছে পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং উন্নত করা হচ্ছে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা।
কিন্তু অভিযোজনেরও একটা সীমা রয়েছে।
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমানো, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ এবং ভবন ও নগর পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
ইউরোপের অভিজ্ঞতা তাই গোটা বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা—জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনও দূরবর্তী বিপদ নয়। তার উত্তাপ ইতিমধ্যেই মানুষের ঘরে, শরীরে এবং জীবনে পৌঁছে গিয়েছে।