কোচিং মালিকের সঙ্গে যোগসাজশ: নিট প্রশ্নফাঁসে অভিযুক্ত এনটিএ বিশেষজ্ঞ

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: নিট-ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নফাঁসের তদন্তে জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার অন্দরমহলের সঙ্গে কোচিং ব্যবসার সরাসরি যোগসাজশের নতুন তথ্য সামনে এল।
- কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআইয়ের দাবি, এনটিএ-র নিযুক্ত রসায়নের বিষয়-বিশেষজ্ঞ পি ভি কুলকার্নি মহারাষ্ট্রের লাতুরের একটি কোচিং কেন্দ্রের মালিকের ছেলেকে পরীক্ষার আগেই ১৩২টি প্রশ্ন…
- হাসপাতালের একটি ‘ডিলাক্স’ ঘরে টানা তিন দিন ধরে বিশেষ পাঠের আড়ালে ওই প্রশ্নগুলি লিখিয়ে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: নিট-ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নফাঁসের তদন্তে জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার অন্দরমহলের সঙ্গে কোচিং ব্যবসার সরাসরি যোগসাজশের নতুন তথ্য সামনে এল। কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআইয়ের দাবি, এনটিএ-র নিযুক্ত রসায়নের বিষয়-বিশেষজ্ঞ পি ভি কুলকার্নি মহারাষ্ট্রের লাতুরের একটি কোচিং কেন্দ্রের মালিকের ছেলেকে পরীক্ষার আগেই ১৩২টি প্রশ্ন দিয়েছিলেন। হাসপাতালের একটি ‘ডিলাক্স’ ঘরে টানা তিন দিন ধরে বিশেষ পাঠের আড়ালে ওই প্রশ্নগুলি লিখিয়ে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, লাতুরের রেনুকাই কেরিয়ার সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা শিবরাজ রঘুনাথ মোটেগাঁওকরের ছেলে আদিত্য ওই বিশেষ পাঠে যোগ দিয়েছিলেন। জায়গাটি ছিল লাতুরের সিদ্ধিবিনায়ক হাসপাতাল। হাসপাতালের মালিক তথা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মনোজ ভগবানরাও শিরুরে কুলকার্নি ও আদিত্যের বৈঠকের ব্যবস্থা করেছিলেন বলে অভিযোগ। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে হাসপাতালের একটি ডিলাক্স ঘরে তিন দিন ধরে ওই পাঠ চলেছিল। হাসপাতালের এক কর্মীর সাক্ষ্যেও এই ব্যবস্থার কথা উঠে এসেছে বলে সিবিআই জানিয়েছে।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, এনটিএ-র হয়ে নিটের রসায়ন প্রশ্ন তৈরি ও মারাঠিতে অনুবাদের কাজে যুক্ত থাকার সুবাদে কুলকার্নির কাছে গোপন প্রশ্নভাণ্ডার পৌঁছেছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই তিনি আদিত্যকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের নামে প্রকৃত পরীক্ষার প্রশ্ন লিখিয়ে দেন। পরে আদিত্যের কাছ থেকে সেগুলি পান তাঁর বাবা শিবরাজ। প্রশ্নগুলি হাতে লিখে মোবাইলে ছবি তুলে রাখা হয়েছিল।
শিবরাজের ব্যবহৃত একটি মোবাইল থেকে ৩৬টি ছবি উদ্ধার করে সিবিআই। তার মধ্যে পাঁচটি ছিল একই ছবির অনুলিপি। ছবিগুলিতে মোট ১৩২টি হাতে লেখা রসায়নের প্রশ্ন পাওয়া যায়। এনটিএ-র নিট-ইউজি ২০২৬-এর মূল প্রশ্নভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে তদন্তকারীরা দেখেছেন, সেগুলির মধ্যে অন্তত ১১১টি প্রশ্ন হুবহু অথবা প্রায় সম্পূর্ণ মিলে গিয়েছে। মোবাইলের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ৩ মে পরীক্ষার প্রায় দশ দিন আগে, ২৩ এপ্রিল নাগাদ ছবিগুলি তোলা হয়েছিল। ফলে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নগুলি অভিযুক্তদের হাতে পৌঁছে গিয়েছিল বলে সিবিআইয়ের দাবি।
এই গোপন প্রশ্ন পাওয়ার জন্য শিবরাজ মোটেগাঁওকর পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ। সিবিআই জানিয়েছে, শিবরাজের স্ত্রী ওই টাকা শিরুরের হাতে তুলে দেন। পরে শিরুরে টাকাটি তাঁর বোনের বাড়িতে রেখে দিয়েছিলেন। তদন্তকারীরা সেখান থেকেই পাঁচ লক্ষ টাকা উদ্ধার করেছেন। শিরুরের আইনজীবীরা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তাঁর মক্কেলের কাছ থেকে কোনও ফাঁস হওয়া প্রশ্ন বা সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিন নথি পাওয়া যায়নি।
তদন্তে আরও দাবি করা হয়েছে, শিরুরে দুই চিকিৎসকের সন্তানকেও কুলকার্নির কাছে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকে তিন লক্ষ টাকা দিয়ে রসায়নের প্রশ্ন পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ। সেই অর্থের একটি অংশ শিরুরে পেয়েছিলেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের কয়েকজন বিচারকের সামনে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁদের দেখানো প্রশ্নগুলির অন্তত ৪২টি পরে নিটের প্রশ্নপত্রে এসেছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।
এই ঘটনা শুধু একটি প্রশ্নপত্র বাইরে চলে যাওয়ার মামলা নয়; এনটিএ-র বিষয়-বিশেষজ্ঞ নির্বাচন ও গোপনীয়তা রক্ষার গোটা ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রশ্ন তৈরির কাজে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও সুরক্ষিত পরিবেশে থাকার কথা। অথচ তদন্তে দেখা গিয়েছে, কয়েকজন বিশেষজ্ঞ কাজের ফাঁকে বাড়ি ফিরেছেন, ব্যক্তিগত পাঠ দিয়েছেন এবং আবার এনটিএ-র গোপন কাজে যোগ দিয়েছেন। ব্যক্তিগত কোচিংয়ের সঙ্গে তাঁদের আর্থিক বা পেশাগত সম্পর্কও যথাযথ ভাবে যাচাই করা হয়নি।
সিবিআই ইতিমধ্যে কুলকার্নি, শিবরাজ মোটেগাঁওকর ও শিরুরে-সহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে এনটিএ-র রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও জীববিদ্যার তিন বিষয়-বিশেষজ্ঞও রয়েছেন। তদন্তকারীদের মতে, প্রশ্ন সরাসরি বৈদ্যুতিন মাধ্যমে পাচার না করে ছোট ছোট বিশেষ পাঠে শিক্ষার্থীদের দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে বাইরে থেকে এগুলিকে সাধারণ কোচিংয়ের নোট বলেই মনে হওয়ার সুযোগ ছিল।
প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পরে ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি বাতিল করে এনটিএ। প্রায় ২৩ লক্ষ পরীক্ষার্থীকে ফের ২১ জুন পরীক্ষায় বসতে হয়। কিন্তু সিবিআইয়ের সাম্প্রতিক অনুসন্ধান দেখাচ্ছে, নিরাপত্তাব্যবস্থার বাইরের কোনও চক্র নয়, প্রশ্ন তৈরির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের একাংশই গোপনীয়তার প্রাচীর ভেঙেছিলেন। সেই কারণেই এনটিএ-র জবাবদিহি, বিশেষজ্ঞ নিয়োগের পদ্ধতি এবং কোচিং ব্যবসার সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



