নয়াদিল্লি: সংসদের অচলাবস্থা কাটাতে সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনটি দাবিতে অনড় থাকার কথা জানালেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর বক্তব্য, বিরোধীরা সংসদ চালাতে প্রস্তুত, কিন্তু তার আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ছাত্রদের উপর পুলিশি অভিযানের দায় নিয়ে সংসদে জবাব দিতে হবে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ছাত্রদের উপর ‘নৃশংসতার’ জন্য ক্ষমা চাইতে হবে এবং অযোধ্যার রামমন্দিরের অনুদানের টাকা চুরির অভিযোগ নিয়েও প্রধানমন্ত্রীকে বিবৃতি দিতে হবে। বিরোধী শিবিরের দাবি, এই তিনটি প্রশ্নে কোনও আপস হবে না।
সংসদের বাদল অধিবেশনের শুরু থেকেই ছাত্র আন্দোলন, নিট প্রশ্নফাঁস এবং অযোধ্যার রামমন্দিরের অনুদানের অর্থ চুরির অভিযোগ নিয়ে সরকারকে চাপে রেখেছে বিরোধীরা। গত কয়েক সপ্তাহে ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে সংঘর্ষ এবং পুলিশের বলপ্রয়োগ সেই সংঘাতকে আরও তীব্র করেছে। বিশেষ করে আন্দোলনরত ছাত্রদের বিরুদ্ধে পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ এখন বিরোধীদের আক্রমণের কেন্দ্রে।
সরকারের তরফে বিরোধীদের জানানো হয়েছিল, সংসদে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাত্র আন্দোলন এবং পুলিশি ব্যবস্থা নিয়ে বিবৃতি দিতে পারেন। কিন্তু বিরোধীরা সেই শর্ত মানতে রাজি নয়। তাদের বক্তব্য, সংসদ চালু করার বিনিময়ে সরকারের বক্তব্য শোনার প্রশ্নই ওঠে না। সরকারের জবাবদিহি সংসদীয় ব্যবস্থার স্বাভাবিক অঙ্গ, তার জন্য বিরোধীদের প্রতিবাদ প্রত্যাহার করার পূর্বশর্ত দেওয়া যায় না।
রাহুলের প্রথম দাবি সরাসরি অমিত শাহকে ঘিরে। ছাত্রদের বিরুদ্ধে পেলেট গান ব্যবহারের নির্দেশ কে দিয়েছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংসদে তা স্পষ্ট করতে হবে। এর আগেও শাহকে চিঠি লিখে রাহুল জানতে চেয়েছিলেন, ২০ জুলাই দিল্লিতে আন্দোলনকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে যে বলপ্রয়োগ হয়েছিল, তাতে প্রাণঘাতী বা গুরুতর আঘাত করতে পারে এমন অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন তিনি দিয়েছিলেন কি না। রাহুলের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সরকারের দায়িত্ব আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা।
দ্বিতীয় দাবি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমাপ্রার্থনা। বিরোধীদের অভিযোগ, ছাত্রদের উপর যে ভাবে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার রাজনৈতিক দায় এড়াতে পারেন না প্রধানমন্ত্রী। জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনের সময় রাহুল, মল্লিকার্জুন খাড়্গে-সহ কংগ্রেস নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভেও বসেছিলেন। সেই সময় রাহুল বলেছিলেন, সরকার ছাত্রদের অভিযোগ নিয়ে সংসদে আলোচনায় রাজি নয় এবং পুলিশি অভিযানের দায়ও স্বীকার করছে না।
তৃতীয় দাবিটি অযোধ্যার রামমন্দিরকে ঘিরে। মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অনুদানের অর্থ তছরুপ বা চুরির যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সংসদে বিবৃতি দিতে হবে বলে দাবি বিরোধীদের। এর আগে রাহুল ও কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে অভিযোগটির স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, দেশের অসংখ্য মানুষ বিশ্বাস থেকে মন্দিরে অর্থ দিয়েছেন; সেই অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এই বিষয়টি নিয়ে বাদল অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই লোকসভায় প্রবল বিক্ষোভ হয়েছে। নিট প্রশ্নফাঁসের পাশাপাশি রামমন্দিরের অনুদানের টাকা চুরির অভিযোগ তুলেও বিরোধী সাংসদেরা স্লোগান দেন। ফলে অধিবেশনের গোড়া থেকেই সরকার-বিরোধী সংঘাতের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে মন্দিরের অর্থ সংক্রান্ত অভিযোগ।
রাহুলের নতুন অবস্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য হল, বিরোধীরা তিনটি পৃথক বিতর্ককে একটি অভিন্ন ‘জবাবদিহি’র প্রশ্নে বেঁধে ফেলতে চাইছে—ছাত্র আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ, তার রাজনৈতিক দায় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের অনুদানের স্বচ্ছতা। অন্য দিকে সরকারের অবস্থান, সংসদে আলোচনা করতে হলে আগে বিরোধীদের বিক্ষোভ বন্ধ করে সভার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
ফলে অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ। সরকার চাইছে প্রথমে সংসদ চলুক, তার পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য রাখুন। বিরোধীদের পাল্টা অবস্থান—আগে শাহের স্পষ্ট জবাব, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমাপ্রার্থনা এবং রামমন্দিরের অনুদান চুরির অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য; তার পরেই সংসদ স্বাভাবিক করার প্রশ্ন। এই তিন দাবিকে ‘আপসহীন’ বলে ঘোষণা করায় বাদল অধিবেশনের সরকার-বিরোধী সংঘাত এখন আরও এক ধাপ তীব্র হল।