বাংলাস্ফিয়ার: নিট-ইউজি ২০২৬ প্রশ্নফাঁসের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অস্বস্তিকর তথ্য। সিবিআইয়ের তদন্তে জানা গিয়েছে, প্রশ্ন তৈরির কাজে যুক্ত এক বিশেষজ্ঞের বেসরকারি কোচিং সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি এনটিএ-র ভিতরেই আগেভাগে নজরে এসেছিল। নিটের দায়িত্বে থাকা এক অধিকর্তা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরেও এনেছিলেন বলে তদন্তকারীদের কাছে জানিয়েছেন। তা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞকে গোপনীয় প্রশ্ন তৈরির প্রক্রিয়া থেকে সরানো হয়েছিল কি না এবং সতর্কবার্তার পরে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—এখন সেই প্রশ্নই তদন্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
সিবিআই সূত্রের তদন্ত-তথ্য অনুযায়ী, এই মামলায় এখনও পর্যন্ত অন্তত ৩৬০ জনের সাক্ষ্য বা বয়ান নথিবদ্ধ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন এনটিএ-র ১৮ জন আধিকারিক। ফলে তদন্ত আর শুধু প্রশ্ন কী ভাবে পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছল, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন তৈরির জন্য বিশেষজ্ঞ নির্বাচন, তাঁদের অতীত ও পেশাগত যোগাযোগ যাচাই, প্রশ্নের বিভিন্ন সংস্করণ তৈরি, অনুবাদ ও পুনরায় অনুবাদ, চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র বাছাই—গোটা ব্যবস্থাটিই খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
নিট-ইউজি ২০২৬-এর ৩ মে-র পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে হয়েছিল। পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে আগে থেকে ছড়িয়ে পড়া একটি তথাকথিত ‘গেস পেপার’-এর বিপুল সংখ্যক প্রশ্নের মিল সামনে আসার পর পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। এনটিএ-র মহাপরিচালক অভিষেক সিংহ জানিয়েছিলেন, পরীক্ষার অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার প্রমাণ পাওয়ার পরেই পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে মাত্র ৩৭ দিনের মধ্যে নতুন করে পরীক্ষার আয়োজন করতে হয়।
প্রশ্ন তৈরির ঘরেই কি ছিল দুর্বলতা?
সিবিআইয়ের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এনটিএ-র ‘বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থা’। নিটের মতো সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির জন্য বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের বিশেষজ্ঞ হিসেবে নেওয়া হয়। তাঁদের কাছ থেকে প্রশ্ন নেওয়ার পরে যাচাই, সম্পাদনা, অনুবাদ এবং একাধিক স্তরের পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র তৈরি হওয়ার কথা। গোটা প্রক্রিয়াটিই কঠোর গোপনীয়তার আওতায় থাকে।
কিন্তু তদন্তকারীদের সন্দেহ, এই ব্যবস্থার কোনও একটি বা একাধিক স্তরে এমন ব্যক্তিরা প্রবেশ করেছিলেন, যাঁদের বেসরকারি কোচিং ব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগ ছিল। তদন্তে ইতিমধ্যেই পি ভি কুলকার্নি, মণীষা মন্ধারে-সহ কয়েক জন শিক্ষক ও বিষয়-বিশেষজ্ঞের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হয়েছে। সিবিআইয়ের তদন্ত সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিন জন শিক্ষককে প্রশ্নফাঁসের মূল স্তরের সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটেই এনটিএ-র নিট অধিকর্তার বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তদন্তকারীদের কাছে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশ্ন তৈরির সঙ্গে যুক্ত এক বিশেষজ্ঞ বেসরকারি ক্লাস নিচ্ছেন বা কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত—এমন তথ্য তাঁর নজরে এসেছিল এবং তিনি বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। তদন্তকারীরা এখন জানতে চাইছেন, সেই সতর্কতার পরে কী হয়েছিল।
যদি দেখা যায় যে আগাম সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রশ্ন তৈরির গোপনীয় প্রক্রিয়ায় রাখা হয়েছিল, তা হলে প্রশ্নফাঁসের তদন্তে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। কারণ তখন বিষয়টি কেবল কোনও ব্যক্তির বিশ্বাসভঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এনটিএ-র অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যর্থতার প্রশ্নও উঠবে।
১৮ এনটিএ আধিকারিকের বয়ান কেন গুরুত্বপূর্ণ
৩৬০ জনের মধ্যে ১৮ জন এনটিএ আধিকারিকের বয়ান নেওয়া থেকে স্পষ্ট, তদন্তকারীরা এখন প্রতিষ্ঠানটির ভিতরের ‘চেন অব কমান্ড’ পুনর্গঠন করছেন। কে বিশেষজ্ঞদের নাম প্রস্তাব করেছিলেন, কে তাঁদের অনুমোদন দিয়েছিলেন, স্বার্থের সংঘাত আছে কি না তা যাচাইয়ের দায়িত্ব কার ছিল, কোনও অভিযোগ বা সতর্কবার্তা এলে তা কোথায় পাঠানো হত—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
বিশেষ করে দেখা হচ্ছে, বিশেষজ্ঞ নিয়োগের সময় তাঁদের কোচিং সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ ঘোষণার কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল কি না। থাকলে তা মানা হয়েছিল কি না। আর না থাকলে, নিটের মতো পরীক্ষায় এত বড় ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেন এমন যাচাই ব্যবস্থা তৈরি হয়নি।
এনটিএ-র সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। সংসদে দেওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিপুল সংখ্যক সর্বভারতীয় পরীক্ষা পরিচালনা করা সংস্থাটিতে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত; জুলাই ২০২৬-এর হিসাবে ২৪ জন স্থায়ী কর্মীর পাশাপাশি ১৯৭ জন চুক্তিভিত্তিক ও আউটসোর্সড কর্মী কাজ করছিলেন। ২০১৮ থেকে সংস্থাটি ৬.৬ কোটিরও বেশি পরীক্ষার্থী-নিবন্ধন সামলেছে।
এখনও এনটিএ আধিকারিক অভিযুক্ত নন
তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সিবিআইয়ের দায়ের করা অভিযোগপত্রে এখনও কোনও এনটিএ আধিকারিককে অভিযুক্ত করা হয়নি। প্রথম পর্যায়ের অভিযোগপত্রে ১৩ জনের নাম রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা অবশ্য স্পষ্ট করেছে, বৃহত্তর ষড়যন্ত্র এবং এনটিএ-র ভিতরে কারও ভূমিকা ছিল কি না, সেই তদন্ত এখনও চলছে।
অর্থাৎ ১৮ জন আধিকারিকের বয়ান নেওয়া মানেই তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না। তাঁদের অনেকেই সাক্ষী হিসেবে পরীক্ষার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, বিশেষজ্ঞ নির্বাচন এবং গোপনীয় তথ্য কার কার নাগালে ছিল, সেই বিষয়ে তদন্তকারীদের তথ্য দিয়েছেন।
তদন্তের গোড়া থেকেই সিবিআইয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রশ্নফাঁসের আসল ‘উৎস’ খুঁজে বার করা। প্রাথমিক পর্যায়ে একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেফতারের পরে তদন্ত ক্রমশ এনটিএ-র বিশেষজ্ঞদের দিকে পৌঁছয় এবং সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের দিকটিও খোলা রাখা হয়।
ব্যক্তিগত কোচিংয়ের যোগ কেন এত গুরুতর
নিটের প্রশ্ন তৈরির দায়িত্বে থাকা কোনও বিশেষজ্ঞ একই সঙ্গে বেসরকারি কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকলে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। কারণ দেশের লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর কাছে নিটের একটি প্রশ্নও আগে পৌঁছে যাওয়া মানে প্রতিযোগিতার সমতা নষ্ট হয়ে যাওয়া। সেই তথ্য যদি কোনও কোচিং সংস্থার হাতে যায়, তা হলে তার বাণিজ্যিক মূল্যও বিপুল।
২০২৬ সালের ঘটনায় সেই আশঙ্কাই আরও তীব্র হয়েছে। তদন্তে লাতুরের একটি বেসরকারি কোচিং সংস্থাকে ঘিরে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল এবং স্থানীয় স্তরেও বেসরকারি ক্লাসগুলির ভূমিকা নিয়ে তদন্ত হয়।
এখন তাই সিবিআইয়ের সামনে দু’টি আলাদা প্রশ্ন। প্রথমটি অপরাধমূলক—কে প্রশ্ন ফাঁস করেছিলেন এবং কোন পথে তা পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছেছিল। দ্বিতীয়টি প্রাতিষ্ঠানিক—এনটিএ-র নিজস্ব ব্যবস্থায় এমন কোনও সতর্কসংকেত ছিল কি না, যা সময়মতো গুরুত্ব পেলে বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব হত।
নিট অধিকর্তার বয়ান দ্বিতীয় প্রশ্নটিকেই সামনে এনে দিয়েছে। যদি সত্যিই বেসরকারি কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত কোনও বিশেষজ্ঞ সম্পর্কে আগাম সতর্ক করা হয়ে থাকে, তা হলে তদন্তের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে—সতর্কবার্তা পেয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন, এবং সেই সিদ্ধান্তের দায় কার?
এই উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে নিট প্রশ্নফাঁস কেবল কয়েক জন বিশেষজ্ঞ ও কোচিং-কর্তার ষড়যন্ত্র ছিল, নাকি তার পিছনে ছিল এনটিএ-র গভীরতর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাও।