Home International নেতানিয়াহুর ‘দুই নৌকা’

নেতানিয়াহুর ‘দুই নৌকা’

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
12 views 4 minutes read
A+A-
Reset

গাজা নিয়ে প্রকাশ্যে আমেরিকা-সমর্থিত নতুন পরিকল্পনাকে নাকচ করেছেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। অথচ তাঁর এই ঘোষণার মাত্র কয়েক দিন আগেই সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে ইজরায়েলি সেনার শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল বলে দাবি করেছে ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যম। ফলে যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহুর প্রকৃত অবস্থান কী, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে ইজরায়েলের অন্দরমহলে।

সামনে নির্বাচন। এক দিকে সরকার টিকিয়ে রাখতে অতি-দক্ষিণপন্থী শরিকদের সন্তুষ্ট রাখা জরুরি। অন্য দিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপও উপেক্ষা করা সহজ নয়। দুই পক্ষের দাবি যেন এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

নেতানিয়াহুর জোটের অতি-দক্ষিণপন্থী নেতারা গাজায় সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার পাশাপাশি সেখানে ইজরায়েলি বসতি স্থাপনের পথ খোলা রাখার পক্ষে। ট্রাম্পের লক্ষ্য সম্পূর্ণ উল্টো—দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে গাজাকে শেষ পর্যন্ত প্যালেস্তিনীয় নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়ার দিকে এগোনো। তাঁর নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’-এর পরিকল্পনায় সেই লক্ষ্যই রয়েছে।

নির্বাচনের আর মাত্র দু’মাসের কিছু বেশি সময় বাকি। এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু আপাতত ঘরের রাজনীতির দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

প্রকাশ্যে ‘না’, বৈঠকে ‘হ্যাঁ’?

রবিবার গাজার জন্য প্রস্তাবিত নতুন ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেন নেতানিয়াহু। পরিকল্পনায় হামাসের অস্ত্রত্যাগের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তাতে সম্মতি দেননি তিনি। একই সঙ্গে গাজা, লেবানন এবং ইরানের সংঘাত ইজরায়েলের সম্মতি ছাড়া শেষ করার জন্য ওয়াশিংটনের চাপেরও বিরোধিতা করেন।

কিন্তু তাঁর এই ঘোষণায় ইজরায়েলি সামরিক কর্তাদের একাংশ নাকি বিস্মিত। চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে দাবি, মাত্র কয়েক দিন আগে নেতানিয়াহু এবং ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর চিফ অব স্টাফ ইয়াল জামিরের বৈঠকে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

এক প্রতিরক্ষা আধিকারিকের দাবি, সংবাদমাধ্যম থেকেই তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর নতুন অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের বৈঠকগুলিতে নেতানিয়াহু পরিকল্পনাটির সঙ্গে সম্মতি জানিয়েছিলেন এবং রাফার কয়েকটি এলাকা থেকে পরীক্ষামূলক ভাবে ইজরায়েলি সেনা সরানোর প্রস্তাবেও সায় দিয়েছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ গাজার তিনটি পরীক্ষামূলক এলাকার সীমানাও নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠিত হলে ওই এলাকাগুলির দায়িত্ব ইজরায়েলি সেনার কাছ থেকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। দুই বাহিনী কী ভাবে সমন্বয় করবে, সেই প্রশ্নও বৈঠকে উঠেছিল।

তবে নেতানিয়াহুর দফতর এই দাবি অস্বীকার করেছে। তাঁদের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনও বিস্তারিত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেননি।

ট্রাম্পের চাপ, নেতানিয়াহুর পাল্টা চাল

এই প্রেক্ষাপটে ‘বোর্ড অব পিস’-এর পরিকল্পনা প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করাকে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে কড়া বার্তা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

এর ঠিক আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ইজরায়েল সফর করেছিলেন বলে খবর। ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমের দাবি, ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তা ছিল স্পষ্ট—গাজা ও লেবাননের যুদ্ধ শেষ করার দিকে এগোতে হবে।

এক উচ্চপদস্থ ইজরায়েলি সামরিক কর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, গাজা, লেবানন এবং ইরান—তিনটি যুদ্ধক্ষেত্রেই অভিযান গুটিয়ে আনার দিকে এগোনোর বার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন।

ট্রাম্পের ইচ্ছার প্রকাশ্য বিরোধিতা তাই নেতানিয়াহুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইজরায়েলের বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, আর মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক সহায়তার উপর দেশটির নির্ভরতাও বিপুল।

তবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, অসম ক্ষমতার সম্পর্কেও তিনি ঝুঁকিপূর্ণ চাল দিতে পিছপা হন না। ২০২৪ সালের মে মাসেও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইজরায়েল-সমর্থিত গাজা যুদ্ধবিরতি ও পণবন্দি মুক্তির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। পরে নেতানিয়াহু সেই প্রস্তাব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাখ্যান করেন।

কথায় কঠোর, সিদ্ধান্তে সংযত?

এ বার অবশ্য ওয়াশিংটন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক মন্তব্যকে মূলত নির্বাচনী কৌশল হিসেবেই দেখছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিলেও যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর কয়েকটি সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের চাপ মেনে চলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গত সপ্তাহেই গাজায় বিমান হামলার অনুমোদনের নিয়ম আরও কঠোর করেছেন নেতানিয়াহু। এখন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হত্যার অভিযানের অনুমতি সাধারণত চিফ অব স্টাফকেই দিতে হবে। ইজরায়েলি সেনা সরাসরি ও তাৎক্ষণিক বিপদের মুখে পড়লে অবশ্য ব্যতিক্রমের সুযোগ থাকছে।

লেবাননেও সম্প্রতি সামরিক অভিযান সীমিত করেছেন তিনি। এর আগে ট্রাম্পের দাবিতে ইরানের দিকে যাওয়া ইজরায়েলি যুদ্ধবিমানকে ফিরে আসার নির্দেশও দিয়েছিলেন।

অর্থাৎ নেতানিয়াহুর কৌশলে আপাতত দু’টি স্তর দেখা যাচ্ছে—দেশের ভিতরে অতি-দক্ষিণপন্থী শরিকদের জন্য কঠোর যুদ্ধংদেহী ভাষা, আর বাস্তবে কিছুটা সংযত সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা।

প্রশ্ন হল, এই ভারসাম্য কত দিন ধরে রাখা সম্ভব?

নির্বাচনের হিসাবও বড়

ইজরায়েলের নির্বাচন অক্টোবরের শেষ দিকে। তার মাত্র এক সপ্তাহ পরেই আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন। ফলে ট্রাম্পেরও নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে জেরুজালেমের সম্পর্ক তাই শুধু কূটনীতি বা যুদ্ধনীতির বিষয় নয়, দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে।

গত মাসে নেতানিয়াহুর হোয়াইট হাউস সফরও ছিল তুলনামূলক অনাড়ম্বর। সফর শেষে কোনও যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি। অথচ ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।

এই টানাপড়েনের সবচেয়ে বড় মূল্য অবশ্য দিচ্ছেন গাজার সাধারণ মানুষ।

গত অক্টোবরে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় নামমাত্র যুদ্ধবিরতি হলেও ইজরায়েলি হামলা পুরোপুরি থামেনি। তাতে ১,২০০-র বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সামগ্রী এবং জ্বালানি প্রবেশেও বাধা রয়েছে। গাজার বহু মানুষ এখনও অস্থায়ী তাঁবুর শিবিরে দিন কাটাচ্ছেন। খাদ্যাভাবও ব্যাপক। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি শিশুর তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

নেতানিয়াহুর সামনে তাই সমীকরণটি কঠিন। অতি-দক্ষিণপন্থী শরিকদের সন্তুষ্ট রাখতে গেলে ট্রাম্পের সঙ্গে সংঘাত বাড়তে পারে। আবার আমেরিকার পরিকল্পনায় সায় দিলে নির্বাচনের আগে নিজের জোটের ভিত নড়ে যেতে পারে।

তাই আপাতত প্রকাশ্যে এক কথা, মাঠে আর এক কৌশল—এই দুইয়ের মাঝেই পথ খুঁজছেন নেতানিয়াহু। কিন্তু নির্বাচন যত এগোবে, এই দ্বৈত ভারসাম্য ধরে রাখা তত কঠিন হবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles