টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে দেখা গেল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উঠছেন ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ। চারপাশে নিরাপত্তার কড়াকড়ি, সাংবাদিকদের ভিড়—সব দেখে মনে হয়েছিল, ওই বিমানেই তুরস্ক ছাড়ছেন তিনি।
আসলে তখনই শুরু হয়েছিল আসল ছলনা।
ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় গত মাসে তুরস্কের আঙ্কারা থেকে ট্রাম্পকে গোপনে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এমনই এক সিনেমার মতো নিরাপত্তা অভিযান চালিয়েছিল মার্কিন কর্তৃপক্ষ। পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানকে বানানো হয়েছিল ‘ডিকয়’ বা ছদ্ম লক্ষ্য। আর ট্রাম্পকে বিমান থেকে গোপনে নামিয়ে একটি ক্যাটারিং ট্রাকের আড়ালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অন্য একটি সামরিক বিমানে।
সেই ছোট বিমানে চেপেই ব্রিটেনে পৌঁছন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ঘটনাটি সামনে এসেছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে।
আকাশে ছিল এক বিমান, ট্রাম্প অন্যটিতে
ঘটনাটি গত মাসে আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের সময়।
তুরস্ক সফরে ট্রাম্প ব্যবহার করেছিলেন কাতারের উপহার দেওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমান। প্রায় ৪০ কোটি ডলার মূল্যের এই বিমানটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের উপযোগী করে তুলেছিল ওয়াশিংটন।
কিন্তু সম্মেলন চলাকালীন ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়। মার্কিন কর্তৃপক্ষের হাতে এমন গোয়েন্দা তথ্য আসে যে, ইরানের তরফে প্রেসিডেন্টকে হত্যার বিশ্বাসযোগ্য হুমকি রয়েছে। শুধু ট্রাম্প নন, তাঁর বিমানও হামলার লক্ষ্য হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
এর পরেই তৈরি হয় পুরো ছলনার পরিকল্পনা।
প্রথমে কাতারের দেওয়া নতুন ৭৪৭-৮ বিমানটিকে ট্রাম্প ছাড়াই তুরস্ক থেকে ব্রিটেনের একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটির দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
অন্য দিকে প্রকাশ্যে এমন ধারণাই তৈরি করা হয় যে, ফেরার সময় ট্রাম্প পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ান ব্যবহার করবেন। ট্রাম্প নিজেও বলেছিলেন, ‘পুরনো দিনের কথা মনে করে’ তিনি পুরনো বিমানেই ফিরবেন।
সবাইকে সেই গল্পেই বিশ্বাস করানো হয়েছিল।
ক্যামেরার সামনে ওঠা, আড়ালে নেমে যাওয়া
আঙ্কারা বিমানবন্দরে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পকে পুরনো নীল-সাদা এয়ার ফোর্স ওয়ানের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখা যায়।
কিন্তু বিমানের ভিতরে ওঠার পরেই ঘটে আসল ঘটনা।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-কে এক মার্কিন আধিকারিক জানিয়েছেন, কিছু ক্ষণের মধ্যেই ট্রাম্পকে অন্য দিক দিয়ে গোপনে বিমান থেকে নামিয়ে আনা হয়। বাইরে তখন অপেক্ষা করছিল বিমানে খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম তোলার কাজে ব্যবহৃত একটি ক্যাটারিং ট্রাক।
সেই ট্রাকের আড়ালেই প্রেসিডেন্টকে বিমানবন্দরের অন্য অংশে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে অপেক্ষা করছিল মার্কিন বায়ুসেনার C-32A—পরিবর্তিত বোয়িং ৭৫৭, যা প্রেসিডেন্ট এবং শীর্ষ সরকারি আধিকারিকদের পরিবহণেও ব্যবহৃত হয়।
ট্রাম্প উঠে পড়েন সেই ছোট সামরিক বিমানে।
সাংবাদিকরাও জানতেন না
অভিযানের গোপনীয়তা ছিল এতটাই কঠোর যে ট্রাম্পের সঙ্গে সফররত বহু সাংবাদিক এমনকি হোয়াইট হাউসের কয়েক জন কর্মীও জানতেন না, প্রেসিডেন্ট তাঁদের বিমানে নেই।
তাঁরা পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানেই থেকে যান। বিমানটিও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী তুরস্ক ছেড়ে উড়ে যায়।
অর্থাৎ, আকাশে তখন যে বিমানটিকে দেখে সবাই ধরে নিচ্ছিলেন ট্রাম্প তাতেই রয়েছেন, সেটিই আসলে ছিল ছদ্ম লক্ষ্য।
সাংবাদিকদের বিমানের জানলার পর্দা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অন্য দিকে, ট্রাম্পকে নিয়ে C-32A সম্পূর্ণ গোপনে ব্রিটেনের দিকে উড়ে যায়। প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথও ওই বিমানে ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
মাত্র ৯ মিনিটের ব্যবধান
ব্রিটেনের মিলডেনহল মার্কিন বায়ুসেনা ঘাঁটিতে পৌঁছয় C-32A বিমানটি পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের প্রায় নয় মিনিট আগে।
সেখানে পৌঁছে ট্রাম্প আবার তাঁর সরকারি সফরসঙ্গীদের সঙ্গে মিশে যান। এরপর কাতারের দেওয়া ৭৪৭-৮ বিমানে ওঠেন তিনি।
বাইরে থেকে গোটা ঘটনাপ্রবাহ দেখলে বোঝার উপায় ছিল না যে মাঝের যাত্রাপথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসলে অন্য একটি বিমানে ছিলেন।
একটি বিমান সামনে থেকে সব নজর কেড়ে নিচ্ছিল, আর অন্যটি নিঃশব্দে প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
হুমকি কতটা গুরুতর ছিল?
ঘটনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সে সময় হোয়াইট হাউসের প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহের বড় পার্থক্য।
সেই সময় এমন ধারণাই দেওয়া হয়েছিল যে ট্রাম্প পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে তুরস্ক ছেড়েছেন। এখন জানা যাচ্ছে, সেটি ছিল নিরাপত্তা পরিকল্পনারই অংশ।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কাকে মার্কিন নিরাপত্তা কর্তারা যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য এবং গুরুতর বলে মনে করেছিলেন। সেই কারণেই একই সঙ্গে তিনটি বিমানকে কাজে লাগিয়ে প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান আড়াল করা হয়েছিল।
কাতারের দেওয়া ৭৪৭-৮ আগে চলে যায়। পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ান হয়ে ওঠে ছদ্ম লক্ষ্য। আর ট্রাম্প গোপনে যাত্রা করেন ছোট C-32A-তে।
হোয়াইট হাউস প্রতিবেদনের মূল বিবরণ অস্বীকার করেনি।
ফলে ঘটনাটি শুধু নিরাপত্তা কৌশলের চমকপ্রদ উদাহরণ নয়। এটি আরও একটি বিষয় সামনে আনছে—ট্রাম্পকে ঘিরে ইরানি হুমকিকে মার্কিন নিরাপত্তা কর্তারা ঠিক কতটা গুরুতর বলে মনে করেছিলেন।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে শেষ পর্যন্ত যে ছক সাজাতে হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল একটি ছদ্ম এয়ার ফোর্স ওয়ান, একটি ছোট সামরিক বিমান—আর তার মাঝখানে, খাবার তোলার একটি ক্যাটারিং ট্রাকের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া প্রেসিডেন্ট।