Home Sports বেঙ্গালুরুতে স্থায়ী ভাবে থাকতে অনীহা, বিসিসিআইয়ের উৎকর্ষ কেন্দ্রে এখনও নেই ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান

বেঙ্গালুরুতে স্থায়ী ভাবে থাকতে অনীহা, বিসিসিআইয়ের উৎকর্ষ কেন্দ্রে এখনও নেই ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
13 views 4 minutes read
A+A-
Reset

বিসিসিআইয়ের উৎকর্ষ কেন্দ্র বা সেন্টার অব এক্সেলেন্সে ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের প্রধানের পদটি দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে খালি। নিতিন প্যাটেল দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজে পায়নি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। উৎকর্ষ কেন্দ্রের প্রধান ভিভিএস লক্ষ্মণ জানিয়েছেন, একাধিক দফায় সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করার পরেও শেষ মুহূর্তে তাঁরা দায়িত্ব নিতে রাজি হননি। প্রধান বাধা—এটি পূর্ণ সময়ের চাকরি এবং দায়িত্ব নিলে বেঙ্গালুরুতে স্থায়ী ভাবে থাকতে হবে।

লক্ষ্মণের মতে, উৎকর্ষ কেন্দ্রকে শুধু ক্রিকেটারদের চোট সারিয়ে মাঠে ফেরানোর কেন্দ্র হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তিনি বলেন, ‘‘উৎকর্ষ কেন্দ্র নিছক পুনর্বাসন কেন্দ্র নয়। ক্রিকেটারদের আরও উন্নত করে তোলার ক্ষেত্রে এর অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে।’’

তবে সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এখনও ক্রীড়াবিজ্ঞান ও ক্রীড়া চিকিৎসা বিভাগের প্রধান না থাকাটা উদ্বেগের বিষয়। নিতিন প্যাটেল দায়িত্ব ছাড়ার পরে বিসিসিআই অ্যান্ড্রু লাইপাসের সঙ্গে আলোচনা করেছিল। লক্ষ্মণের দাবি, প্রায় সব কিছুই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। বোর্ড সচিব দেবজিৎ শইকিয়ার সঙ্গেও লাইপাসের দু’-তিন দফা বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পারিবারিক কারণ দেখিয়ে তিনি সরে দাঁড়ান।

এর পরে বিসিসিআই নতুন করে পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে। সাক্ষাৎকার পর্বে ছিলেন চিকিৎসক দিনশ পারদিওয়ালা, চিকিৎসক আশিস সোনি, চিকিৎসক রোহন খাভতে এবং লক্ষ্মণ নিজে। পাঁচ জনকে বাছাই করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে প্রথম পছন্দ ছিলেন এক অস্ট্রেলীয় বিশেষজ্ঞ।

কিন্তু সেখানেও একই সমস্যা। লক্ষ্মণ বলেন, ‘‘তাঁকে নির্বাচিত করার পরে হঠাৎ তিনি জানালেন, বেঙ্গালুরুতে চলে এসে থাকতে পারবেন না।’’

এখানেই শেষ নয়। নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত রাগবি দল অল ব্ল্যাকসের ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের এক প্রাক্তন বা তৎকালীন প্রধানের সঙ্গেও বিসিসিআই আলোচনা চালিয়েছিল। তিনিও প্রায় রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনিও সিদ্ধান্ত বদল করেন।

লক্ষ্মণ জানিয়েছেন, এই পদে নিয়োগের অন্যতম প্রধান শর্ত হল, দায়িত্বটি পূর্ণ সময়ের। খণ্ডকালীন ভাবে কাজ করার সুযোগ নেই। ক্রিকেটারদের শারীরিক অবস্থা, চোট, পুনর্বাসন এবং কাজের চাপ প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করতে হয়। ফলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে উৎকর্ষ কেন্দ্রের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে হবে।

তাঁর কথায়, ‘‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলির একটি হল, এটি পূর্ণ সময়ের চাকরি। খণ্ডকালীন নয়। প্রতিদিন নজরদারি করতে হয়।’’

শুধু আন্তর্জাতিক খ্যাতি থাকলেই অবশ্য এই পদের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন লক্ষ্মণ। ভারতীয় ক্রিকেট এবং ভারতীয় ক্রিকেটারদের শারীরিক ও মানসিক চাহিদা সম্পর্কে গভীর ধারণাও প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘‘এই পদে শুধু বড় মাপের কাউকে আনলেই হবে না। ভারতীয় ক্রিকেটারদের সম্পর্কে জ্ঞান এবং তাঁদের বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে।’’

ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান না থাকায় আপাতত দায়িত্ব চারটি পৃথক শাখায় ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্মণ এই পরিস্থিতিতে উৎকর্ষ কেন্দ্রের বর্তমান কর্মীদের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, প্রধান না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন বিভাগের পেশাদাররা বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন।

তবে ভারতীয় ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ক্রিকেটারের চোটের ঘটনা এই শূন্যপদের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নিতিন প্যাটেল দায়িত্বে থাকার সময়ে যশপ্রীত বুমরার গুরুতর পিঠের চোট সামলানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপের আগে বুমরার ক্রিকেটজীবনই এক সময় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল। তাঁর পুনর্বাসন এবং কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণে প্যাটেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

শ্রেয়স আইয়ার এবং কে এল রাহুলও তাঁর তত্ত্বাবধানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সুবিধা পেয়েছিলেন। মহম্মদ শামিও দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকার পরে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। ফলে ক্রিকেটারদের চোটের চিকিৎসা থেকে শুরু করে পুনর্বাসন, কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠে ফেরার সময় নির্ধারণ—সব ক্ষেত্রেই ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের প্রধানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশিষ্ট শক্তি ও শারীরিক সক্ষমতা প্রশিক্ষক রামজি শ্রীনিবাসনের মতে, উৎকর্ষ কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠানে ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের একজন প্রধান থাকা অপরিহার্য। তাঁর মতে, ওই ব্যক্তিকে অত্যন্ত দক্ষ হতে হবে এবং বিষয়টি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। ক্রীড়া চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অথবা ব্যায়াম-শারীরবিদ্যা বিশেষজ্ঞ এই দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত হতে পারেন।

রামজি বলেন, এই প্রধানের দায়িত্ব হবে গোটা ক্রীড়াবিজ্ঞান ব্যবস্থার পদ্ধতি, নিয়মাবলি এবং কাঠামো তৈরি করা। তাঁর অধীনেই কাজ করবেন শক্তি ও শারীরিক সক্ষমতা প্রশিক্ষক, ফিজিয়োথেরাপিস্ট, পুনরুদ্ধার বিশেষজ্ঞ-সহ অন্যরা।

তাঁর মতে, ক্রীড়াবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি সুসংহত ব্যবস্থা, দায়বদ্ধতা, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং গবেষণা—সবই জরুরি। প্রতিটি বিভাগের কাজ কে দেখবেন এবং কার কী দায়িত্ব, তা নির্দিষ্ট করার জন্য একজন প্রধান থাকা প্রয়োজন। তা না হলে দায়বদ্ধতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

রামজি আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, লক্ষ্মণের পক্ষে একা সব কিছু দেখা সম্ভব নয়। তিনি গোটা উৎকর্ষ কেন্দ্রের ক্রিকেট সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের প্রধান। ফলে তাঁর অধীনে ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের একজন স্বতন্ত্র প্রধান থাকা প্রয়োজন।

দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে পদটি খালি থাকলেও বিসিসিআই হাল ছাড়ছে না। লক্ষ্মণ জানিয়েছেন, যোগ্য প্রার্থীর সন্ধান এখনও চলছে। তবে শুধু পদ পূরণ করার জন্য কাউকে নিয়োগ করতে চায় না বোর্ড।

তাঁর বক্তব্য, ‘‘খোঁজ চলছে। কিন্তু এমন কাউকে পেতে হবে যিনি এই দায়িত্ব নেওয়ার মতো যথেষ্ট যোগ্য এবং দক্ষ। আমরা অবশ্যই এই পদ পূরণ করব। তার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে হবে।’’

ভারতীয় ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের কাজের চাপ এবং চোট ব্যবস্থাপনা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় এই নিয়োগ এখন বিসিসিআইয়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন, আবার তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেটের বাস্তবতা বুঝতে হবে, পূর্ণ সময় দিতে হবে এবং বেঙ্গালুরুতে থাকতে হবে। এই তিন শর্তের সমন্বয় ঘটাতেই আপাতত সমস্যায় পড়েছে বোর্ড।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles