বাংলাস্ফিয়ার: মহারাষ্ট্রে এক বছরের বিশেষ পাঠ্যক্রম শেষ করা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসার চিকিৎসক সংগঠনগুলি তো বটেই, এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে খোদ হোমিওপ্যাথির জাতীয় নিয়ামক সংস্থাও। তাদের আশঙ্কা, এই ব্যবস্থা চিকিৎসাশিক্ষায় একটি বিপজ্জনক শর্টকাট তৈরি করতে পারে এবং রোগীর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে।

বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়েছে গত সপ্তাহে। ৩৬ বছরের চিকিৎসক নেহা সিদ্ধার্থ পাওয়ার মহারাষ্ট্রের প্রথম হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রাজ্যের আধুনিক চিকিৎসার নিয়ামক সংস্থা মহারাষ্ট্র মেডিক্যাল কাউন্সিল বা এমএমসি-তে নথিভুক্ত হয়েছেন। তিনি ‘সার্টিফিকেট কোর্স ইন মডার্ন ফার্মাকোলজি’ বা সিসিএমপি সম্পূর্ণ করেছেন। তাঁর নথিভুক্তির ফলে একই পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণ করা অন্য হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের জন্যও দরজা খুলে গেল।

এর আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০১৪ সালে। সে বছর মহারাষ্ট্র সরকার এমএমসি আইনে সংশোধন এনে এক বছরের আধুনিক ওষুধবিজ্ঞান পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণ করা হোমিয়োপ্যাথদের এমএমসি-র পৃথক তালিকায় নথিভুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়। কার্যত এর ফলে তাঁরা আধুনিক চিকিৎসার ওষুধ ব্যবহারের অধিকার পান।

এই সংশোধনী আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কিন্তু আদালত এখনও এর উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয়নি। মহারাষ্ট্র অ্যাসোসিয়েশন অব রেসিডেন্ট ডক্টর্স-এর সভাপতি চিকিৎসক অথর্ব শিন্ডের বক্তব্য, আইন কার্যকর থাকায় এমএমসি-র সামনে নেহাকে নথিভুক্ত করা ছাড়া কার্যত অন্য পথ ছিল না। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার বা এমএমসি-র কর্তাদের অনেকেই এই ব্যবস্থার পক্ষে নন, কিন্তু রাজ্য সরকার নিজের তৈরি আইন অমান্য করতে পারে না। ফলে এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।

কেন এই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল

২০১৪ সালে আইন সংশোধনের সময় মহারাষ্ট্র সরকার মূল যুক্তি হিসেবে চিকিৎসকের ঘাটতির কথা বলেছিল। সংশোধনী বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছিল, সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের আধুনিক ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার দাবি উঠছে। রাজ্যের মানুষের প্রয়োজন এবং ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্য’-র লক্ষ্য পূরণ করতে আধুনিক ওষুধবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণ করা হোমিয়োপ্যাথদের আধুনিক চিকিৎসা করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

তবে তৎকালীন প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যে অন্য একটি ছবিও উঠে এসেছে।

মহারাষ্ট্রের চিকিৎসাশিক্ষা দফতরের প্রাক্তন কর্তা চিকিৎসক প্রবীণ শিংগারের বক্তব্য, এই পরিবর্তনের পিছনে হোমিওপ্যাথি কলেজগুলির চাপও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সত্তরের দশকে আয়ুর্বেদের পাঠ্যক্রমে আধুনিক ওষুধবিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর কয়েকটি রাজ্যে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট আধুনিক ওষুধ লেখার অধিকার পান। তার ফলে আয়ুর্বেদ কলেজগুলির চাহিদাও বাড়ে।

হোমিওপ্যাথি কলেজগুলিও একই ধরনের সুযোগ চাইতে শুরু করে। কিন্তু কেন্দ্রীয় নিয়ামক সংস্থাকে রাজি করাতে না পেরে তারা রাজ্য স্তরে উদ্যোগী হয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সরকারের কাছে পৌঁছয়। আইন আনার উদ্যোগ যখন প্রায় চূড়ান্ত, তখন চিকিৎসাশিক্ষা দফতর অন্তত এক বছরের আধুনিক ওষুধবিজ্ঞানের সেতু-পাঠ্যক্রম বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেয়।

আপত্তি কেন

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ন্যাশনাল কমিশন ফর হোমিওপ্যাথি বা এনসিএইচ-ও মহারাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে।

কমিশনের চেয়ারম্যান চিকিৎসক তারকেশ্বর জৈনের বক্তব্য, চিকিৎসকদের যে চিকিৎসাপদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের সেই পদ্ধতির মধ্যেই কাজ করা উচিত। তাঁর আশঙ্কা, এই ব্যবস্থা এমন ছাত্রছাত্রীদের জন্য শর্টকাট তৈরি করবে, যাঁরা আসলে আধুনিক চিকিৎসক হতে চান কিন্তু এমবিবিএস পাঠ্যক্রমে সুযোগ পাচ্ছেন না। তাঁরা হোমিওপ্যাথির প্রতি আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও হোমিওপ্যাথি পড়ে পরে সেতু-পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে আধুনিক ওষুধ লেখার চেষ্টা করতে পারেন।

মহারাষ্ট্রের নজির অন্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জৈন জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রদেশ থেকে একই ধরনের প্রস্তাব তাঁদের কাছে এসেছে।

এমবিবিএস ও হোমিওপ্যাথির শিক্ষা কি সমান

ভর্তির প্রক্রিয়ায় এখন অনেকটা সামঞ্জস্য এসেছে। আধুনিক চিকিৎসা, আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথি—সব ক্ষেত্রেই জাতীয় স্তরের নিট-ইউজি পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী ভর্তি হন। তিনটি পাঠ্যক্রমেই অ্যানাটমি, ফিজিয়োলজি, প্যাথোলজি এবং বায়োকেমিস্ট্রির মতো মানবদেহ সম্পর্কিত একাধিক সাধারণ বিষয় রয়েছে।

কিন্তু রোগের চিকিৎসা শেখানোর ক্ষেত্রে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এমবিবিএস ছাত্রছাত্রীরা প্রমাণনির্ভর আধুনিক ওষুধবিজ্ঞান, রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসাপদ্ধতি বিস্তারিত ভাবে শেখেন। অন্য দিকে আয়ুর্বেদে ত্রিদোষ তত্ত্ব, পঞ্চকর্ম এবং হোমিওপ্যাথিতে ‘ল অব সিমিলার্স’-এর মতো নিজস্ব চিকিৎসাতত্ত্ব পড়ানো হয়।

সমালোচকদের মূল প্রশ্ন এখানেই—এমবিবিএসের বিস্তৃত ও দীর্ঘ প্রশিক্ষণের বিকল্প কি এক বছরের আধুনিক ওষুধবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম হতে পারে?

সুপ্রিম কোর্টের পুরনো রায় নিয়েও প্রশ্ন

ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সহ-সভাপতি এবং সংগঠনের মহারাষ্ট্র শাখার প্রাক্তন সভাপতি চিকিৎসক জয়েশ লেলে ২০১৪ সালের সংশোধনীকে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করার অন্যতম ব্যক্তি।

তিনি সুপ্রিম কোর্টের একাধিক পুরনো রায়ের উল্লেখ করেছেন। ‘পুনম বর্মা বনাম অশ্বিন প্যাটেল’ মামলায় এক হোমিয়োপ্যাথ চিকিৎসক আধুনিক ওষুধ দেওয়ার পরে রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনায় সর্বোচ্চ আদালত কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। আবার ‘মুখতিয়ার চাঁদ বনাম পঞ্জাব সরকার’ মামলাতেও ভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতিতে নথিভুক্ত ব্যক্তির আধুনিক চিকিৎসা করার অধিকার নিয়ে সীমারেখা টানা হয়েছিল।

লেলের আশঙ্কা, মহারাষ্ট্রের নতুন নথিভুক্তি সেই পুরনো বিতর্ককেই ফিরিয়ে আনছে। একই ব্যক্তির দু’টি পৃথক চিকিৎসা পরিষদে নথিভুক্ত হওয়া নিয়েও আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে।

গ্রামে চিকিৎসকের ঘাটতি কি মিটবে

সরকারের মূল যুক্তি ছিল চিকিৎসকের অভাব, বিশেষত গ্রামীণ এলাকায়। কিন্তু এনসিএইচ চেয়ারম্যানের বক্তব্য, এই যুক্তিও এখন দুর্বল হয়ে গিয়েছে।

প্রায় ১০ হাজার হোমিয়োপ্যাথ ইতিমধ্যে সিসিএমপি পাঠ্যক্রম পাশ করেছেন। তাঁদের বড় অংশ মহারাষ্ট্রের বড় শহরগুলির বাসিন্দা। প্রশ্ন হল, আধুনিক ওষুধ লেখার অধিকার পেলেই কি তাঁরা গ্রাম বা ছোট শহরে গিয়ে চিকিৎসা করবেন?

জৈনের আরও মৌলিক প্রশ্ন—গ্রামের মানুষ কেন সম্পূর্ণ প্রশিক্ষিত আধুনিক চিকিৎসকের পরিষেবা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন?

তাঁর মতে, ২০১৪ সালে যে চিকিৎসক-সংকটকে সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার সঙ্গে মেলে না। মহারাষ্ট্রে একসময় চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের জন্য গ্রামীণ পরিষেবার বাধ্যতামূলক বন্ড ছিল। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় পর্যাপ্ত শূন্যপদ না থাকায় সেই ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।

জাতীয় বিধিতে বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজ্যকে সীমিত সময়ের জন্য হোমিয়োপ্যাথদের কিছু আধুনিক চিকিৎসার কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে—যেমন অতিমারির মতো জরুরি পরিস্থিতি। কিন্তু এনসিএইচ-এর আপত্তি, মহারাষ্ট্র সেই সীমিত ব্যতিক্রমকে কার্যত স্থায়ী এবং খোলামেলা অনুমতিতে পরিণত করেছে।

ফলে বিতর্কটি শুধু হোমিওপ্যাথি বনাম আধুনিক চিকিৎসার নয়। মূল প্রশ্ন তিনটি—এক বছরের সেতু-পাঠ্যক্রম কি আধুনিক চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের বিকল্প হতে পারে, এতে রোগীর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত থাকবে, এবং চিকিৎসকের ঘাটতি মেটানোর নামে গ্রামীণ মানুষকে কি তুলনামূলক ভাবে কম প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের উপর নির্ভর করতে বাধ্য করা হবে? মহারাষ্ট্রের আদালতে চলা মামলার নিষ্পত্তি তাই শুধু ওই রাজ্যের নয়, দেশের অন্য রাজ্যগুলির নীতির উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।