Home সংস্কৃতি ও বিনোদন ফড়িং, বিশ্বযাত্রী!

ফড়িং, বিশ্বযাত্রী!

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
21 views 3 minutes read
A+A-
Reset

পৃথিবীর প্রাচীনতম পতঙ্গবংশের উত্তরসূরি এই ‘ওয়ান্ডারিং গ্লাইডার’। ভারত থেকে পূর্ব আফ্রিকা—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের পরিযানের পথ পৌঁছতে পারে ১৮ হাজার কিলোমিটার। আরও আশ্চর্য, পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই ফড়িংগুলি কার্যত একই বৈশ্বিক জনগোষ্ঠীর অংশ।

প্যাট্রিক বার্কহ্যাম

জয় হোক ‘ওয়ান্ডারিং গ্লাইডার’-এর—পৃথিবীর আকাশে ঘুরে বেড়ানো এক সত্যিকারের বিশ্বনাগরিক। এমন এক পতঙ্গ, যার কাছে দেশের সীমানা তো দূরের কথা, মহাসাগরও যেন কোনও বড় বাধা নয়।

কোনও ফড়িংকে বিদ্যুৎগতিতে আকাশ চিরে উড়তে দেখলে কিংবা মাঝ-আকাশে নিখুঁত কৌশলে ছোট পতঙ্গ শিকার করতে দেখলে হয়তো বোঝাই যায় না, কত পুরনো এক বিবর্তনীয় গল্পের উত্তরসূরি সে।

প্রায় ২০ কোটি বছর ধরে ফড়িংদের জীবনধারায় বড় কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়েনি। ওডোনাটা বর্গের এই পতঙ্গেরা সরাসরি সেই প্রাচীন ডানাওয়ালা পতঙ্গদের উত্তরসূরি, যাদের ‘গ্রিফিন ফ্লাই’ বলা হয়। পৃথিবীতে তাদের আবির্ভাব হয়েছিল প্রায় ৩১ কোটি ৭০ লক্ষ বছর আগে।

এমন এক প্রাণী, যার বিবর্তনের শুরু হয়েছিল আজকের পৃথিবীর সম্পূর্ণ আলাদা ভূগোলের সময়ে, সে যদি সারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়—তাতে অবাক হওয়ার কী আছে!

সর্বত্র তার ডানা

পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, আকাশের দিকে তাকালে দেখা মিলতে পারে এই মসৃণ, দ্রুতগামী ফড়িংটির। স্বচ্ছ ডানা, হলুদ বা সোনালি বক্ষদেশ এবং তার উপর গাঢ় একটি রেখা—এটাই তার চেনা চেহারা।

অ্যান্টার্কটিকা বাদে পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশেই ওয়ান্ডারিং গ্লাইডারের দেখা মেলে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হিমালয়ের ৬ হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতাতেও দিব্যি টিকে থাকতে পারে তারা। এমনকি মহাসাগরের মাঝখানে বিচ্ছিন্ন, প্রত্যন্ত দ্বীপও তাদের কাছে অচেনা নয়।

বড় হওয়া, ঝটপট

অনেক ফড়িংয়ের জলজ শূককীট পুকুরে বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। ওয়ান্ডারিং গ্লাইডার সেখানে ব্যতিক্রম।

মাত্র ৩৮ দিনের মধ্যেই তার শূককীট পূর্ণতা পেতে পারে। ফলে সাময়িক ভাবে তৈরি হওয়া জলাশয় তো বটেই, এমনকি সুইমিং পুলকেও প্রজননের কাজে ব্যবহার করতে পারে স্ত্রী ফড়িং।

একটি স্ত্রী ওয়ান্ডারিং গ্লাইডার একবারে ২ হাজার পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে।

এই দ্রুত প্রজনন এবং পৃথিবীজোড়া বিস্তারই ইঙ্গিত দেয় তার আরও বিস্ময়কর ক্ষমতার দিকে।

ক্ষুদে, অথচ দূরন্ত

দৈর্ঘ্য মাত্র সাড়ে চার সেন্টিমিটার। ওজন এক গ্রামেরও সামান্য অংশ।

অথচ জানা সমস্ত পতঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ পরিযানের রেকর্ড রয়েছে এই ক্ষুদ্র প্রাণীটির দখলে।

একাধিক প্রজন্ম মিলিয়ে ভারত থেকে পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত তাদের যাত্রাপথ পৌঁছতে পারে ১৮ হাজার কিলোমিটার। আরও অবিশ্বাস্য হল, কোনও কোনও ফড়িং একাই প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার খোলা সমুদ্র পেরিয়ে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করতে পারে।

তাদের এই অসম্ভব যাত্রায় সাহায্য করে অনেক উঁচু দিয়ে বয়ে চলা মৌসুমি বায়ু।

রহস্য ফাঁস হল কবে?

লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের পতঙ্গবিদ্যার প্রধান কিউরেটর বেন প্রাইস জানিয়েছেন, এই অবিশ্বাস্য পরিযানের রহস্যের অনেকটাই জানা গিয়েছে এই শতাব্দীতে।

২০০৯ সালে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী চার্লস অ্যান্ডারসন প্রথম এই পরিযাত্রার ধারণাটি সামনে আনেন। মালদ্বীপে বসবাসকারী অ্যান্ডারসন লক্ষ্য করেছিলেন, অক্টোবরের মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে ওয়ান্ডারিং গ্লাইডারের দল দ্বীপগুলিতে এসে পৌঁছয়। তার পর ফের যাত্রা শুরু করে সেশেলসের দিকে।

কিন্তু সেখানেই থামে না তাদের সফর।

আরও এগিয়ে তারা পৌঁছে যায় পূর্ব আফ্রিকায়। সেখানে মৌসুমি বৃষ্টিতে তৈরি হওয়া অস্থায়ী জলাশয় হয়ে ওঠে তাদের প্রজননক্ষেত্র। জন্ম নেয় নতুন প্রজন্ম। সেই নতুন প্রজন্মই আবার শুরু করে পরবর্তী যাত্রা।

সীমান্ত মানে না

২০১২ সালে আইসোটোপ-ভিত্তিক প্রমাণ এই বিশাল পরিযাত্রার ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। আর ২০১৬ সালের একটি জিনগত গবেষণায় সামনে আসে আরও বিস্ময়কর তথ্য।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ওয়ান্ডারিং গ্লাইডাররা পরস্পরের সঙ্গে প্রজনন করে এবং কার্যত একটি বৈশ্বিক জনগোষ্ঠী হিসেবেই টিকে রয়েছে।

মানুষের আঁকা রাষ্ট্রসীমা, মহাদেশের বিভাজন কিংবা হাজার হাজার কিলোমিটার মহাসাগর—কোনও কিছুই এই ক্ষুদ্র পতঙ্গের জৈবিক পৃথিবীকে আলাদা করতে পারেনি।

নিঃশব্দ বিস্ময়

বেন প্রাইসের মতে, এত পরিচিত এবং সর্বত্র দেখা যায় এমন একটি পতঙ্গ যে পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর পরিযানের রহস্য একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আমাদের চোখের আড়ালে রাখতে পারে, সেটাই মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির পৃথিবীতে এখনও কত কিছু আবিষ্কার করা বাকি।

তাঁর ভাষায়, ওয়ান্ডারিং গ্লাইডার হল—“সর্বত্র উপস্থিত, নির্ভীক এবং নিঃশব্দে বিস্ময়কর।”

তাই বছরের সেরা অমেরুদণ্ডী প্রাণী বেছে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় তাঁর ভোট এই ক্ষুদ্র বিশ্বপর্যটকের পক্ষেই।

আগস্টের ৩ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত পাঠকদের মনোনীত হাজার হাজার অসাধারণ অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্য থেকে প্রতিদিন একটির পরিচয় তুলে ধরা হচ্ছে। সব প্রতিযোগীর পরিচয় প্রকাশের পর পাঠকদের ভোটে নির্বাচিত হবে তাঁদের প্রিয় অমেরুদণ্ডী প্রাণী।

সেই প্রতিযোগিতায় ওয়ান্ডারিং গ্লাইডারের দাবি অবশ্যই আলাদা। কারণ কয়েক গ্রাম তো দূরের কথা, এক গ্রামেরও ভগ্নাংশ ওজনের একটি প্রাণী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারত মহাসাগর পেরিয়ে যে মহাযাত্রা সম্পূর্ণ করে, তা প্রকৃতির বিস্ময়ের তালিকায় নিঃসন্দেহে আলাদা জায়গা পাওয়ার যোগ্য।

একটি ছোট্ট ফড়িং। অথচ তার পৃথিবী—পুরো পৃথিবী।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles