Home International হরমুজ খুলতে ইরানের ‘শর্তের পাহাড়’, আমেরিকাকে আচরণ বদলের বার্তা

হরমুজ খুলতে ইরানের ‘শর্তের পাহাড়’, আমেরিকাকে আচরণ বদলের বার্তা

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
16 views 4 minutes read
A+A-
Reset

তেহরান, ৮ অগস্ট: কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ফের খুলতে আমেরিকার সামনে একগুচ্ছ কড়া শর্ত রাখল ইরান। তেহরানের সাফ কথা, আমেরিকা তার ‘আচরণ সংশোধন’ না করা পর্যন্ত হরমুজ খুলবে না। এর মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরশাহি অভিযোগ করেছে, তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা অ্যাডনকের একটি জাহাজকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নিশানা করা হয়েছে। ফলে একদিকে যখন সমঝোতার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে নতুন হামলার অভিযোগে শনিবারও হরমুজ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটল না।

আগে বদলাক আমেরিকা

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, আমেরিকা ‘নিজের আচরণ সংশোধন’ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী খুলবে না। পরিষদের সচিব তথা ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের কমান্ডার মহম্মদ বাঘের জোলঘদরের এই বক্তব্য প্রকাশ করেছে ইরানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম।

তেহরানের শর্তের তালিকাও বেশ দীর্ঘ। ইরানকে ভবিষ্যতে আর কখনও হুমকি দেওয়া যাবে না—এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে ওয়াশিংটনকে। ইরান এবং পশ্চিম এশিয়ায় তার সশস্ত্র মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ স্থায়ী ভাবে বন্ধ করতে হবে। ইরানের বন্দরগুলির উপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং অঞ্চলটি থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নিতে হবে।

ক্ষতিপূরণও চাই

শর্তের এখানেই শেষ নয়। যুদ্ধের ফলে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ‘সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ’ চেয়েছে তেহরান। পাশাপাশি ইরানের উপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ‘নিঃশর্তে’ মুক্ত করার দাবিও জানিয়েছে তারা।

ইরানের এই নতুন দাবিগুলি নিয়ে ওয়াশিংটনের তরফে শনিবার পর্যন্ত কোনও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

আমেরিকা এত দিন বলে এসেছে, হরমুজ নিয়ে গ্রহণযোগ্য সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে না। জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তি অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি এবং ক্ষতিপূরণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হওয়ার কথা ছিল। বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদের বিষয়টিও আলোচনার টেবিলে থাকার কথা।

নৌপথে কিছুটা সুরাহা

তবে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার জানিয়েছেন, জাহাজ চলাচলের প্রশ্নে দু’পক্ষ সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিশেষ করে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নির্দিষ্ট পথ নির্ধারণে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

কিন্তু এখানেই রয়েছে বড় ‘কিন্তু’। আরাঘচি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, শুধু নৌপথ ঠিক হয়ে গেলেই হরমুজ খুলে দেওয়া হবে না। এর সঙ্গে ইরানের বাকি শর্তগুলিও পূরণ করতে হবে।

বর্তমান সঙ্কটের জন্য সরাসরি আমেরিকাকেই দায়ী করেছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, জুনে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে ওয়াশিংটন।

মধ্যস্থতায় ওমান

ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে ওমান। মাস্কাট শনিবার জানিয়েছে, আলোচনা ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে’ এগোচ্ছে। একই সঙ্গে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলারও নিন্দা করেছে ওমান।

যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ দিয়ে অবাধেই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল করত। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। কার্যত প্রণালীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, তাদের নির্ধারিত পথ দিয়েই জাহাজ চলাচল করতে হবে। প্রণালী ব্যবহারের জন্য অর্থ আদায়ের ব্যবস্থার পক্ষেও সওয়াল করেছে তারা।

ইরানের অভিযোগ, নির্ধারিত পথ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে একাধিক জাহাজ। সেই অভিযোগে কয়েকটি জাহাজে হামলাও চালিয়েছে তেহরান।

শুল্কে আপত্তি ওয়াশিংটনের

হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানকে কোনও ধরনের শুল্ক দেওয়ার ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী আমেরিকা।

যদিও জুনের চুক্তিতে হরমুজের ‘ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যবস্থা’ নিয়ে প্রতিবেশী উপকূলবর্তী রাষ্ট্র ওমানের সঙ্গে ইরানকে আলোচনা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছনোর জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা আর এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় পরেই শেষ হওয়ার কথা। প্রয়োজন হলে সেই সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে। ইরান জানিয়েছে, হরমুজ পরিচালনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে পৃথক সমঝোতাও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে।

পেজেশকিয়ানের ‘সময়’

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অবশ্য মনে করছেন, সমঝোতায় পৌঁছনোর জন্য এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

ইরানি সংবাদমাধ্যম তাঁকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, দেশের ভিতরে এখন সংহতি, শক্তি ও ঐক্য রয়েছে। তাঁর দাবি, চলতি যুদ্ধে ইরানকে ‘বিজয়ী ও শক্তিশালী’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তবে হরমুজের পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক নয়। একের পর এক হামলার জেরেই এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছিল। তার পর থেকে মধ্যস্থতাকারীরা দু’পক্ষকে জুনের সমঝোতার শর্তে ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ। যুদ্ধের আগে এটি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে ব্যবহৃত হত। বর্তমানে সেই পথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই কম।

নতুন হামলার অভিযোগ

এর মধ্যেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে আমিরশাহির অভিযোগে।

আবু ধাবির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস সংস্থা অ্যাডনকের মালিকানাধীন একটি জাহাজ শনিবার হরমুজ দিয়ে যাওয়ার সময় আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে আমিরশাহি কর্তৃপক্ষ।

তাদের বিদেশ মন্ত্রকের অভিযোগ, বাণিজ্যিক জাহাজের উপর ধারাবাহিক হামলার অংশ হিসেবেই ইরান ওই জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

অ্যাডনক জানিয়েছে, শনিবার ভোরের ওই হামলায় কোনও প্রাণহানি হয়নি। তবে ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে হরমুজ দিয়ে যাতায়াতের সময় তাদের এক ডজনেরও বেশি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। ওই সব ঘটনায় এক জন নাবিক নিহত এবং আরও ২০ জন আহত হয়েছেন।

শনিবারের হামলাটি ঠিক কোথায় হয়েছে বা জাহাজটির কতটা ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে অবশ্য বিস্তারিত জানায়নি অ্যাডনক।

আগুন, তবে রহস্যও

পরে ব্রিটেনের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানায়, ওমানের খাসাব শহরের পূর্ব দিকে একটি জাহাজে কোনও একটি প্রক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে। আঘাতের জেরে জাহাজটিতে আগুন ধরে গেলেও পরে তা নিভিয়ে ফেলা হয়।

জাহাজ এবং তার নাবিকেরা নিরাপদ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

তবে এই ঘটনাটিই অ্যাডনকের জাহাজে হামলার ঘটনা কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

ফলে হরমুজ ঘিরে আপাতত ছবিটা দ্বিমুখী—আলোচনার টেবিলে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সমুদ্রপথে হামলার অভিযোগ সেই সম্ভাবনাকেই বারবার অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আর ইরানের শর্তের তালিকা যত দীর্ঘ হচ্ছে, হরমুজ ফের স্বাভাবিক হওয়ার পথও ততই কঠিন হয়ে উঠছে।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles