কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় দাবানলের দাপটে কার্যত বিপর্যস্ত জনজীবন। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের হাত থেকে বাঁচতে ইতিমধ্যেই ২০ হাজারেরও বেশি মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একাধিক বাড়ি পুড়ে গিয়েছে, কোথাও আবার আগুনের মধ্যে বাসিন্দারা আটকে পড়েছেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে শনিবার গোটা প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড এবি।
আগুনের ‘বিস্ফোরণ’
প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় এখন একশোরও বেশি দাবানল জ্বলছে। প্রশাসনের হিসাবে, তার প্রায় অর্ধেকই এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দীর্ঘস্থায়ী খরা, তীব্র গরম এবং ঝোড়ো হাওয়ার ত্রিমুখী আক্রমণে আগুন ছড়াচ্ছে অস্বাভাবিক গতিতে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া দাবানল পরিষেবার দমকল আধিকারিকদের কথায়, পরিস্থিতি এখন ‘বিস্ফোরক’।
সবচেয়ে ভয়াবহ ছবি ওকানাগান হ্রদের আশপাশে। প্রায় ১২ হাজার মানুষের বাস সামারল্যান্ড শহরের প্রত্যেক বাসিন্দাকে শুক্রবার রাতেই এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কাছাকাছি পিচল্যান্ড এবং সংলগ্ন এলাকা থেকে আরও প্রায় ৮ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঠিক কতগুলি বাড়ি আগুনে ধ্বংস হয়েছে, শনিবার পর্যন্ত তার হিসাব নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন।
আটকে পড়েছিলেন অনেকে
প্রিমিয়ার ডেভিড এবি জানিয়েছেন, আগুনের মধ্যে কয়েক জন বাসিন্দা আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের উদ্ধার করতে হয়েছে। আগুন পেরিয়ে যাওয়া এলাকাগুলিতেও তল্লাশি চালাচ্ছে উদ্ধারকারী দল—কেউ সেখানে আটকে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে।
এবি বলেন, ‘‘আমি জানি, বহু পরিবারের কাছে আজকের দিনটি কল্পনাতীত যন্ত্রণার। মানুষ তাঁদের বাড়ি হারিয়েছেন। বহু মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। আবার কেউ কেউ প্রিয়জনের খবর পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।’’
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া দাবানল পরিষেবার দমকল অভিযানের অধিকর্তা ক্লিফ চ্যাপম্যান জানান, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে সড়কপথে বেরিয়ে আসতে না-পারা মানুষদের উদ্ধারে দমকলের হেলিকপ্টার নামাতে হয়।
তাঁর মতে, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা সমন্বয় রেখে কাজ না করলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও অনেক বেশি হতে পারত।
কয়েক ঘণ্টায় ৫০ বর্গকিমি
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ‘বাল্ড রেঞ্জ’ দাবানল। শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রথম আগুনের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে প্রায় ৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায়।
প্রথমে ছোট জনপদ ফল্ডারকে গ্রাস করে আগুন। তারপর মাত্র ১৫ কিলোমিটার পথ অস্বাভাবিক দ্রুততায় পেরিয়ে পৌঁছে যায় সামারল্যান্ডে।
চ্যাপম্যানের সতর্কবার্তা, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অন্য এলাকাতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। গোটা প্রদেশে আগুন ছড়ানোর পরিবেশকে তিনি ‘বিস্ফোরক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
জরুরি ক্ষমতা বাড়ল
প্রদেশের জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী কেলি গ্রিন জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে প্রশাসনের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা এসেছে।
প্রয়োজনে কোনও এলাকায় যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। পাশাপাশি ঘরছাড়া মানুষের জন্য হোটেল বা অন্য থাকার জায়গা সংরক্ষণ করার ক্ষমতাও ব্যবহার করতে পারবে প্রশাসন।
ওকানাগান-সিমিলকামিন আঞ্চলিক জেলার জরুরি বিভাগের কর্মকর্তা এরিক থম্পসনের মতে, এই অঞ্চলে তাঁর দেখা সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া দাবানলগুলির অন্যতম এটি।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে থম্পসনকেও জরুরি পরিচালন কেন্দ্র ছেড়ে নিজের পরিবারকে নিয়ে পালাতে হয়।
এ বার নিজেরাই পালালেন
শনিবার ভোরে গাড়ি থেকে প্রকাশ করা একটি ভিডিয়োয় থম্পসন জানান, পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে তাঁকে নিজেই জরুরি পরিচালন কেন্দ্র ছাড়তে হয়েছে। তাঁরা দক্ষিণ দিকে যাচ্ছিলেন। সেই সময় রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছিল।
সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিয়োয়ও ধরা পড়েছে ভয়াবহ পরিস্থিতির ছবি। একের পর এক বাড়ি জ্বলছে। রাস্তার দু’পাশে আগুনের শিখা, তার মধ্য দিয়েই প্রাণ বাঁচাতে এলাকা ছাড়ছেন বাসিন্দারা।
‘থাকব, না পালাব?’
সামারল্যান্ডের বাসিন্দা কেরি গোল্ড এবং তাঁর স্বামী মাইক এলসিঙ্গা রাত প্রায় সাড়ে ১২টার সময় বাড়ি ছাড়েন। কাছাকাছি পাহাড় পেরিয়ে আগুন দ্রুত এগিয়ে আসতে দেখেছিলেন তাঁরা।
গোল্ড বলেন, ‘‘ভয় লাগছে। আগুন অত্যন্ত দ্রুত এগোচ্ছে।’’
কিছু দিন আগেই ভ্যাঙ্কুভার থেকে ওই এলাকায় এসেছিলেন তাঁরা। বিপদের আশঙ্কায় আগেই ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলেন। পোষ্য বিড়ালটিকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও তৈরি ছিল। পাশাপাশি এক প্রতিবন্ধী বন্ধুকে এলাকা ছাড়তে সাহায্য করার পরিকল্পনাও করেছিলেন তাঁরা।
এলসিঙ্গার কথায়, ‘‘নিজের বাড়ি ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় থেকে গিয়ে বাড়িটাকে রক্ষা করি। কিন্তু আগুনের মধ্যে আটকে পড়ার ঝুঁকিও নেওয়া যায় না।’’
কানাডার পুরনো দুঃস্বপ্ন
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কানাডায় দাবানলের তীব্রতা এবং ধ্বংসের মাত্রা ক্রমশ বেড়েছে। একাধিকবার বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
দাবানলের ধোঁয়া সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আকাশও ঢেকে দিয়েছে বহু বার।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার এবারের দাবানল ফের সেই পুরনো আতঙ্ককেই সামনে আনল। খরা, তীব্র তাপ এবং ঝোড়ো হাওয়ার মিশেলে আগুন যখন ঘণ্টার মধ্যে কয়েক দশক কিলোমিটার পেরিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু আগুন নেভানো নয়—আগুনের আগেই মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া।