বিজেপির গড়ে ধাক্কা, উপনির্বাচনে হার: ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে শুরু নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক

যা জানা জরুরি
- বিহারের পাটনার বাঁকিপুর আসনের উপনির্বাচনে টানা তিন দশকের দখল হারিয়েছে শাসক বিজেপি।
- পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দেশজুড়ে চলা ‘ককরোচ’ ছাত্র আন্দোলনের আবহে এই ফলাফলকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে বিরোধীরা।
- তাদের দাবি, এই আন্দোলনই তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিজেপির প্রতি সমর্থনে চিড় ধরাতে শুরু করেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বিহারের পাটনার বাঁকিপুর আসনের উপনির্বাচনে টানা তিন দশকের দখল হারিয়েছে শাসক বিজেপি। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দেশজুড়ে চলা ‘ককরোচ’ ছাত্র আন্দোলনের আবহে এই ফলাফলকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে বিরোধীরা। তাদের দাবি, এই আন্দোলনই তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিজেপির প্রতি সমর্থনে চিড় ধরাতে শুরু করেছে।
এই নির্বাচনে নবগঠিত জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা তথা নির্বাচনী কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা প্রশান্ত কিশোর বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বাঁকিপুর আসনে জয়ী হন। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির দখলে থাকা এই আসনের ফলাফল তাই জাতীয় রাজনীতিতেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
উপনির্বাচনটি এমন সময়ে হয়েছে, যখন পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলনের জেরে কেন্দ্রের শিক্ষা মন্ত্রক বড় চাপের মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করতে হয়। বিরোধীদের মতে, জনরোষের সামনে নতি স্বীকার করতে অনিচ্ছুক বলে পরিচিত মোদী সরকারের জন্য এটি ছিল বিরল ঘটনা।
জয়ের পর প্রশান্ত কিশোর বলেন, এই ফল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে একটি সতর্কবার্তা। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি এবং কর্মসংস্থান তৈরিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে বিজেপি দু’টিতে পরাজিত হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া আসন কংগ্রেস ধরে রেখেছে, অন্যদিকে গুজরাটের মাঞ্জলপুরে বিজেপি সহজেই জয় পেয়েছে।
প্রশান্ত কিশোরের সমর্থকদের দাবি, তাঁর প্রচারের মূল বিষয় ছিল শিক্ষা, প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ—যা নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। বিজেপির একসময়ের সমর্থক দীপক শর্মা দ্য হিন্দুকে বলেন, ‘অন্য নেতাদের মতো বড় বড় প্রতিশ্রুতি না দিয়ে তিনি শুধু বলেছেন—আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য ভোট দিন।’
বিরোধীদের মতে, সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব তরুণ ভোটারদের মনোভাবেও পড়তে শুরু করেছে। ভারতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকারি হিসেবে যুব বেকারত্বের হার ১৬ শতাংশ হলেও ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সি স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের ২০ শতাংশ কর্মহীন। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এই অসন্তোষই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মনে করা হচ্ছে।
‘ককরোচ জনতা’ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সামাজিক মাধ্যমে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচার হিসেবে। এক প্রবীণ বিচারপতি বেকার যুবকদের ‘আরশোলা’ ও ‘পরজীবী’ বলে মন্তব্য করার পর সেই শব্দকে হাতিয়ার করেই আন্দোলনের জন্ম। পরে তা দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনে পরিণত হয় এবং ইনস্টাগ্রামে তাদের অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ৬৬ লক্ষ ছাড়িয়েছে—যা বিজেপি ও কংগ্রেসের সম্মিলিত অনুসারীর সংখ্যারও বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারে বিজেপির নেতা নীতিন নবীন এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মূলত জেন-জি প্রজন্মের ছাত্রদের ‘দেশ ভাঙতে চাওয়া ভাইরাস’ এবং ‘আরশোলা বাহিনী’ বলে আক্রমণ করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি বলেন, দল ফলাফল নিয়ে গভীর আত্মসমালোচনা করবে। বিজেপির শীর্ষ সূত্রের বক্তব্য, এই হার দেখিয়ে দিল যে দলের মূল সমর্থকদের একাংশও মত বদলাতে পারেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাঁকিপুরের ফলাফল কেবল একটি আসনের হার-জিত নয়, তার প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। দিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক অজয় বোস বলেন, ‘ছাত্র আন্দোলনের পরপরই এই পরাজয় বিজেপির ভাবমূর্তির জন্য অস্বস্তিকর। আমি সরাসরি আন্দোলনের সঙ্গে ফলাফলকে যুক্ত করব না, কিন্তু বিহার যেহেতু আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল, তাই জনমনে এই দুই ঘটনাকে একসঙ্গে দেখাই স্বাভাবিক।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ফল থেকেই সারা দেশে রাজনৈতিক হাওয়া বদলে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। তাঁর মতে, ‘যেটা বদলাচ্ছে, তা হল বিজেপির নির্বাচনী যন্ত্র অজেয়—এই ধারণা। এত দিন অনেকের বিশ্বাস ছিল, বিজেপি যে কোনও নির্বাচন জিতে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বাঁকিপুরের ফল সেই ধারণায় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিল।’
এদিকে সরকার ও প্রযুক্তি সংস্থা মেটার মধ্যে নতুন বিতর্কও তৈরি হয়েছে। নরেন্দ্র মোদীর পরীক্ষায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি-সংবলিত একটি ভিডিও কিছু সময়ের জন্য ফেসবুক থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় সংসদের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক স্থায়ী কমিটি মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গের কাছে ব্যক্তিগতভাবে ব্যাখ্যা ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, মেটা ইতিমধ্যেই দুঃখপ্রকাশ করে জানিয়েছে, ভুয়ো তথ্য শনাক্ত করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে ভুলবশত ভিডিওটি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদেশি প্রযুক্তি সংস্থাগুলির অ্যালগরিদম রাজনৈতিক প্রচার ও জনমত গঠনে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান নিশিকান্ত দুবে অভিযোগ করেছেন, সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমের কারণে অনেক সময় জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলির তুলনায় অরাজনৈতিক বা অনানুষ্ঠানিক আন্দোলন বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তাঁর কথায়, ‘মেটা, এক্স এবং ইউটিউব তাদের অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কী করছে, তা দেশের মানুষের জানা দরকার।’
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



