বাংলাস্ফিয়ার: পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) বিক্ষোভ দমনে পাকিস্তান সরকার গুলি, দমন-পীড়ন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের পথ বেছে নিয়েছে বলে মঙ্গলবার তীব্র অভিযোগ করল ভারত। একই সঙ্গে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাকিস্তানকে জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাপ্তাহিক সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, পিওকে-তে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এ পর্যন্ত ৯০ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে দমন করে পাকিস্তান সেখানে ভয় ও সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করেছে।
জয়সওয়ালের বক্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন পাকিস্তান পিওকে বিধানসভার দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্বাচন সম্পূর্ণ করতে দুটি আসনে ভোটগ্রহণ করেছে। এই নির্বাচনকে তিনি “সম্পূর্ণ প্রহসন” বলে অভিহিত করেন। তাঁর কথায়, নির্বাচনের নামে গণতন্ত্রের মুখোশ পরানো হলেও বাস্তবে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকারকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হচ্ছে।
ভারতের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে পিওকে-তে অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সমস্যা, বেকারত্ব এবং প্রশাসনিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়। সেই বিক্ষোভ দমাতে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি চালায়, বহু মানুষকে গ্রেফতার করে এবং বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। রাজনৈতিক কর্মী, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিকদের উপরও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে ভারতের দাবি।
বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, পাকিস্তান একদিকে কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার চালালেও, অন্যদিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীরেই মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ। বরং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমন করতে রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
জয়সওয়াল বলেন, আন্তর্জাতিক মহলের উচিত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতার দিকে না তাকিয়ে পিওকে-তে সাধারণ মানুষের উপর চালানো দমননীতি এবং নির্বিচার হত্যার দিকে নজর দেওয়া। তাঁর দাবি, পাকিস্তান সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেই নির্বাচনের আয়োজন করছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীর, যার মধ্যে পাকিস্তান-অধিকৃত অংশও রয়েছে, ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে নয়াদিল্লি জানিয়েছে, পিওকে-তে পাকিস্তানের যে কোনও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ ভারতের সার্বভৌমত্বকে প্রভাবিত করতে পারে না।
সাম্প্রতিক সময়ে পিওকে-তে একাধিক দফায় বিক্ষোভ, ধর্মঘট এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের অতিরিক্ত মূল্য, প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার অভিযোগ তুলে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। ভারতের বক্তব্য, এই অসন্তোষ মোকাবিলায় রাজনৈতিক সংলাপের পরিবর্তে পাকিস্তান বলপ্রয়োগের পথ নিয়েছে।
পাকিস্তান অবশ্য ভারতের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। ইসলামাবাদের দাবি, পিওকে-তে নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মেনেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল বলেও পাকিস্তানের বক্তব্য।
তবে ভারত মনে করছে, নির্বাচনের আড়ালে বাস্তব পরিস্থিতি আড়াল করার চেষ্টা চলছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নয়াদিল্লির আবেদন, শুধু ভোটগ্রহণের দিকে নয়, পিওকে-র মানুষের মানবাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত, সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হোক। ভারতের মতে, পাকিস্তানকে এই অভিযোগগুলির জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে জবাবদিহি করতে হবে।