International

ইরানের জেদে আটকে ট্রাম্প, অনিশ্চিত শান্তির পথ

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতির অন্যতম পরিচিত কৌশল—পরাজয় স্বীকার না করা, বরং প্রতিটি পরিস্থিতিতেই নিজের জয় ঘোষণা করা।
  • নিউ ইয়র্কের বিতর্কিত আইনজীবী ও তাঁর রাজনৈতিক গুরু রয় কোহনের কাছ থেকেই নাকি এই কৌশল শিখেছিলেন ট্রাম্প।
  • কিন্তু ইরানের সামনে এসে সেই কৌশলই যেন কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতির অন্যতম পরিচিত কৌশল—পরাজয় স্বীকার না করা, বরং প্রতিটি পরিস্থিতিতেই নিজের জয় ঘোষণা করা। নিউ ইয়র্কের বিতর্কিত আইনজীবী ও তাঁর রাজনৈতিক গুরু রয় কোহনের কাছ থেকেই নাকি এই কৌশল শিখেছিলেন ট্রাম্প।

কিন্তু ইরানের সামনে এসে সেই কৌশলই যেন কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে।

কারণ তেহরানও আপস করতে নারাজ। ট্রাম্প যখন দাবি করছেন, চলতি সপ্তাহেই নতুন করে শান্তি-আলোচনা শুরু হতে পারে, তখন ইরান স্পষ্ট করে দিচ্ছে—আলোচনার শর্ত এবং গতি নির্ধারণের ক্ষমতা এখনও তাদের হাতেই।

একদিকে মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে তেহরান। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালীর উপর চাপ বজায় রেখে বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখছে। ফলে সময় যত গড়াচ্ছে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপও তত বাড়ছে।

সামনে আবার মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে ওয়াশিংটনকে।

ট্রাম্প বলছেন আলোচনা, ইরান বলছে—কোথায়?

নতুন শান্তি-আলোচনার ঘোষণা দেওয়ার পরই ইরান তা সরাসরি অস্বীকার করে।

ক্ষুব্ধ ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ইরানের নেতৃত্বকে “অবিশ্বাস্য রকমের দ্বিচারী” বলে আক্রমণ করেন। তাঁর দাবি, আলোচনার জন্য তেহরানই যোগাযোগ করেছিল এবং ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে।

একই সঙ্গে ট্রাম্পের বার্তা ছিল কঠোর—“চুক্তি বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ” ছাড়া ইরানের জন্য কোনও পথ খোলা নেই।

সমস্যা হল, তেহরান সেই বয়ান গ্রহণই করছে না।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা হাতের নাগালে। সাম্প্রতিক দিনগুলিতেও তিনি বলেছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই শান্তিচুক্তি হতে পারে। তাঁর দাবি, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার বিষয়ে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছে।

কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি সোমবার সেই দাবির বিপরীত ছবি তুলে ধরেছেন।

তাঁর বক্তব্য, “এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কোনও আলোচনা চলছে না।”

তেহরানের দাবি, ওমানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ মূলত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়েই সীমাবদ্ধ।

হরমুজই ইরানের বড় অস্ত্র

এখানেই ইরানের কৌশলগত সুবিধা।

ওমানের সঙ্গে কোনও সমঝোতা হলেও হরমুজ প্রণালীকে যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। তাদের যুক্তি, ভবিষ্যতে যাতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন চালানো দেশগুলি এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাস্তবে এর অর্থ হল, হরমুজ এখনও ইরানের হাতে একটি শক্তিশালী দর-কষাকষির অস্ত্র।

চাইলে তেহরান এই জলপথে জাহাজ চলাচলে বড় বাধা তৈরি করতে পারে। আর হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহণ হয়। ফলে সেখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

ইরানের হাতে রয়েছে আরেকটি চাপ তৈরির পথ—উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের উপর হামলার সম্ভাবনা।

অর্থাৎ যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও আলোচনার টেবিলে তেহরান পুরোপুরি কোণঠাসা নয়। বরং অনিশ্চয়তাকেই তারা কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

আমেরিকার হাতেও সীমাবদ্ধতা

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। ওয়াশিংটনের হাতে এখনও ইরানের উপর বড় ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।

কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।

ইরানের এমন কার্যকর লক্ষ্যবস্তু এখন কতটা অবশিষ্ট রয়েছে, যেগুলিতে হামলা চালিয়ে তেহরানের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব—সেটিই বড় প্রশ্ন। তার সঙ্গে রয়েছে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের মজুত নিয়ে উদ্বেগ।

দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চললে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ ক্ষয় হতে থাকবে। ভবিষ্যতে চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে সংঘাত তৈরি হলে সেই মজুত কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, সেটিও ওয়াশিংটনের হিসাবের মধ্যে রয়েছে।

ফলে সামরিক শক্তি থাকা আর সেই শক্তি অনির্দিষ্টকাল ব্যবহার করতে পারা—দুই বিষয় এক নয়।

ট্রাম্পের সামনে ঘড়ির কাঁটা

এপ্রিল থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের ইতি টানতে আগ্রহী। ইতিমধ্যে তিনবার যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হলেও প্রতিবারই তা ভেঙে পড়েছে।

এর মধ্যে সামনে এগিয়ে আসছে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন।

আর মাত্র কয়েক মাস পর ভোট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে। এমনকি সিনেট নিয়েও লড়াই কঠিন হতে পারে।

অর্থাৎ ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, রাজনৈতিক ঝুঁকিও তত বাড়বে।

জনমতও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। রয়টার্স/ইপসসের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশেরও কম মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। ৬৯ শতাংশের মতে, ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের লক্ষ্য কী, তা ট্রাম্প প্রশাসন যথেষ্ট স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করতে পারেনি।

কে কাকে চাপে রাখছে?

এই জায়গাতেই ইরান-আমেরিকা সংঘাতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।

সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে। কিন্তু কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে শুধু সামরিক শক্তিই সব নয়।

ইরান জানে, হরমুজ প্রণালীতে চাপ তৈরি করার ক্ষমতা বিশ্ববাজারকে অস্থির করে দিতে পারে। জানে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করা যায়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তারা জানে, ট্রাম্প দ্রুত একটি ‘জয়’ দেখাতে চাইছেন।

তাই তেহরানের কৌশল হতে পারে সময়কে নিজের পক্ষে ব্যবহার করা।

ট্রাম্প যেখানে দ্রুত চুক্তি চান, ইরান সেখানে অনিশ্চয়তাকে দীর্ঘায়িত করছে। ট্রাম্প যেখানে ‘জয়’ ঘোষণা করতে চাইছেন, তেহরান সেখানে আলোচনার অস্তিত্বই অস্বীকার করছে।

ফলে প্রশ্নটা এখন আর শুধু যুদ্ধ কবে থামবে—এতটা সরল নয়।

আসল প্রশ্ন হল, কে শেষ পর্যন্ত আলোচনার শর্ত ঠিক করবে?

এই মুহূর্তে ট্রাম্পের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়তো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নয়। বরং এমন এক প্রতিপক্ষ, যে হারলেও আপস করতে রাজি নয়—এবং যুদ্ধ থামানোর প্রয়োজনটাকেও নিজের দর-কষাকষির অস্ত্র বানাতে জানে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles