Home খবর হরমুজ খুলবে? পর্দার আড়ালে জোর কূটনীতি

হরমুজ খুলবে? পর্দার আড়ালে জোর কূটনীতি

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
14 views 3 minutes read
A+A-
Reset

হরমুজ প্রণালী ফের জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে যুদ্ধবিরতি পুনর্বহালের লক্ষ্যে পর্দার আড়ালে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের কর্মকর্তাদের দাবি, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মধ্যস্থতায় সক্রিয় কাতার, পাকিস্তান ও ওমানও জানিয়েছে, দুই পক্ষকে ফের আলোচনার টেবিলে আনার চেষ্টা জোরদার করা হয়েছে।

এই আশাবাদী বার্তার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। মঙ্গলবার তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। তবে বাস্তবে হরমুজ এখনও জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ। তার মধ্যেই ওমান উপকূলের কাছে, প্রণালীর সংলগ্ন এলাকায় একটি মালবাহী জাহাজ অজ্ঞাত পরিচয় ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনও প্রক্ষেপণের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর। ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও সোমবার রাতের ঘটনাটি জানালেও জাহাজটির নাম প্রকাশ করেনি।

‘আজ-কালেই সমঝোতা’?

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সিএনবিসিকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে। তাঁর দাবি, “আজ অথবা আগামীকালই” এমন একটি সমঝোতা হতে পারে, যার ফলে হরমুজ প্রণালী খুলে যাবে এবং সংঘাত ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।

এই বক্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে। ট্রাম্প সোমবারই বলেছিলেন, খুব শিগগির বড় ধরনের অগ্রগতি হতে পারে।

তবে তেহরানের বক্তব্য একেবারেই আলাদা। ইরান দ্রুত জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনও প্রত্যক্ষ আলোচনা চলছে না।

অর্থাৎ, ওয়াশিংটন যেখানে সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছে, তেহরান সেখানে এখনও সরাসরি আলোচনার কথাই অস্বীকার করছে।

মধ্যস্থতায় কাতার-পাকিস্তান-ওমান

এই ফাঁকটিই পূরণ করার চেষ্টা করছে কাতার, পাকিস্তান ও ওমান।

মধ্যস্থতাকারীদের দাবি, তারা দুই পক্ষের সঙ্গেই নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। লক্ষ্য, জুনের মাঝামাঝি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি ফের কার্যকর করা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া।

বিষয়টির গুরুত্ব বিশাল। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ববাজারেও তার বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানিয়েছেন, কাতার, পাকিস্তান ও ওমান ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে কাজ করছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একাধিক খসড়া প্রস্তাবও আদান-প্রদান হচ্ছে।

তাঁর দাবি, আলোচনা “খুবই অগ্রসর পর্যায়ে” পৌঁছেছে।

একজন জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তার কথায়, “পর্দার আড়ালে অনেক কিছু ঘটছে।” তাঁর মতে, এই মুহূর্তে প্রধান লক্ষ্য অন্তত দুই পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরানো।

হরমুজে নতুন ‘নিরাপদ রুট’?

সমঝোতার পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলির একটি হল ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি অস্থায়ী নৌপথ ব্যবস্থা।

জুনের সমঝোতা জুলাইয়ে ভেঙে পড়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। কয়েকটি জাহাজ ইরানের অনুমতি ছাড়াই ওমান উপকূল ঘেঁষে হরমুজ অতিক্রমের চেষ্টা করলে ইরান সেগুলিতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ।

এবার আলোচনায় এমন একটি অস্থায়ী রুটের প্রস্তাব রয়েছে, যাতে জাহাজগুলি ইরান-সংলগ্ন পথ দিয়ে উপসাগরে ঢুকবে এবং ফেরার সময় ওমানের উপকূলঘেঁষা দক্ষিণ দিকের পথ ব্যবহার করবে।

এই রুটের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ যৌথভাবে ইরান ও ওমানের হাতে থাকার কথা।

তবে এখানেও জটিলতা কম নয়।

টোল চাইছে ইরান

হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলির কাছ থেকে টোল বা অন্যান্য ফি নেওয়ার অধিকার ইরান চায়।

এই বিষয়টি এখনই চূড়ান্তভাবে মীমাংসা না করে ৬০ দিনের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা।

ওমান অবশ্য এই প্রস্তাবে সতর্ক। মাস্কাটের আশঙ্কা, অস্থায়ী ব্যবস্থা যদি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেয়, তাহলে ওমানের জলসীমার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরানের প্রভাব স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।

তেহরানেই মতভেদ

সবচেয়ে বড় বাধা সম্ভবত ইরানের অভ্যন্তরেই।

কূটনীতিকদের মতে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমঝোতার পক্ষে। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন হরমুজের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বিকল্প পথ বেছে নেবে। তাতে ধীরে ধীরে এই প্রণালীর ওপর ইরানের কৌশলগত গুরুত্বও কমতে পারে।

কিন্তু কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলি সমঝোতার বিরোধিতা করছে। তাদের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র যে আর্থিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা রাখার কোনও কারণ নেই।

ফলে আলোচনার টেবিলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নেই—তেহরানের ভেতরের ক্ষমতার সমীকরণও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সৌদিরও বাড়ছে উদ্বেগ

আঞ্চলিক কূটনীতিকদের মতে, সৌদি আরব ওমানের ওপর বিশেষভাবে চাপ বাড়িয়েছে। রিয়াধের আশঙ্কা, ইরানের শক্তিশালী একটি অংশ কোনও সমঝোতা মানতে রাজি নয়। সেই অবস্থান শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতিকে ফের আঞ্চলিক পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এই কারণেই হরমুজ এখন শুধু একটি জলপথ নয়—এটি হয়ে উঠেছে যুদ্ধবিরতি, তেলবাজার, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু।

কূটনীতির গতি দেখে আশার আলো দেখা গেলেও বাস্তবতা এখনও অনিশ্চিত। কারণ, হরমুজ খুলতে শুধু একটি চুক্তি যথেষ্ট নয়—ওয়াশিংটন, তেহরান এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের আস্থার সংকটও কাটাতে হবে।

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles