বাংলাস্ফিয়ার: শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের আগে কেন্দ্র সরকার তাঁকে অন্য একটি মন্ত্রকে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) সেই প্রস্তাব স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দেয়, মন্ত্রক বদল নয়, পরীক্ষা-ব্যবস্থার ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় স্বীকার করে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সম্পূর্ণভাবে মন্ত্রিসভা ছাড়তে হবে। শেষ পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর প্রধান ইস্তফা দেন এবং সেই সিদ্ধান্তের পরই টানা কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও ছাত্র আন্দোলনের প্রধান পর্বের অবসান ঘটে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে শেষ পর্যায়ের আলোচনায় এই প্রস্তাব সামনে এসেছিল। সরকারের যুক্তি ছিল, শিক্ষামন্ত্রক থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে অন্য কোনও দপ্তরে পাঠানো হলে বিরোধ কমতে পারে এবং একই সঙ্গে সরকারেরও মুখরক্ষা হবে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা এটিকে ‘অর্ধেক সমাধান’ বলে উড়িয়ে দেন।

সিজেপির নেতৃত্বের বক্তব্য ছিল, প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনার ব্যর্থতা এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা নষ্ট হওয়ার জন্য যিনি রাজনৈতিকভাবে দায়ী, তাঁকে শুধু অন্য মন্ত্রকে পাঠালে কোনও বার্তা যাবে না। বরং তাতে সরকারের জবাবদিহি নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠবে। তাই তাঁদের একমাত্র দাবি ছিল, ধর্মেন্দ্র প্রধানকে মন্ত্রিসভা থেকেই সরে যেতে হবে।

এই অবস্থান সরকারের সামনে বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। কারণ একদিকে সংসদের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হচ্ছিল, অন্যদিকে দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভ ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল। বিরোধী দলগুলিও আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে সরকারের উপর চাপ বাড়াচ্ছিল। সংসদের বাইরে যেমন প্রতিবাদ চলছিল, তেমনই সংসদের ভিতরেও বিরোধীরা ধারাবাহিকভাবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি তুলছিল।

সূত্রের দাবি, সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রথম থেকেই পরিস্থিতি এমন জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছিল না, যেখানে সরাসরি একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ করতে হয়। তাই বিকল্প হিসেবে মন্ত্রক পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়। অতীতে বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়ে পড়া মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে দপ্তর বদলের নজির রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সরকার মনে করেছিল, এই পথ পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করতে পারে।

কিন্তু সিজেপি আলোচনায় স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এটি কেবল ব্যক্তির প্রশ্ন নয়; এটি জবাবদিহির প্রশ্ন। শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি কোটি কোটি ছাত্রছাত্রীর আস্থা পুনর্গঠন করতে হলে প্রতীকী নয়, বাস্তব রাজনৈতিক দায় স্বীকার করতে হবে। আন্দোলনের নেতাদের বক্তব্য ছিল, প্রশ্নফাঁসের মতো গুরুতর ঘটনাকে যদি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখানো হয়, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবারও দেখা দিতে পারে।

আলোচনার একাধিক দফায় সরকারের প্রতিনিধিরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং সরকারের ফ্লোর ম্যানেজাররাও সংসদে অচলাবস্থা কাটানোর উপায় খুঁজছিলেন। একই সময়ে আন্দোলনের মুখ সোনম ওয়াংচুকের অনশন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতিবাদ সরকারকে আরও চাপের মুখে ফেলে।

সরকারের কাছে তখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথমত, সংসদের কাজ স্বাভাবিক করা। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষা-ব্যবস্থা নিয়ে জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এই দুই লক্ষ্য সামনে রেখেই আলোচনার পাশাপাশি সরকার পরীক্ষা-সংক্রান্ত কঠোর আইন আনার প্রস্তুতিও শুরু করে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা বারবার জানিয়ে দেন, আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক দায় এড়ানো যাবে না।

শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয়, যেখানে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগই একমাত্র কার্যকর সমাধান হিসেবে সামনে আসে। তাঁর ইস্তফার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পরীক্ষা-ব্যবস্থা সংস্কারের আশ্বাস দেন এবং সরকার দ্রুত নতুন আইন ও প্রশাসনিক সংস্কারের পথে এগোবে বলে জানায়। এরপরই সিজেপি আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনায় সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দর-কষাকষির প্রকৃতি স্পষ্ট হয়েছে। সাধারণত কোনও বিতর্কিত মন্ত্রীর ক্ষেত্রে দপ্তর পরিবর্তনকে একটি ‘সমঝোতার পথ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আন্দোলনের নেতৃত্ব সেই পথ গ্রহণ করেনি। ফলে সরকার শেষ পর্যন্ত আরও বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

এই ঘটনায় আরও একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—ছাত্র আন্দোলন যখন দীর্ঘস্থায়ী জনসমর্থন পায় এবং বিরোধী দলগুলির সমর্থনও অর্জন করে, তখন কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপে সংকট মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে আইন, সংস্কার ও নতুন নীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও আন্দোলনের মূল দাবি ছিল রাজনৈতিক জবাবদিহি, এবং সেই দাবিই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে উঠে আসা এই তথ্য সরকারের অভ্যন্তরীণ কৌশল সম্পর্কেও নতুন আলোকপাত করেছে। এতে বোঝা যায়, সরকার প্রথমে একটি মধ্যপন্থী সমাধান খুঁজছিল—যেখানে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সম্পূর্ণভাবে সরানো নয়, বরং অন্য মন্ত্রকে স্থানান্তর করে সংকট প্রশমনের চেষ্টা করা হবে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের অনড় অবস্থান সেই পথ বন্ধ করে দেয়।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আপাতত একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও, পরীক্ষা-ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন, প্রশ্নফাঁস রোধ, দ্রুত বিচার, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি—এই সব ক্ষেত্রেই সরকারের সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। একই সঙ্গে এই ঘটনাকে ভবিষ্যতের আন্দোলন-রাজনীতির ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে আন্দোলনকারীরা আংশিক সমাধান প্রত্যাখ্যান করে পূর্ণ রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার দাবি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।