সৌদি সরকারের নির্দেশে দেশটির একাধিক ভিন্নমতাবলম্বী ও মানবাধিকারকর্মীর অ্যাকাউন্ট সৌদি আরবের ভেতরে ‘অদৃশ্য’ করে দিয়েছে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স। বিশ্বের অন্য প্রান্ত থেকে অ্যাকাউন্টগুলি দেখা গেলেও সৌদি ব্যবহারকারীরা সেগুলির পোস্ট আর দেখতে পাচ্ছেন না।
মানবাধিকার মহলের আশঙ্কা, এই পদক্ষেপ শুধু সোশ্যাল মিডিয়া সেন্সরশিপের ঘটনা নয়—বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ALQST-এর দাবি, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে অন্তত ৬০টিরও বেশি অ্যাকাউন্ট সৌদি আরবের জন্য জিওব্লক করা হয়েছে। অর্থাৎ, অ্যাকাউন্টগুলি পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়নি; কিন্তু সৌদি ভূখণ্ডে থাকা ব্যবহারকারীদের কাছে সেগুলি আর দৃশ্যমান নয়।
কারা ‘অদৃশ্য’ হলেন?
ব্লক হওয়া অ্যাকাউন্টগুলির মধ্যে রয়েছেন সৌদি মানবাধিকারকর্মী এবং ALQST-এর প্রধান ইয়াহিয়া আসিরি, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী সৌদি সমালোচক আবদুল্লাহ আলাউধ, নির্বাসিত কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
আলাউধের কথায়, ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর দাবি, সৌদি আরবে থাকাকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলার পর এখন নির্বাসনেও একই লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
তাঁর প্রশ্ন আরও গুরুতর—এক্স বা মেটা কেউই তো বলেনি যে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলি তাদের নিজস্ব নীতি ভেঙেছে।
অ্যাকাউন্টধারীদের পাঠানো এক্সের ই-মেলে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের স্থানীয় আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতার কারণেই সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট দেশটির ভেতরে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
‘জনশৃঙ্খলা’ ও ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ’
দ্য গার্ডিয়ান-এর হাতে আসা সৌদি সরকারের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলি এমন তথ্য প্রচার করেছে যা ‘জনশৃঙ্খলা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, জননৈতিকতা অথবা ব্যক্তিগত জীবনের পবিত্রতা’ ক্ষুণ্ণ করে।
তবে ঠিক কোন পোস্ট বা কনটেন্ট এই অভিযোগের আওতায় পড়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ALQST-এর পর্যবেক্ষণ ও প্রচার বিভাগের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আলজুরায়উই—যাঁর নিজের অ্যাকাউন্টও সৌদি আরবে ব্লক করা হয়েছে—বলছেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
তাঁর অভিযোগ, সৌদি সরকার দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বর দমনের চেষ্টা করছে। কিন্তু উদ্বেগের জায়গা হল, প্রযুক্তি সংস্থাগুলিও সেই প্রক্রিয়াকে কার্যত সহজ করে দিচ্ছে, যদিও প্রকাশ্যে তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকার দাবি করে।
‘শুধু এক্স নয়’
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এর আগে স্ন্যাপচ্যাট, ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামেও সৌদি সরকারের আইনি পদক্ষেপের পর একই ধরনের কনটেন্ট সীমাবদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে।
মানবাধিকার সংস্থা ALQST এক্স, মেটা, স্ন্যাপচ্যাট এবং ইউটিউবের কাছে ব্লক হওয়া অ্যাকাউন্টগুলি পুনরায় চালু করার দাবি জানিয়েছে।
একই সঙ্গে তাদের প্রশ্ন—কোন আইনের ভিত্তিতে, কোন নির্দিষ্ট কনটেন্টের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে?
মেটার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও কনটেন্ট স্থানীয় আইন লঙ্ঘন করেছে বলে চিহ্নিত হলেও সেটি যদি সংস্থার নিজস্ব কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড ভঙ্গ না করে, তাহলে প্রয়োজনে সেই দেশের মধ্যেই কনটেন্ট সীমাবদ্ধ করা হতে পারে।
অন্যদিকে এক্স এবং লন্ডনে অবস্থিত সৌদি দূতাবাসের কাছে এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘানেম আল-মাসারির ঘটনায় নতুন প্রশ্ন
ব্লক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সৌদি ব্যঙ্গকার ঘানেম আল-মাসারিও। তাঁর ক্ষেত্রে ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্প্রতি ব্রিটেনের একটি আদালত তাঁর আইফোনে নজরদারি এবং লন্ডনে তাঁর উপর হামলার ঘটনায় সৌদি আরবকে ৩০ লক্ষ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
মে মাসে ইউটিউবও আল-মাসারিকে জানায়, সৌদি সরকারের আইনি অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর দুটি ইউটিউব চ্যানেল সৌদি আরবে ব্লক করা হবে। ওই দুই চ্যানেলের মোট গ্রাহকসংখ্যা ৮ লক্ষেরও বেশি।
এরপর এক্সও তাঁকে সৌদি সরকারের অভিযোগের কথা জানিয়ে ই-মেল পাঠায় এবং পরে তাঁর অ্যাকাউন্ট সৌদি আরবের ভেতরে সীমাবদ্ধ করে।
আল-মাসারির বিস্ময় তাই সৌদি সরকারের পদক্ষেপে নয়, বরং প্রযুক্তি সংস্থার সাড়া দেওয়ায়।
তাঁর আশঙ্কা, আজ সৌদি আরব যদি এমন দাবি করে এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলি তা মেনে নেয়, কাল অন্য স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলিও একই পথ অনুসরণ করতে পারে।
প্রশ্নটা শুধু একটি অ্যাকাউন্টের নয়
সৌদি আরবের মতো দেশে স্থানীয় আইন মেনে চলার যুক্তি দেখিয়ে প্রযুক্তি সংস্থাগুলি কনটেন্ট সীমাবদ্ধ করবে কি না—এটি একদিকে আইনি প্রশ্ন। অন্যদিকে রয়েছে আরও বড় প্রশ্ন: কোন পর্যায়ে একটি প্রযুক্তি সংস্থা রাষ্ট্রের আইন মানছে, আর কোন পর্যায়ে তা রাষ্ট্রের সেন্সরশিপের হাতিয়ার হয়ে উঠছে?
বিশেষ করে যখন কোনও অ্যাকাউন্ট পুরো পৃথিবীর জন্য খোলা থাকলেও একটি নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের কাছে ‘অদৃশ্য’ হয়ে যায়, তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রযুক্তি সংস্থার দায়বদ্ধতার সীমারেখা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সিদ্ধান্তটি তাই শুধু কয়েক ডজন সৌদি অ্যাকাউন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও বড় প্রশ্ন—রাষ্ট্রের চাপের মুখে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি শেষ পর্যন্ত কার স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেবে?