Home খবর স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থাই সাংবিধানিক গণতন্ত্রের শক্তি, ‘সিল করা খাম’ প্রথা পুনর্বিবেচনার আহ্বান বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়ার

স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থাই সাংবিধানিক গণতন্ত্রের শক্তি, ‘সিল করা খাম’ প্রথা পুনর্বিবেচনার আহ্বান বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়ার

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
4 views 4 minutes read
A+A-
Reset
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের বিচারব্যবস্থায় আরও বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানালেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া। তাঁর মতে, যে বিচারব্যবস্থা মানুষের বেশি আস্থা অর্জন করে, সেই বিচারব্যবস্থাই সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং আইনের শাসন রক্ষা করতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। রবিবার ‘বিদি সেন্টার ফর লিগ্যাল পলিসি’-র প্রকাশিত ‘জুডিশিয়াল ট্রান্সপারেন্সি ইনডেক্স: সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টগুলিতে তথ্য প্রকাশের মূল্যায়ন’ শীর্ষক প্রতিবেদনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা থাকলে নাগরিকরা বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর নজরদারি করতে পারেন এবং সচেতনভাবে যুক্ত হতে পারেন। এর ফলে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা আরও সুদৃঢ় হয়। তিনি বলেন, “সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সুষ্ঠু কার্যকারিতার জন্য বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা অপরিহার্য। জনগণের আস্থা যত বাড়বে, বিচারব্যবস্থা ততই সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে।” বিচারপতি ভূঁইয়া স্বীকার করেন, গত কয়েক বছরে বিচারব্যবস্থা স্বচ্ছতার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তবে তাঁর কথায়, “এখনও অনেক পথ চলা বাকি।”  

‘সিল করা খাম’ প্রথা নিয়ে প্রশ্ন

অনুষ্ঠানের পরবর্তী আলোচনায় বিচারপতি ভূঁইয়া আদালতে ‘সিল করা খাম’ (Sealed Cover) প্রথার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে অনেক সময় একটি পক্ষের কাছ থেকে তথ্য গোপন রাখা হয়। কিন্তু এতে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪-এ বর্ণিত আইনের দৃষ্টিতে সমতার নীতি লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, তা বিচার করা দরকার। তাঁর বক্তব্য, “যদি এক পক্ষকে তথ্য না দেওয়া হয়, তবে কি উভয় পক্ষকে সমান সুযোগ দেওয়ার সাংবিধানিক নীতি ভঙ্গ হচ্ছে না?” তিনি বলেন, “সিল করা খামের প্রথা এখনও আদালতে অনুসৃত হচ্ছে কি না এবং তা উন্মুক্ত বিচারব্যবস্থার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নতুন করে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”  

আদালতের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার

বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, গত এক দশকে বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হল আদালতের কার্যক্রমের লাইভ স্ট্রিমিং। তিনি গ্রিক দার্শনিক প্লেটো এবং ইংরেজ আইনজ্ঞ জেরেমি বেন্থাম-এর মত উদ্ধৃত করে বলেন, উন্মুক্ত বিচারই গণবিশ্বাসের ভিত্তি। তিনি ‘স্বপ্নিল ত্রিপাঠী’ মামলার রায়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করেছিল যে, আদালতের কার্যক্রম দেখার অধিকার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯ ও ২১-এর অন্তর্ভুক্ত। তবে তিনি সাম্প্রতিক সেই নির্দেশেরও উল্লেখ করেন, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ভিডিও কেটে বা সম্পাদনা করে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার করার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বিচারপতি ভূঁইয়ার মতে, আদালতের পর্যবেক্ষণের খণ্ডাংশ প্রসঙ্গবিচ্ছিন্নভাবে প্রচার করলে বিচারক, আইনজীবী ও মামলাকারীদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে পারে এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়।  

‘উন্মুক্ত আদালতই জনবিশ্বাসের ভিত্তি’

তিনি প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি. ওয়াই. চন্দ্রচূড়ের মত উদ্ধৃত করে বলেন, নাগরিকদের আদালতের কার্যক্রম জানার অধিকার রয়েছে। জনগণ যখন আদালতের ওপর আস্থা রেখে বিরোধ মেটাতে আসে এবং আদালতের নির্দেশ মেনে নেয়, তখনই আইনের শাসন শক্তিশালী হয়। তাঁর মতে, “উন্মুক্ত আদালত নিশ্চিত করে যে বিচারকরা নিরপেক্ষ ও ন্যায্যভাবে আইন প্রয়োগ করছেন—এ কথা জনগণ নিজের চোখে দেখতে পারেন।”  

আরটিআই ও বিচারপতির দপ্তর

বিচারপতি ভূঁইয়া ‘সেন্ট্রাল পাবলিক ইনফরমেশন অফিসার, সুপ্রিম কোর্ট বনাম সুভাষ চন্দ্র আগরওয়াল’ মামলারও উল্লেখ করেন। সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে, প্রধান বিচারপতির দপ্তরও তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় ‘জন কর্তৃপক্ষ’। তিনি বলেন, ওই রায়ে একদিকে তথ্য জানার মৌলিক অধিকার, অন্যদিকে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিচারপতিদের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা যেমন জরুরি, তেমনই কিছু ক্ষেত্রে গোপনীয়তার প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যায় না। তিনি আরও বলেন, বিচারপতি চন্দ্রচূড় তাঁর পৃথক মতামতে স্পষ্ট করেছিলেন যে, বিচারপতিদের সম্পত্তির বিবরণ প্রকাশ জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা গোপনীয়তার ওপর নয়, সংবিধানপ্রদত্ত সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল।  

‘গোপনীয়তার অন্ধকারে ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়’

বিচারপতি ভূঁইয়া জেরেমি বেন্থামের ‘ওপেন জাস্টিস’ তত্ত্ব উদ্ধৃত করে বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যতটা সম্ভব প্রকাশ্য হওয়া উচিত। কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই বিচারকের চেম্বারে বা ‘ইন-ক্যামেরা’ শুনানি হতে পারে। তিনি ‘স্কট বনাম স্কট’ এবং ‘নরেশ শ্রীধর মিরাজকর’ মামলার উল্লেখ করে বলেন, ভারতীয় বিচারব্যবস্থায়ও উন্মুক্ত আদালতের নীতি সুপ্রতিষ্ঠিত। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি পি. বি. গজেন্দ্রগড়কর বলেছিলেন, প্রকাশ্য আদালতে বিচার হলে বিচারকের খামখেয়ালিপনার সম্ভাবনা কমে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়। বিচারপতি ভূঁইয়া সেই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণও স্মরণ করিয়ে দেন— “গোপনীয়তার অন্ধকারে অন্যায় ও কুপ্রবৃত্তির অবাধ বিচরণ ঘটে। যেখানে প্রকাশ নেই, সেখানে ন্যায়বিচারও নেই। প্রকাশই ন্যায়বিচারের প্রাণ।” তাঁর বক্তব্য, ভারতের বিচারব্যবস্থায় উন্মুক্ত আদালত এখন একটি স্বীকৃত নীতি। কেবলমাত্র বিরল ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে, ন্যায়বিচারের স্বার্থেই আদালত ‘ইন-ক্যামেরা’ শুনানি বা প্রকাশে নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নিতে পারে। এর বাইরে বিচারপ্রক্রিয়া সর্বদা জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles