সেউতায় ৫০ হাজারের ঢল! মরক্কোর বিরুদ্ধে সীমান্ত ‘খোলার’ অভিযোগ, বললেন প্রশাসনিক প্রধান

যা জানা জরুরি
- স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় নজিরবিহীন গণ-অনুপ্রবেশ ঘিরে মরক্কোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও তীব্র হচ্ছে।
- সেউতার প্রশাসনিক প্রধান হুয়ান হেসুস ভিভাসের দাবি, এটি নিছক অভিবাসন সংকট নয়—স্পেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের ওপরও বড় আঘাত।
- তাঁর অভিযোগ, মরক্কো হয়তো পুরো ঘটনার নেপথ্যে পরিকল্পনাকারী ছিল না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় নজিরবিহীন গণ-অনুপ্রবেশ ঘিরে মরক্কোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও তীব্র হচ্ছে। সেউতার প্রশাসনিক প্রধান হুয়ান হেসুস ভিভাসের দাবি, এটি নিছক অভিবাসন সংকট নয়—স্পেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের ওপরও বড় আঘাত।
তাঁর অভিযোগ, মরক্কো হয়তো পুরো ঘটনার নেপথ্যে পরিকল্পনাকারী ছিল না। কিন্তু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে কিংবা যথেষ্ট ব্যবস্থা না নিয়ে তারা অন্তত এই বিপুল জনস্রোতকে কার্যত অনুমতি দিয়েছে।
গত সপ্তাহে মরক্কো থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সেউতায় ঢুকে পড়েন। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দাবি, তাঁদের মধ্যে ৪৮,৩০০ জনকে ইতিমধ্যেই মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। মাত্র প্রায় ৮৪ হাজার মানুষের এই ছোট্ট ছিটমহলে একসঙ্গে এত মানুষের প্রবেশে প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যেও শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক।
‘এটা শুধু অভিবাসন নয়’
স্পেনের সংবাদপত্র এল পাইস-কে ভিভাস বলেন, “এটি এক ভয়াবহ ঘটনা।” তাঁর দাবি, মর্গে ৮৮টি মৃতদেহ রয়েছে এবং সীমান্তের ওপারেও আরও মৃতদেহ পড়ে রয়েছে।
সেউতার বাসিন্দাদের কাছে এই ঘটনা সাধারণ অভিবাসন সংকটের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর বলে দাবি ভিভাসের। তাঁর মতে, এত বিপুল মানুষকে একসঙ্গে সীমান্ত পার হতে দেওয়া স্পেনের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাতের সমান।
এর আগে ২০২১ সালেও এমন পরিস্থিতির সাক্ষী হয়েছিল সেউতা। পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাপন্থী নেতা ব্রাহিম ঘালিকে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য স্পেনে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে স্পেন-মরক্কো সম্পর্কে তীব্র উত্তেজনার সময় মরক্কো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল। মাত্র দু’দিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষ তখন সেউতায় ঢুকে পড়েছিলেন।
সীমান্ত কি ইচ্ছে করেই শিথিল?
স্পেনের গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন ভিভাসের অভিযোগকে পুরোপুরি নাকচ করছে না। গোয়েন্দাদের ধারণা, মরক্কো সরকার হয়তো এত বড় জনস্রোতের পরিকল্পনা করেনি। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে সীমান্ত পারাপারের সুযোগ করে দেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের মতে, ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি গুজব থেকে। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, সমুদ্রপথে স্পেনে পৌঁছনো অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়কে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করে এই দাবি ছড়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ।
গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পর মরক্কোর সীমান্তে নজরদারি ক্রমশ শিথিল হয়ে যায়। এরপরই হাজার হাজার মানুষ সীমান্তের দিকে ছুটে আসেন।
‘সমুদ্রে মৃতদেহ ভাসছিল’
সেউতায় এখনও বহু মানুষ সৈকত ও মসজিদের আশপাশে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন।
২৮ বছরের মরক্কোর নাগরিক আশরাফ জানান, সামাজিক মাধ্যমে সীমান্ত খুলে দেওয়ার খবর দেখে তিনি মায়ের নিষেধ অমান্য করে স্পেনে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেউতায় পৌঁছনোর পর সেই যাত্রা পরিণত হয় বাঁচার লড়াইয়ে।
তাঁর বর্ণনায়, সমুদ্রে অসংখ্য মৃতদেহ ভাসছিল। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ একে অপরকে আঁকড়ে ধরছিলেন। তাঁর অভিযোগ, মরক্কোর পুলিশ তাঁদের জলের দিকে ঠেলে দিয়ে শুধু বলছিল, “সাঁতার কাটো।”
বহু পরিবার এখনও নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজছে। এক মা ১৩ ও ১৬ বছরের দুই সন্তানকে নিয়ে সমুদ্র পেরোনোর চেষ্টা করেছিলেন। প্রবল স্রোতে সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর কয়েক দিন ধরে সেউতার রাস্তায় ঘুরেও তাঁদের কোনও সন্ধান পাননি।
এবার প্রশ্ন শেঙ্গেন নিয়েও
সেউতার এই সংকটের অভিঘাত পৌঁছে গিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্দরেও। কয়েকটি সদস্য দেশ স্পেনকে শেঙ্গেনের মুক্ত চলাচল ব্যবস্থার বাইরে রাখার প্রস্তাব তুলেছে।
ইইউ-র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস অভিযোগ করেন, এই সংকটে কয়েকটি সদস্য দেশ প্রত্যাশিত সংহতি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
তাঁর আরও দাবি, পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে স্পেন ও শেঙ্গেন ব্যবস্থার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে। এমনকি কয়েকটি ইউরোপীয় সরকারও সেই ভুল তথ্যের পুনরাবৃত্তি করেছে বলে অভিযোগ তাঁর।
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডের লেয়েন অবশ্য স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজকে লেখা চিঠিতে দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য স্পেনের প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর বার্তা, সেউতার ঘটনা ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকাগুলির নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে।
মরক্কোকে ছাড়া উপায়ও নেই
ইইউ-র সদস্য দেশগুলির বৈঠকে অনেক প্রতিনিধিই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, এত বড় জনস্রোত নিছক আকস্মিক ঘটনা নয়। তবে একই সঙ্গে তাঁদের স্বীকারোক্তি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থে মরক্কোর সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়া ছাড়া স্পেনের সামনে বাস্তবসম্মত বিকল্পও খুব বেশি নেই।
অর্থাৎ একদিকে মরক্কোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, অন্যদিকে সেই মরক্কোর সঙ্গেই সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা—সেউতা সংকট ইউরোপের সামনে সেই দ্বন্দ্বই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
রুশ প্রচারের অভিযোগও
এর মধ্যেই ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা আরও একটি বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সেউতা সংকটকে কেন্দ্র করে ইউরোপজুড়ে রুশপন্থী সংবাদমাধ্যমে দেড় হাজারেরও বেশি বিভ্রান্তিকর প্রচার শনাক্ত হয়েছে।
সিবিহার দাবি, রাশিয়া এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপে অস্থিরতা ও বিভাজন বাড়াতে চাইছে।
ফলে সেউতার সীমান্তে শুরু হওয়া এই সংকট এখন আর শুধু অভিবাসন বা মরক্কো-স্পেন দ্বন্দ্বে আটকে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে শেঙ্গেনের ভবিষ্যৎ, ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তা, ভুয়ো তথ্যের যুদ্ধ এবং রাশিয়ার কথিত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও।
৫০ হাজার মানুষের সেই ঢল তাই সেউতার ছোট্ট সীমান্তকে ছাপিয়ে এখন ইউরোপের বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



