Home খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় যত তাড়াতাড়ি, পড়াশোনায় তত পিছিয়ে?

সোশ্যাল মিডিয়ায় যত তাড়াতাড়ি, পড়াশোনায় তত পিছিয়ে?

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
16 views 3 minutes read
A+A-
Reset

নতুন গবেষণায় সতর্কবার্তা—কম বয়সে অ্যাকাউন্ট খোলা শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বড় ফারাক

মাধ্যমিক স্কুলে ওঠার পরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলছে যে পড়ুয়ারা, তাদের পরীক্ষার ফল অপেক্ষাকৃত দেরিতে সামাজিক মাধ্যমে যোগ দেওয়া শিক্ষার্থীদের তুলনায় খারাপ হতে পারে। নতুন এক গবেষণায় এমনই ইঙ্গিত মিলেছে।

গবেষকদের ধারণা, এর অন্যতম কারণ হতে পারে ফোনের প্রতি অবিরাম আকর্ষণ—বারবার নতুন বার্তা, নোটিফিকেশন বা আপডেট দেখার তাগিদ। এতে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

ইতালির পাঁচ হাজারেরও বেশি স্কুলশিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, ১১–১২ বছর বয়সেই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার শুরু করা পড়ুয়ারা গণিত ও ভাষার পরীক্ষায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, অন্তত ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করা শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো ফল করেছে।

গবেষণার হিসাবে, ১৬ বছর বয়সে দুই দলের শিক্ষাগত ফলাফলের ব্যবধান প্রায় ছয় মাসের পড়াশোনার সমান

তবে কারণটা কি শুধুই সোশ্যাল মিডিয়া?

এখানেই গবেষকরা সতর্ক।

গবেষণার ফল থেকে সরাসরি বলা যাচ্ছে না যে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের কারণেই পরীক্ষার ফল খারাপ হয়েছে। কারণ বিশ্লেষণের সময় শিক্ষার্থীদের আগের শিক্ষাগত সাফল্য, পারিবারিক পরিবেশ, বাবা-মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অন্যান্য সামাজিক বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

গবেষণার প্রধান লেখক ইতালির মিলানো-বিকোক্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. মার্কো গুইয়ের মতে, বিষয়টি বাস্তব এবং একই সঙ্গে জটিল।

তাঁর যুক্তি, সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলির নকশাই এমনভাবে তৈরি, যাতে ব্যবহারকারীরা বারবার সেখানে ফিরে আসেন। কৈশোরের শুরুতে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে এই আকর্ষণ আরও সমস্যাজনক হয়ে উঠতে পারে।

কম বয়সেই শুরু, ফলাফলে ফারাক

বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার-এ প্রকাশিত গবেষণাটিতে ইতালীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

কম বয়সে সামাজিক মাধ্যমে যুক্ত হওয়া শিক্ষার্থীরা ১৩–১৪ বছর বয়সে গণিত ও ইতালীয় ভাষার মানসম্মত পরীক্ষায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল ফল করেছে।

১৫–১৬ বছর বয়সেও ইতালীয় ভাষায় এই ব্যবধান বজায় ছিল। গণিতে ব্যবধান আরও বেড়েছে।

গবেষকদের হিসাবে, দেরিতে সামাজিক মাধ্যমে যোগ দেওয়া শিক্ষার্থীদের যে শিক্ষাগত সুবিধা দেখা গেছে, তা প্রায় ছয় মাসের অতিরিক্ত শিক্ষালাভের সমান। এমনকি নিবিড় ব্যক্তিগত শিক্ষাদানের মাধ্যমে যে উন্নতি দেখা যায়, তার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি এই ব্যবধান।

ইংরেজিতে উল্টো ছবি

তবে সব বিষয়েই একই প্রভাব দেখা যায়নি।

ইংরেজি পরীক্ষায় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে একই ধরনের নেতিবাচক সম্পর্ক খুঁজে পাননি গবেষকরা।

এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তাঁরা। ইতালীয় শিক্ষার্থীদের কাছে ইংরেজি বিদেশি ভাষা। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর ইংরেজি লেখা, ভিডিও এবং কথোপকথনের সংস্পর্শে আসার ফলে তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে ভাষাটি চর্চার সুযোগ পেতে পারে।

অর্থাৎ, সোশ্যাল মিডিয়া সব ক্ষেত্রে একমুখী ক্ষতির কারণ নয়—কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যবহার শেখার সুযোগও তৈরি করতে পারে।

আসল সমস্যা ফোনে বারবার চোখ?

গবেষণার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, শিক্ষার্থীরা দিনে-রাতে কতবার ফোন হাতে নিচ্ছে, সেটিই ফলাফলের ব্যবধানের অন্যতম শক্তিশালী পূর্বাভাসদাতা।

অর্থাৎ শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় কত ঘণ্টা কাটানো হচ্ছে, তা নয়—বারবার ফোন পরীক্ষা করার অভ্যাসটিও বড় বিষয়।

নতুন বার্তা এসেছে কি না, কেউ পোস্ট করেছে কি না, কোনও প্রতিক্রিয়া মিলেছে কি না—এই কৌতূহল কিশোর-কিশোরীদের বারবার ফোনের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

ফলে পড়াশোনা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা অন্য কোনও কাজে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ড. গুইয়ের মতে, এই ধরনের অবিরাম সতর্কতা শেষ পর্যন্ত বাড়ির কাজ বা অন্যান্য শিক্ষামূলক কার্যক্রমে দীর্ঘ সময় মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

১৬ বছরের আগে নিষেধাজ্ঞা?

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের বয়সসীমা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিতর্ক তুঙ্গে।

যুক্তরাজ্য ১৬ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়াও ইতিমধ্যে একই ধরনের আইন কার্যকর করেছে।

ড. গুই ব্যক্তিগতভাবে বয়সসীমা নির্ধারণের পক্ষে। তবে তাঁর মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

এটি জরুরি পরিস্থিতিতে নেওয়া নীতিগত পদক্ষেপ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকেই কম আসক্তিকর এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ করে তোলা জরুরি।

নিষেধ নয়, অভ্যাস বদলও জরুরি

লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু ও কিশোর মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক ডেনিস ওগ্রিনও গবেষণাটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।

তাঁর মতে, ক্রমশ আরও প্রমাণ মিলছে যে শিশুরা কোন বয়সে প্রথম সামাজিক মাধ্যমে প্রবেশ করছে, তার প্রভাব তাদের শিক্ষাগত বিকাশে পড়তে পারে।

তবে সমাধান শুধু নিষেধাজ্ঞায় সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষক এবং নীতিনির্ধারকদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু ‘কত বছর বয়সে সোশ্যাল মিডিয়া শুরু করা উচিত?’—এমন নয়।

বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, সোশ্যাল মিডিয়া কি শিশুকে ব্যবহার করছে, নাকি শিশু সোশ্যাল মিডিয়াকে?

নতুন গবেষণা অন্তত সতর্ক করে দিচ্ছে—কৈশোরের শুরুতেই যদি নোটিফিকেশনের টান পড়াশোনার মনোযোগকে ছাপিয়ে যায়, তার মূল্য পরীক্ষার খাতায়ও দিতে হতে পারে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles