রক্ত খেলেই অমর! ‘ভ্যাম্পায়ার’ সাজার নেশায় গির্জায় পশুর মৃতদেহ, আদালতের নির্দেশে হাসপাতালে ৪৮ বছরের ব্যক্তি

যা জানা জরুরি
- রক্ত পান করলেই অমর হওয়া যায়, মৃত্যুকে হারিয়ে ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হওয়া সম্ভব—এমনই অদ্ভুত বিশ্বাসে আচ্ছন্ন ছিলেন ব্রিটেনের ৪৮ বছর বয়সি বেঞ্জামিন লুইস।
- সেই বিশ্বাস থেকেই গির্জার সামনে কখনও ভেড়া, কখনও হরিণের মৃতদেহ ফেলে আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
- শেষ পর্যন্ত আদালত তাঁকে অনির্দিষ্টকালের জন্য মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
রক্ত পান করলেই অমর হওয়া যায়, মৃত্যুকে হারিয়ে ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হওয়া সম্ভব—এমনই অদ্ভুত বিশ্বাসে আচ্ছন্ন ছিলেন ব্রিটেনের ৪৮ বছর বয়সি বেঞ্জামিন লুইস। সেই বিশ্বাস থেকেই গির্জার সামনে কখনও ভেড়া, কখনও হরিণের মৃতদেহ ফেলে আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত আদালত তাঁকে অনির্দিষ্টকালের জন্য মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারের নিউ ফরেস্ট অঞ্চলের বাসিন্দা লুইসকে আদালত জানিয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্য ট্রাইব্যুনাল বা বিচার সচিব তাঁকে সমাজের জন্য আর বিপজ্জনক মনে না করা পর্যন্ত তাঁর মুক্তির প্রশ্ন নেই।
‘কাউন্ট ড্রাকুলা’ হাজির!
আদালতে নিজের পরিচয় জানতে চাওয়া হলে লুইস নিজেকে ‘কাউন্ট ড্রাকুলা’ বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। পরে তিনি ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ভয়, আতঙ্ক ও হয়রানি সৃষ্টি এবং মেষশাবক চুরির অভিযোগ স্বীকার করেন।
তদন্তে জানা যায়, তিনি নিয়মিত গির্জার সামনে কিংবা কখনও গির্জার ভেতরে ভেড়া ও হরিণের মৃতদেহ রেখে যেতেন। কিছু মেষশাবক স্থানীয় খামার থেকে চুরি করা হয়েছিল। আবার কিছু হরিণ রাস্তার দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর তাদের দেহ তুলে নেওয়া হয়েছিল।
ঘটনাগুলি ঘিরে যাজক, উপাসক এবং স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হ্যাম্পশায়ার পুলিশের কনস্টেবল জেসিকা সারম্যানের কথায়, এটি তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম অস্বাভাবিক মামলা। প্রতিবার মনে হয়েছে রহস্যের সমাধান হয়েছে, কিন্তু তারপরই সামনে এসেছে আরও অদ্ভুত কোনও তথ্য।
রক্তেই নাকি অমরত্ব!
পুলিশের দাবি, লুইস বিশ্বাস করতেন মানুষের বা প্রাণীর রক্ত পান করলে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা যায়। এমনকি মৃত্যুকে এড়িয়ে ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হওয়া এবং নরকে যাওয়া থেকেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে তাঁর বিশ্বাস ছিল।
একাধিক গির্জায় পশুর মৃতদেহ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পরে তারা লক্ষ্য করে, নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা তথাকথিত শয়তানপূজার সঙ্গে যুক্ত বিশেষ তারিখের আশপাশেই ঘটনাগুলি ঘটছে। সেই সূত্র ধরে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলিতে বিভিন্ন গির্জায় নজরদারি শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত একটি মেষশাবকের দেহ থেকে পাওয়া ডিএনএ নমুনাই পুলিশকে লুইসের কাছে পৌঁছে দেয়।
গির্জায় ‘ভৌতিক বার্তা’
তদন্তে উঠে আসে আরও চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। কখনও মৃতদেহের পাশে উল্টো ক্রস আঁকা থাকত, কখনও রাখা হত ট্যারোট কার্ড। একটি মেষশাবককে গির্জার ছাদের ওপর ক্রুশের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
অন্য একটি মেষশাবকের মৃতদেহ পাওয়া যায় যিশুর মা মেরির মূর্তির পাশে। আবার এক ঘটনায় গির্জার বেদি থেকে ক্রুশ খুলে এনে তার ওপর মৃত মেষশাবক রাখা হয়।
একটি ঘটনায় কয়েকজন শিশু এই দৃশ্য দেখে গভীরভাবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়।
একজন যাজক আদালতে জানান, ঘটনাগুলি দেখে তাঁর মনে হয়েছিল যেন “অশুভ শক্তি নিজের উপস্থিতির স্বাক্ষর রেখে গেছে।” আরেকজনের মতে, এটি ছিল মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরির অত্যন্ত পরিকল্পিত কৌশল।
মৃত হরিণের মাথাও বাদ যায়নি
একবার একটি মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফটকের সামনে হরিণের কাটা মাথা এবং উল্টো ক্রস রেখে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে। ঘটনাটি প্রথম যিনি দেখেছিলেন, তিনি আদালতে জানান, এরপর দীর্ঘদিন তাঁর মনে হয়েছে অভিযুক্ত হয়তো তাঁকে অনুসরণ করছেন।
লুইসের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ ভ্যাম্পায়ারের ছবি, বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কিত নোট এবং রক্তপান নিয়ে লেখা উদ্ধার করে।
আতঙ্কে কৃষকরাও
এই ঘটনার ধাক্কা শুধু উপাসক বা গির্জার কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। স্থানীয় কৃষকদেরও আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি গভীর মানসিক চাপের মধ্যে পড়তে হয়।
কৃষক মাইরা নয়েস বলেন, এমন শান্ত এলাকায় কেউ এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে—এই ভাবনাটিই আতঙ্কের।
সারাহ হ্যারিসনের দুটি কালো মেষশাবক চুরি হয়েছিল। পরে একটি ব্রামশ গ্রামের সেন্ট পিটার্স গির্জার সামনে এবং অন্যটি রাস্তার দিকনির্দেশক চিহ্নের ওপর ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়।
আদালতে হ্যারিসন জানান, ঘটনার পর থেকে রাতে একা বাইরে বেরোতে তাঁর ভয় লাগে। সামান্য শব্দেও তাঁর মনে হয়, অভিযুক্ত হয়তো আবার ফিরে এসেছে।
সমস্যা বহু বছরের
লুইসের এই আচরণ অবশ্য হঠাৎ শুরু হয়নি। তাঁর আইনজীবী অ্যান্ড্রু প্রাইস আদালতে জানান, নিজের কাজের জন্য তাঁর মক্কেল অনুতপ্ত এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন।
কিন্তু তদন্তে জানা যায়, লুইসের অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে বহু বছর ধরেই উদ্বেগ ছিল। ২০০৩ সালেও নিজেকে ভ্যাম্পায়ার দাবি করে এক যাজক ও তাঁর পরিবারকে দীর্ঘদিন ভয় দেখানোর অপরাধে তিনি কারাদণ্ড ভোগ করেছিলেন।
সেবার তাঁর বিরুদ্ধে অশালীন ফোনকল, আতশবাজি ফাটানো এবং গির্জার নোটিস বোর্ডে অশ্লীল ছবি টাঙিয়ে পরিবারটিকে আতঙ্কিত করার অভিযোগ উঠেছিল।
‘শুধু প্রাণী নয়, মানুষও?’
আদালতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গৌরভ মালহান জানান, লুইস জটিল মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তাঁকে নিম্ন-নিরাপত্তার হাসপাতাল থেকে মাঝারি-নিরাপত্তার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
চিকিৎসকের মতে, মাত্র ১৩ বছর বয়সেই লুইস একটি মৃত ব্যাঙকে ক্রুশের ওপর রেখে গির্জায় ফেলে এসেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা, ভবিষ্যতে লুইস শুধু প্রাণী নয়, মানুষেরও ক্ষতি করতে পারেন।
হাসপাতালে থাকাকালীনও অন্য রোগীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এমনকি ডা. মালহানের ওপরও আক্রমণের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত তাঁকে জোর করে নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়।
সবকিছু বিবেচনা করেই আদালত তাঁকে অনির্দিষ্টকালের জন্য মানসিক চিকিৎসার আওতায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
ভ্যাম্পায়ার হওয়ার কল্পনা থেকে গির্জায় মৃতদেহ ফেলা—বেঞ্জামিন লুইসের এই ঘটনা যেন হরর সিনেমার চিত্রনাট্য। তবে আদালতের কাছে এটি কোনও কল্পকাহিনি নয়। বরং মানসিক অসুস্থতা, অপরাধ এবং জননিরাপত্তার এক জটিল বাস্তবতা—যার সমাধান আপাতত হাসপাতালের চার দেওয়ালের মধ্যেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



