Home খবর ‘গোর্খা হওয়াই ছিল স্বপ্ন’, তুষারধসে শেষ কিংবদন্তি ‘নিমস দাই’-এর যাত্রা

‘গোর্খা হওয়াই ছিল স্বপ্ন’, তুষারধসে শেষ কিংবদন্তি ‘নিমস দাই’-এর যাত্রা

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
34 views 3 minutes read
A+A-
Reset

জন্মসূত্রে নেপালি, নাগরিকত্বে ব্রিটিশ, পেশায় সেনাসদস্য এবং বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী—নির্মল পুরজার পরিচয়ের তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু সব পরিচয় ছাপিয়ে যে পরিচয়টি নিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি গর্ব করতেন, তা হল—তিনি একজন গোর্খা।

পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালায় ব্রড পিক অভিযানের সময় তুষারধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩ বছর বয়সি এই কিংবদন্তি পর্বতারোহী। তাঁর চলে যাওয়ায় শুধু পর্বতারোহণের জগতেই নয়, গোটা অ্যাডভেঞ্চার দুনিয়াতেই নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

নিজের আত্মজীবনীতে নির্মল লিখেছিলেন, “গোর্খা হওয়াই ছিল আমার একমাত্র স্বপ্ন। জীবনে আমি শুধু এটুকুই হতে চেয়েছিলাম।”

‘গোর্খা’ বলতে মূলত নেপাল এবং ভারতের কিছু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে বোঝায়। সাহস, শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই জনগোষ্ঠীর সামরিক ঐতিহ্যের সঙ্গে নির্মল পুরজার জীবনও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।

‘অসম্ভব’ শব্দটাই যেন ছিল তাঁর অভিধানে নেই

আন্তর্জাতিক পর্বতারোহণ মহলে নির্মল পুরজা পরিচিত ছিলেন ‘নিমস দাই’ নামে। ‘দাই’ শব্দের অর্থ বড় ভাই। গোর্খা রেজিমেন্টে দীর্ঘ সামরিক জীবন কাটানোর পর বিশ্বের অন্যতম সেরা উচ্চতর পর্বতারোহী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।

২০১৯ সালে মাত্র ১৮৯ দিনের মধ্যে বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করে ইতিহাস গড়েন নির্মল। তাঁর সেই অবিশ্বাস্য অভিযানকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় নেটফ্লিক্সের বহুল আলোচিত তথ্যচিত্র ‘14 Peaks: Nothing Is Impossible’

পরবর্তীতে তাঁর রেকর্ড ভেঙে গেলেও নির্মল পুরজার খ্যাতি কোনও সংখ্যার মধ্যে আটকে থাকেনি। অসম্ভবকে সম্ভব করার অদম্য মানসিকতা, কঠোর শৃঙ্খলা এবং নিজের লক্ষ্যের প্রতি অবিচল আস্থা তাঁকে পরিণত করেছিল এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে।

সেনা পরিবারের সন্তান, লক্ষ্য বিশ্বজয়

১৯৮৩ সালের ২৫ জুলাই নেপালের মিয়াগদি জেলার দানা গ্রামে জন্ম নির্মল পুরজার। যদিও তাঁর বেড়ে ওঠার বড় অংশ কেটেছে চিতওয়ানের সমতল এলাকায়। পরিবারের প্রায় সকলেই ছিলেন সামরিক পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বাবা এবং তিন বড় ভাই গোর্খা রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন।

তাই নির্মলের পথও যেন ছোট থেকেই নির্ধারিত ছিল। মাত্র ১৮ বছর বয়সে, ২০০৩ সালে তিনি ব্রিটিশ গোর্খা রেজিমেন্টে যোগ দেন। পরে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির অভিজাত স্পেশাল বোট সার্ভিস (এসবিএস)-এ নির্বাচিত প্রথম নেপালি হন তিনি।

সামরিক জীবনে মোট ১৬ বছর কাটান নির্মল। ২০১৮ সালে সামরিক ও পর্বতারোহণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (এমবিই) সম্মানে ভূষিত করা হয়।

এভারেস্ট দিয়ে শুরু, ১৪টি আট-হাজারি জয়

পর্বতারোহণে নির্মলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ২০১২ সালে। সে সময় এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে ট্রেক করার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই সাধারণ ট্রেকিংই ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে যায় বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গজয়ের পথে।

২০১৬ সালে প্রথমবার এভারেস্ট জয় করেন নির্মল। এরপর ২০১৭, ২০১৯, ২০২১, ২০২২ এবং ২০২৬ সালেও এভারেস্টে আরোহণ করেন তিনি।

২০১৯ সালে শুরু করেন তাঁর ঐতিহাসিক ‘প্রজেক্ট পসিবল’। সেই সময় নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে নির্মল জানিয়েছিলেন, “এই স্বপ্নের জন্য আমি যুক্তরাজ্যে আমার চাকরি ছেড়েছি, পেনশন ছেড়েছি, এমনকি নিজের বাড়িও বিক্রি করেছি। কেউ বিশ্বাস করেনি যে এটি সম্ভব। সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিল।”

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখান তিনি।

নেপাল, পাকিস্তান ও তিব্বতের ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করেন নির্মল। তাঁর জয় করা শৃঙ্গগুলির তালিকায় ছিল অন্নপূর্ণা, ধৌলাগিরি, কাঞ্চনজঙ্ঘা, এভারেস্ট, লোৎসে, মাকালু, নাঙ্গা পর্বত, গাশেরব্রুম-১, গাশেরব্রুম-২, ব্রড পিক, কে-টু, মানাসলু, চো-ওইউ এবং শিশাপাংমা।

এক অভিযানে বিশ্বের সবকটি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করে তাঁর কীর্তি পর্বতারোহণের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছিল।

নতুন প্রজন্মের অভিযাত্রীদেরও পথ দেখিয়েছেন

নিজের সাফল্যেই থেমে থাকেননি নির্মল। সহ-পর্বতারোহী মিংমা ডেভিড শেরপা এবং তেজন (টিজে) গুরুংকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন এলিট এক্সপেড নামে একটি অভিযান সংস্থা।

এই সংস্থার লক্ষ্য ছিল মানুষকে সাহসিকতা ও অভিযানের মধ্য দিয়ে নিজেদের সীমা অতিক্রম করতে উৎসাহিত করা। অর্থাৎ পাহাড় জয় তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত কৃতিত্ব ছিল না, বরং অন্যদের স্বপ্ন দেখানো এবং সেই স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগানোও ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

রেখে গেলেন পরিবার, রেখে গেলেন এক অসম্ভব উত্তরাধিকার

নির্মল পুরজার মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী সুচি পুরজা এবং ২০২২ সালে জন্ম নেওয়া কন্যা হিমানি রয়েছেন।

মাত্র ৪৩ বছরের জীবনে নির্মল ‘নিমস দাই’ পুরজা দেখিয়ে গিয়েছেন, উচ্চতার সীমা পাহাড় ঠিক করে দেয়, মানুষের স্বপ্ন নয়। দৃঢ় সংকল্প, শৃঙ্খলা এবং সাহস থাকলে অসম্ভব বলে সত্যিই কিছু থাকে না—তাঁর জীবন যেন সেই কথারই বাস্তব প্রমাণ।

তুষারধস থামিয়ে দিয়েছে তাঁর অভিযান। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গল্প থামার নয়। পর্বতারোহীদের কাছে, গোর্খা সম্প্রদায়ের কাছে এবং বিশ্বের অগণিত মানুষের কাছে নির্মল ‘নিমস দাই’ পুরজা থেকে যাবেন সাহস, স্বপ্ন আর অসম্ভবকে জয় করার এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে।

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles