Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্ব ফুটবলে গত এক সপ্তাহ ছিল চরম অস্থিরতার। ফিফা বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার পরিচালনার জন্য একটি নতুন সংস্থা গঠন করে তার একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার সংস্থা কনকাকাফ-সহ একাধিক পক্ষের তীব্র বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি বাতিল করতে বাধ্য হন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
কী ঘটেছিল?
মঙ্গলবার প্রথম খবর প্রকাশ্যে আসে যে ফিফা ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি নতুন সংস্থা গড়ে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার পরিচালনা করবে এবং সেই সংস্থার সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব বিক্রি করবে বিনিয়োগকারীদের কাছে।
এই খবর এতটাই গোপনে রাখা হয়েছিল যে ফিফার সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা ফিফা কাউন্সিলের অনেক সদস্যও আগে কিছু জানতেন না। সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ফিফাকে নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হয়।
আপত্তি কোথায় ছিল?
সবচেয়ে বড় আপত্তি ছিল নীতিগত। অনেকের মতে, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার কার্যত বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া মানে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতাকে ব্যবসায়িক সম্পদে পরিণত করা।
এছাড়া অভিযোগ ওঠে, এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনও রকম আলোচনা বা পরামর্শ করা হয়নি। দ্রুততার সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ফুটবল প্রশাসকদের বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করে।
জেপি মর্গ্যানের প্রস্তুত করা নথি থেকে জানা যায়, নতুন সংস্থার লক্ষ্য ছিল আরও বেশি লাভজনক প্রতিযোগিতা, নতুন বিনিয়োগ এবং উচ্চ মুনাফার বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব তৈরি করা। সমালোচকদের মতে, এতে ফুটবলের স্বার্থের পরিবর্তে বিনিয়োগকারীদের মুনাফাই অগ্রাধিকার পেত।
ফিফার অবস্থান কী ছিল?
প্রথমে ফিফা পরিকল্পনার পক্ষেই অবস্থান নেয়। সংস্থার দাবি ছিল, এই উদ্যোগের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১০০০ কোটি মার্কিন ডলার আয় হবে, যা ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের উন্নয়নে ব্যয় করা যাবে।
জোশুয়া কুশনারের নেতৃত্বাধীন একটি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব কিনতে আগ্রহী ছিল। ফিফার দাবি, তাদের কোনও পরিচালনাগত ক্ষমতা থাকত না।
ইনফান্তিনোও সামাজিক মাধ্যমে বলেন, এটি শুধুমাত্র একটি প্রস্তাব এবং আলোচনা প্রক্রিয়ার অংশ। তাঁর দাবি ছিল, এই প্রকল্প পুরুষ, মহিলা এবং যুব ফুটবলের উন্নয়নে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।
কারা বিরোধিতা করেছিল?
প্রথমে উয়েফা সরব হয়। ইউরোপের ৫৫টি সদস্য দেশের জরুরি বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত হয়, পরিকল্পনা কার্যকর হলে তারা ফিফার প্রতিযোগিতা বয়কট করবে।
উয়েফার বিবৃতিতে বলা হয়, একবার যদি বাইরের বিনিয়োগকারীরা ফিফার প্রতিযোগিতায় মালিকানার অংশ পেয়ে যায়, তাহলে ফুটবলের চরিত্র চিরতরে বদলে যাবে। তখন খেলার স্বার্থ নয়, শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফাই প্রতিটি সিদ্ধান্তের চালিকাশক্তি হবে।
পরে এএফসি এবং কনকাকাফও পরিকল্পনার সমালোচনা করে। যদিও তারা বয়কটের ঘোষণা দেয়নি, তবে ফিফার প্রশাসনিক কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতির জরুরি পুনর্বিবেচনার দাবি জানায়।
শেষ পর্যন্ত কী হল?
প্রথমে ফিফা পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু বিরোধিতা ক্রমশ বাড়তে থাকায় শনিবার ভোরে ইনফান্তিনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, প্রস্তাবটি আর এগোনো হবে না।
তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা এমন বিভাজন তৈরি করেছে, যা ফুটবলের বৃহত্তর স্বার্থের পরিপন্থী।
ইনফান্তিনো জানান, তাঁর উদ্দেশ্য সবসময়ই বিশ্ব ফুটবলকে একত্রিত করা এবং উন্নত করা। তাই আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে আবার আলোচনা শুরু করা হবে, যাতে বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা দেশগুলিতে ফুটবলের বিকাশ ঘটানো যায়।
ইনফান্তিনোর ওপর কি চাপ বাড়ছে?
পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ইনফান্তিনোর অন্যতম ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা এবং প্রাক্তন গোল্ডম্যান স্যাকস কর্তা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় এই চুক্তির বিরোধিতা করেন।
এদিকে আরও একটি নথি ফাঁস হয়েছে, যেখানে ২০৩০ সালের পুরুষদের বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৬৪-এ বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে ফিফা গবেষণা শুরু করেছে বলে জানা যায়। এটিও একই বাণিজ্যিক কৌশলের অংশ বলে মনে করছেন সমালোচকেরা।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইনফান্তিনোকে ফিফার নেতৃত্বের জন্য “ভুল ব্যক্তি” বলে মন্তব্য করেছেন। ফলে ২০১৫ সালে সেপ ব্লাটারের পতনের পর এই প্রথম ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে এত প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়েছে।