Table of Contents
ইউক্রেনে লেনিনের মূর্তির জায়গায় ইভান মাজেপার মূর্তি বসানোর প্রস্তাবকে নিছক একটি ভাস্কর্য বদলের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পিছনে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, জাতীয় পরিচয়, সোভিয়েত উত্তরাধিকার, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক এবং চলমান যুদ্ধের রাজনীতি।
কিয়েভের একটি খালি বেদিতে কার মূর্তি বসবে—এই প্রশ্নের মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে আরও বড় প্রশ্ন: ইউক্রেন নিজের ইতিহাসকে কীভাবে দেখতে চায়?
ইউক্রেনে এত লেনিনের মূর্তি কেন?
সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় ইউক্রেন ছিল ইউএসএসআরের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রজাতন্ত্র। মস্কোর নিয়ন্ত্রণ শুধু প্রশাসন বা অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ইতিহাস ও জনস্মৃতিকেও সোভিয়েত কাঠামোর মধ্যে গড়ে তোলার চেষ্টা চলেছিল।
তাই বড় শহর, জেলা সদর, বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা—গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলির সামনে দেখা যেত লেনিনের মূর্তি। উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত আদর্শের প্রতি আনুগত্য তৈরি করা এবং ইউক্রেনের নিজস্ব জাতীয় ইতিহাস ও নায়কদের আড়ালে রাখা।
স্বাধীনতার সময় ইউক্রেনে লেনিনের মূর্তির সংখ্যা ৫,৫০০-রও বেশি ছিল বলে গবেষকদের ধারণা।
‘লেনিনোপাদ’-এ শুরু পতন
২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর। কিয়েভের ময়দান আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বিক্ষোভকারীরা লেনিনের একটি বিশাল মূর্তি ফেলে দেন।
ঘটনাটি দ্রুত পরিচিত হয়ে ওঠে ‘লেনিনোপাদ’ নামে—অর্থাৎ ‘লেনিনের পতন’।
এরপর একের পর এক শহরে লেনিনের মূর্তি সরানো বা ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটতে থাকে। এটি শুধু মূর্তি অপসারণ ছিল না; ছিল একটি রাজনৈতিক বার্তা—
“আমরা আর মস্কোর অধীন নই।”
২০১৫: আইনের জোরে ডিকমিউনাইজেশন
ময়দান আন্দোলনের পর ইউক্রেন সরকার ২০১৫ সালে ডিকমিউনাইজেশন সংক্রান্ত একাধিক আইন পাশ করে। কমিউনিস্ট প্রতীক নিষিদ্ধ করা হয়, লেনিন-সহ সোভিয়েত নেতাদের মূর্তি সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। হাজার হাজার রাস্তা ও শহরের নাম বদলে ফেলা হয়।
সোভিয়েত নিরাপত্তা সংস্থার নথিও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই ইউক্রেনের অধিকাংশ লেনিন মূর্তি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
২০২২-এর পর প্রশ্নটা আরও বড়
কিন্তু ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর প্রশ্নটি আর শুধু সোভিয়েত প্রতীক সরানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
নতুন প্রশ্ন উঠল—সোভিয়েত প্রতীক সরালেই কি কাজ শেষ, নাকি রুশ সাম্রাজ্যের স্মৃতিচিহ্নও মুছে ফেলতে হবে?
শুরু হল ডিরুসিফিকেশন।
এর আওতায় বিভিন্ন জায়গায় রুশ কবি আলেকজান্ডার পুশকিনের মূর্তি সরানো হয়েছে, মিখাইল বুলগাকভের স্মৃতিফলক নিয়ে সিদ্ধান্ত বদলেছে, রুশ ভাষায় থাকা রাস্তার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। রুশ সাম্রাজ্যবাদ বা আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত বিভিন্ন স্থাপনাও বদলে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আর সেখানেই সামনে আসছে ইভান মাজেপার নাম।
কে ছিলেন ইভান মাজেপা?
ইভান মাজেপা (১৬৩৯–১৭০৯) ছিলেন কসাকদের হেটম্যান বা নেতা। একসময় তিনি রাশিয়ার জার পিটার দ্য গ্রেটের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন।
কিন্তু ১৭০৮ সালে তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সুইডেনের রাজা চার্লস দ্বাদশের সঙ্গে জোট বাঁধেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের জন্য আরও বেশি স্বাধীনতা অর্জন।
এই একটি সিদ্ধান্তই তাঁকে দুই দেশের ইতিহাসে দুই সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রে পরিণত করেছে।
রাশিয়ার কাছে মাজেপা বিশ্বাসঘাতক। ইউক্রেনের কাছে তিনি ক্রমশ হয়ে উঠেছেন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
রাশিয়ার চোখে মাজেপা কেন ‘বিশ্বাসঘাতক’?
রুশ ইতিহাসে মাজেপার পরিচয় মূলত সেই নেতা হিসেবে, যিনি যুদ্ধের সময় জারকে ছেড়ে তাঁর শত্রুপক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।
রুশ অর্থোডক্স চার্চ তাঁকে ধর্মচ্যুত ঘোষণা করেছিল। সোভিয়েত যুগের পাঠ্যপুস্তকেও তাঁকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবেই তুলে ধরা হতো।
আজও রুশ সরকারি বয়ানে মাজেপার নাম সাধারণত নেতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
ইউক্রেনের কাছে তিনি নায়ক কেন?
ইউক্রেনীয় ঐতিহাসিকদের একটি বড় অংশ মাজেপাকে এমন এক নেতা হিসেবে দেখেন, যিনি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরেছিলেন এবং ইউক্রেনের নিজস্ব রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন।
তাঁর সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গির্জা নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়, ইউক্রেনীয় সংস্কৃতি বিকশিত হয় এবং ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগও বাড়ে।
তাই আজকের ইউক্রেনে মাজেপাকে অনেকে ইউরোপমুখী ও স্বাধীন ইউক্রেনের প্রতীক হিসেবে দেখেন।
জেলেনস্কির প্রস্তাবের রাজনৈতিক বার্তা কী?
এখানেই বর্তমান প্রস্তাবের গুরুত্ব।
লেনিনের জায়গায় মাজেপাকে বসানোর অর্থ প্রতীকীভাবে দাঁড়ায়—
- ইউক্রেনের ইতিহাসের ব্যাখ্যা মস্কো ঠিক করবে না।
- জাতীয় নায়ক বেছে নেওয়ার অধিকার ইউক্রেনেরই।
- স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কোনও নতুন ধারণা নয়; তার শিকড় বহু শতাব্দী পুরনো।
- রাশিয়ার বিরুদ্ধে বর্তমান যুদ্ধও সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরিচয়-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত।
যুদ্ধের সময়ে এই প্রতীকী বার্তা জাতীয় ঐক্য জোরদার করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
সবাই অবশ্য মাজেপার পক্ষে নন
তবে প্রস্তাবটি নিয়ে ইউক্রেনের ভিতরেও বিতর্ক রয়েছে।
সমালোচকদের বক্তব্য, মাজেপা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক চরিত্র হলেও তাঁর উত্তরাধিকার একেবারে সাদা-কালো নয়। তাঁকে নিয়ে ইতিহাস জটিল এবং সব ইউক্রেনীয় তাঁকে একইভাবে জাতীয় নায়ক হিসেবে দেখেন না।
কারও কারও মতে, খালি বেদিটি কোনও নতুন মূর্তির জন্য ব্যবহার না করে যুদ্ধের স্মৃতি হিসেবেই রেখে দেওয়া উচিত।
স্মৃতিস্তম্ভের লড়াই শুধু ইউক্রেনের নয়
যুদ্ধ, বিপ্লব বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়।
ভারতে ঔপনিবেশিক যুগের রাস্তার নাম বদলানো, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের প্রতীক সরানো, যুক্তরাষ্ট্রে কনফেডারেট জেনারেলদের মূর্তি অপসারণ কিংবা পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সোভিয়েত স্মৃতিস্তম্ভ সরিয়ে ফেলার ঘটনাগুলি একই বৃহত্তর প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে।
একটি মূর্তি শুধু পাথর, ব্রোঞ্জ বা ধাতু নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ক্ষমতা, স্মৃতি এবং ইতিহাসের ব্যাখ্যা।
আসল লড়াইটা ইতিহাস নিয়ে
তাই লেনিন বনাম মাজেপা বিতর্কের আসল প্রশ্ন কোনও মূর্তিকে ঘিরে নয়।
প্রশ্ন হল—একটি জাতি তার অতীতকে কীভাবে মনে রাখবে?
রাশিয়ার দৃষ্টিতে লেনিন সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, আর মাজেপা বিশ্বাসঘাতক। ইউক্রেনের বড় অংশের কাছে ছবিটা ঠিক উল্টো—লেনিন সোভিয়েত আধিপত্যের প্রতীক, আর মাজেপা স্বাধীন রাষ্ট্রচিন্তার ঐতিহাসিক পূর্বসূরি।
সুতরাং কিয়েভের একটি খালি বেদিতে শেষ পর্যন্ত কার মূর্তি বসবে, তা নিছক শিল্প বা স্থাপত্যের সিদ্ধান্ত নয়। সেটি ইউক্রেনের পক্ষ থেকে নিজের অতীতের একটি ব্যাখ্যা এবং ভবিষ্যৎ পরিচয়ের একটি প্রতীকী ঘোষণা।
লেনিনকে সরিয়ে মাজেপাকে বসানো মানে শুধু একজনকে সরিয়ে আরেকজনকে জায়গা দেওয়া নয়—এটি ইতিহাসের মালিকানা বদলের দাবিও।