বাংলাস্ফিয়ার: নরেন্দ্রপুরের একটি আবাসিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র দীপ্তাংশু মাহাতোর মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগ, অত্যন্ত গরম চা পান করার পরও দীর্ঘ সময় ধরে তাকে উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। পরিবারের দাবি, কঠোর শৃঙ্খলার পরিবেশে ভয়ে সে মুখের গরম চা ফেলে দিতে পারেনি। এই ঘটনার জেরে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তিন কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে এবং সমস্ত আবাসিক হোস্টেল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশও ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।

বিদ্যালয়ের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির সমস্ত আবাসিক ছাত্রকে শনিবার দুপুর দেড়টা থেকে অভিভাবকদের সঙ্গে বাড়ি ফিরে যেতে হবে। আগামী ৫ জুলাই থেকে সমস্ত ছাত্রাবাস পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।

এদিকে ছাত্রের পরিবারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নরেন্দ্রপুর থানায় মামলা রুজু করেছে বারুইপুর জেলা পুলিশ। তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট সকলের বক্তব্য সংগ্রহ শুরু করেছেন। এক পুলিশ আধিকারিক জানান, ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চিকিৎসায় বিলম্ব। পরিবারের দাবি, ছাত্রটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে দ্রুত কোনও বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হয়নি। বরং বিদ্যালয়ের চিকিৎসক পরে এন্ডোস্কোপির পরামর্শ দেন। আরও অভিযোগ, পরিবারের সদস্যরা পৌঁছনো পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়, যা মূল্যবান সময় নষ্ট করেছে।

দীপ্তাংশুর বাবা মনোরঞ্জন মাহাতো, যিনি কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী, জানান মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ তিনি আদালতে থাকাকালীন বিদ্যালয় থেকে ফোন পান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, তাঁর ছেলে কথা বলতে পারছে না এবং একটানা কাশি হচ্ছে। তিনি নিজেই ছেলেকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ভর্তি নিতে অস্বীকার করা হলে দ্রুত সল্টলেকের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ছাত্রের দিদি মঞ্জিমা মাহাতোর অভিযোগ, গরম চা আসলে রসায়নের শিক্ষকের জন্য আনা হয়েছিল। দীপ্তাংশু সেটি পান করার পর মুখ থেকে বের করে দিতে পারেনি, কারণ সে আশঙ্কা করেছিল তাতে শিক্ষক বকাবকি করবেন। এরপরও সে প্রায় দু’ঘণ্টা ক্লাস করেছে। অসুস্থতা বাড়লেও বিদ্যালয়ের তরফে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে পরিবারের অভিযোগ।

মঞ্জিমা আরও দাবি করেন, সহপাঠীরা প্রথমে তাকে স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে তিনি দ্রুত এন্ডোস্কোপির প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। কিন্তু সেই তথ্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানাতে গেলে তাঁদের বলা হয়, বিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠান চলছে, তাই তখন কিছু করা সম্ভব নয়। পরে বাবা এসে ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ির মধ্যেই সে অজ্ঞান হয়ে যায়।

ঘটনার পর বিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ছাত্রের শারীরিক অবস্থার অবনতি সত্ত্বেও কেন দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি, কেন অভিভাবকের অপেক্ষা করা হল এবং বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিধি ছাত্রদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াকেও প্রভাবিত করেছিল কি না—এই সমস্ত বিষয় এখন তদন্তের আওতায়।

শিক্ষা মহলও মনে করছে, আবাসিক বিদ্যালয়ে জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক এবং শৃঙ্খলার প্রয়োগ—এই তিনটি বিষয় নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান শুরু করেছে। তদন্তের রিপোর্টের উপর নির্ভর করেই পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে।