হাইলাইটস:
- আমেরিকার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানী ওয়াশিংটনের বহু ঐতিহাসিক স্থান ঘিরে কাঁটাতার, নিরাপত্তা বলয় ও নির্মাণকাজ চলছে।
- প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে সংস্কার হওয়া লিঙ্কন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুলে নানা ত্রুটি দেখা দেওয়ায় শুরু হয়েছে বিতর্ক।
- ট্রাম্প দাবি করেছেন, পুলের ক্ষতি হয়েছে ভাঙচুরের কারণে; তবে সরকারি নথিতে উঠে এসেছে নির্মাণগত ত্রুটির একাধিক ইঙ্গিত।
- বিরোধীদের দোষারোপ, কঠোর শাস্তির হুমকি এবং ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা।
- সমালোচকদের অভিযোগ, স্বাধীনতার প্রতীকগুলিকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে সরিয়ে দিয়ে রাজধানীকে কার্যত এক ‘সামরিক সুরক্ষিত অঞ্চল’-এ পরিণত করা হয়েছে।
বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু রাজধানী ওয়াশিংটনে এখন যে দৃশ্য চোখে পড়ছে, তা উৎসবের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপত্তা, কাঁটাতার এবং নিয়ন্ত্রণের ছবি। লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সামনে বিস্তীর্ণ রিফ্লেক্টিং পুল ঘিরে উঁচু বেড়া। হোয়াইট হাউসের উত্তরের ঐতিহাসিক লাফায়েত পার্কও সাধারণ মানুষের জন্য কার্যত বন্ধ। ন্যাশনাল মলের ‘গ্রেট আমেরিকান স্টেট ফেয়ার’-এর চারপাশেও এত ঘন নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়েছে যে, বেশ কয়েকটি স্মিথসোনিয়ান জাদুঘর কিংবা কাছের মেট্রো স্টেশনে পৌঁছনোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই গোটা আয়োজনের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাজধানীকে “আরও সুন্দর” করে তোলার যে কর্মসূচি তিনি হাতে নিয়েছেন, তার ফলেই ওয়াশিংটনের বহু অংশ আজ নির্মাণক্ষেত্র কিংবা সশস্ত্র নিরাপত্তা শিবিরের চেহারা নিয়েছে। সমালোচকদের মতে, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে পরিচিত যে স্থানগুলি বিশ্বের মানুষের কাছে উন্মুক্ত থাকার কথা, সেগুলিকেই আজ বেড়া ও নিরাপত্তা বলয়ের আড়ালে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিন সশস্ত্র সেনার একটি ছবি প্রকাশ করে লিখেছিলেন, “রিফ্লেক্টিং পুল থেকে শুভ সকাল।” সেই ছবি যেমন তাঁর সমর্থকদের কাছে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতীক, তেমনই বিরোধীদের কাছে তা স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভকে সামরিক উপস্থিতির প্রতীক বানিয়ে দেওয়ার নজির।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে রিফ্লেক্টিং পুলের সংস্কার ঘিরে। নতুন করে জলরোধী আস্তরণ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আস্তরণ বিভিন্ন জায়গায় উঠে যেতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও পানির রং নীলের বদলে সবুজ হয়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমে সেই ছবি ছড়িয়ে পড়তেই ট্রাম্প দাবি করেন, এটি কোনও নির্মাণ ত্রুটির ফল নয়; বরং ভাঙচুরকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে পুলের তলা ও পাশ কেটে দিয়েছে। তাঁর আরও দাবি, পানির সবুজ রঙের জন্য দায়ী “অপরাধমূলকভাবে তৈরি শ্যাওলা”।
কিন্তু সরকারি সংস্থার অভ্যন্তরীণ নথি অন্য ছবি তুলে ধরছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কাজ শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পার্ক সার্ভিসের প্রকৌশলীরা নতুন জলরোধী স্তরে একাধিক ছিদ্র, ফাটল এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা নথিবদ্ধ করেছিলেন। অর্থাৎ ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠার আগেই নির্মাণগত ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতেও ট্রাম্প নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরেননি। বরং তিনি ঘোষণা করেছেন, জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভে ভাঙচুর করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রিফ্লেক্টিং পুলে ভাঙচুরের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং একাধিক অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের ফেডারেল প্রসিকিউটরের দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই দাবির সমর্থনে এখনও পর্যন্ত তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় নথি পৌঁছয়নি।
ট্রাম্প-জীবনীকার টিমোথি এল. ও’ব্রায়েনের মতে, এই ঘটনা প্রেসিডেন্টের বহু পুরনো রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত আচরণেরই পুনরাবৃত্তি। তাঁর কথায়, ট্রাম্প প্রায়ই নিজের সক্ষমতাকে অতিরঞ্জিতভাবে মূল্যায়ন করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, যে কোনও জটিল সমস্যার সহজ সমাধান তাঁর হাতেই রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই সমাধান ব্যর্থ হলে তিনি দোষ চাপান অন্যের উপর এবং নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন।
রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কারের ক্ষেত্রেও স্বাভাবিক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার ছাড়াই দুটি সংস্থাকে সরাসরি কাজ দেওয়া হয়। প্রথমে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল মাত্র ১৮ লক্ষ ডলার। পরে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৪৭ লক্ষ ডলারে। শুধু তাই নয়, পানিশোধন ব্যবস্থা বসানোর কাজও দেওয়া হয় ট্রাম্পের এক রাজনৈতিক অনুদানদাতার সঙ্গে যুক্ত একটি সংস্থাকে। ফলে স্বজনপোষণ এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগও সামনে এসেছে।
এই সমালোচনার মুখে ট্রাম্প আবারও দায় চাপিয়েছেন তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর। এমনকি তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকেও দোষারোপ করেছেন, দাবি করেছেন যে ওবামা আমলেই পুলের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। ফলে আজকের সমস্যার বীজ তখনই বপন হয়েছিল।
এদিকে এক অদ্ভুত ঘটনাও আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রাক্তন অলিম্পিক সাইক্লিস্ট ডেভিড হার্ন পুলের কাছে গিয়ে উঠে আসা প্লাস্টিকের আস্তরণ স্পর্শ করেছিলেন। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়। হার্নের আইনজীবী নরম্যান আইজেনের দাবি, কোনও সাধারণ নাগরিক শুধু হাত দিয়ে পুলের আস্তরণ ছুঁয়েছেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা নজিরবিহীন এবং এটি কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনিক মানসিকতার পরিচয়।
হোয়াইট হাউস অবশ্য এই সমালোচনা উড়িয়ে দিয়েছে। প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র টেলর রজার্স বলেন, হার্ন একজন “ট্রাম্প-বিরোধী মানসিকতায় আক্রান্ত ব্যক্তি”। তাঁর দাবি, ট্রাম্পের উদ্যোগেই রিফ্লেক্টিং পুল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার এবং আমেরিকার ২৫০ বছর পূর্তির জন্য প্রস্তুত।
তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে সাংবাদিকেরা ভিন্ন চিত্র দেখেছেন। পানির নিচে উঠে আসা আস্তরণের টুকরো স্পষ্ট দেখা গেছে। কোথাও শ্যাওলার স্তর জমেছে, কোথাও নতুন আবরণ উঠে যাচ্ছে। হাঁস ও তাদের ছানারা অবশ্য নির্বিঘ্নে সেই পানিতেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুলের সমস্যার ইতিহাস নতুন নয়। ১৯২৩ সালে জলাভূমির উপর এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। নরম মাটি, ক্রমাগত জলচাপ, গ্রীষ্মের উচ্চ তাপমাত্রা এবং বিপুল পরিমাণ পাখির বিষ্ঠা—সব মিলিয়ে এখানে শ্যাওলা জন্মানো ও কাঠামোগত সমস্যা তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।
শুধু রিফ্লেক্টিং পুল নয়, হোয়াইট হাউসের সামনের লাফায়েত পার্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ১ কোটি ৭৪ লক্ষ ডলারের সরাসরি চুক্তিতে পার্ক সংস্কারের কাজ করানো হয়েছে। যুক্তি ছিল, ২৫০ বছর পূর্তির আগেই কাজ শেষ করতে হবে। এখন ফোয়ারা সচল, বেশির ভাগ কাজও শেষ। তবুও পার্কের চারদিকে এখনও দ্বিস্তর নিরাপত্তা বেড়া রয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে খুবই সীমিত জায়গায় চলাফেরা করতে দেওয়া হচ্ছে। কবে এই পার্ক পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে প্রশাসন কোনও স্পষ্ট উত্তর দেয়নি।
এই দৃশ্য অনেকের কাছেই এক গভীর প্রতীকের জন্ম দিয়েছে। যে দেশে স্বাধীনতা, উন্মুক্ততা এবং নাগরিক অধিকারকে জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু বলে তুলে ধরা হয়, সেই দেশের রাজধানীতেই স্বাধীনতার প্রতীকগুলি আজ কাঁটাতারের আড়ালে। লিঙ্কনের মূর্তি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তার সামনে পৌঁছনো কঠিন। লাফায়েত পার্ক রয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত। জাতীয় উৎসবের মঞ্চ তৈরি হচ্ছে, অথচ সেই মঞ্চে পৌঁছতে বহু পথই বন্ধ।
সমর্থকদের মতে, এত বড় আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান ও জাতীয় উদ্যাপনের আগে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা কি এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, যেখানে স্বাধীনতার প্রতীকগুলিকেই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হয়?
আমেরিকার ২৫০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে এই বিতর্ক তাই শুধু একটি রিফ্লেক্টিং পুল, একটি পার্ক বা কয়েকটি নির্মাণ প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে। গণতন্ত্র কি আরও উন্মুক্ত হচ্ছে, নাকি ক্রমশ আরও সুরক্ষিত, নিয়ন্ত্রিত এবং দূরবর্তী হয়ে উঠছে? স্বাধীনতার জন্মদিন উদ্যাপনের প্রস্তুতিতে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্নই আজ ওয়াশিংটনের কাঁটাতারের বেড়াগুলির আড়াল থেকে বারবার ফিরে আসছে।