‘এমন বন্যা দেখিনি’: জলে ভাসছে আপার অসম, বিশেষ প্যাকেজ চাইলেন হিমন্ত

যা জানা জরুরি
- গুয়াহাটি: “আমাদের দাদু-ঠাকুর্দারাও এমন বন্যা দেখেননি।” আপার অসমের ভয়াবহ বন্যার ছবি এভাবেই তুলে ধরছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
- টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং ব্রহ্মপুত্র-সহ একাধিক নদীর জলস্তর বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ডিব্রুগড়, তিনসুকিয়া, ধেমাজি, লখিমপুর, শিবসাগর, মাজুলি-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জলের তলায়।
- কোথাও বাড়িঘর ডুবে গিয়েছে, কোথাও আবার নদী কেড়ে নিয়েছে গোটা গ্রাম।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গুয়াহাটি: “আমাদের দাদু-ঠাকুর্দারাও এমন বন্যা দেখেননি।” আপার অসমের ভয়াবহ বন্যার ছবি এভাবেই তুলে ধরছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং ব্রহ্মপুত্র-সহ একাধিক নদীর জলস্তর বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ডিব্রুগড়, তিনসুকিয়া, ধেমাজি, লখিমপুর, শিবসাগর, মাজুলি-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জলের তলায়।
কোথাও বাড়িঘর ডুবে গিয়েছে, কোথাও আবার নদী কেড়ে নিয়েছে গোটা গ্রাম। হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ত্রাণশিবিরে। ভয়াবহ এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের কাছে বিশেষ ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্যাকেজের দাবি জানিয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, এবারের বিপর্যয় শুধুমাত্র ফসল বা বাড়িঘরের ক্ষতিতেই আটকে নেই। নদীভাঙনে বহু এলাকায় সম্পূর্ণ গ্রামই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। ফলে শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। নতুন করে বসতি গড়ে তোলা থেকে শুরু করে রাস্তা, বাঁধ, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ পরিকাঠামো পুনর্নির্মাণ—সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন বিপুল অর্থ।
জলের চেয়েও বড় আতঙ্ক ভাঙন
বন্যার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীভাঙন। ব্রহ্মপুত্র ও তার শাখানদীগুলির প্রবল স্রোতে বহু জায়গায় দ্রুত বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ। কোথাও কয়েকশো মিটার জমি রাতারাতি নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। সর্বস্ব হারিয়ে বহু পরিবারকে কার্যত পরনের পোশাকটুকু নিয়েই নিরাপদ জায়গায় পালাতে হয়েছে।
ধেমাজির এক বাসিন্দার কথায়, “আমাদের পূর্বপুরুষরাও এত বড় বন্যার কথা বলেননি। নদী যেভাবে গ্রাম গিলে নিচ্ছে, তা জীবনে কখনও দেখিনি।” তিনসুকিয়া ও ডিব্রুগড় থেকেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সমস্যা আরও জটিল হয়েছে কারণ অনেক পরিবার যে জমিতে বছরের পর বছর বসবাস করতেন, এখন সেই জমিই আর নেই। ফলে বন্যা কমলে তাঁদের পুরনো ঠিকানায় ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগও থাকছে না। প্রশাসনের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই মানুষগুলির স্থায়ী পুনর্বাসন হবে কোথায়?
উদ্ধার-ত্রাণে প্রশাসন
পরিস্থিতি মোকাবিলায় একাধিক এলাকায় ত্রাণশিবির খোলা হয়েছে। নৌকায় করে দুর্গতদের উদ্ধার করা হচ্ছে এবং পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খাবার, পানীয় জল, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী। সেনা, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ)-এর দলও উদ্ধারকাজে নেমেছে।
তবে জল যতটা না সমস্যা, তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কা। বহু মানুষের ঘর, জমি এবং জীবিকা—তিনটিই একসঙ্গে চলে গিয়েছে।
কৃষি ও জীবিকায় বড় ধাক্কা
বন্যার জেরে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি জলের তলায়। ধান, সবজি-সহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়েছে। বহু কৃষক হারিয়েছেন গবাদি পশু। ক্ষতির মুখে পড়েছে মাছচাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় অর্থনীতিও। প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং দ্রুত নদীভাঙনের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করছে বলে মনে করছেন তাঁরা। প্রতি বছর অসমে বন্যা হলেও নদীর গতিপথ এত দ্রুত বদলে যাওয়া এবং একের পর এক বসতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে অসম
ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করছে অসম সরকার। কেন্দ্রীয় দল দ্রুত দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ অনুমোদন করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।
এর মধ্যেই নতুন করে বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। ফলে নদীর জলস্তর আরও বাড়লে আপার অসমের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। প্রশাসনের তরফে মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির উপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখা হচ্ছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



