বাংলাস্ফিয়ার: সংসদের চলতি বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিরোধীদের লাগাতার বিক্ষোভে কাজকর্ম ব্যাহত হলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিল পাস করাতে মরিয়া কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারের লক্ষ্য, বিতর্ক ও অচলাবস্থার মাঝেও বিদেশি অনুদান (নিয়ন্ত্রণ) আইন বা এফসিআরএ (সংশোধন) বিল, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন (সংশোধন) বিল-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন দ্রুত সংসদের অনুমোদন লাভ করুক। সরকারি সূত্রের দাবি, উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত এই বিলগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বুধবার লোকসভা ও রাজ্যসভা—দুই কক্ষেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিরোধীরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনরত ছাত্রদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ, বিশেষ করে পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ তুলে সরকারকে আক্রমণ করে। এর জেরে কার্যত বারবার অধিবেশন মুলতুবি করতে হয়। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের কাজ বিলম্বিত হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবু সরকার আইন প্রণয়নের গতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বুধবার লোকসভায় জনপরীক্ষায় অসাধু উপায় প্রতিরোধ (সংশোধন) বিল, ২০২৬ কণ্ঠভোটে পাস হয়। একই দিনে রাজ্যসভায় হইচইয়ের মধ্যেই জাতীয় সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ (সংশোধন) বিল গৃহীত হয়। এই দুই বিল পাস হওয়াকে সরকার সংসদীয় কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছে।
সরকারি সূত্রের মতে, পরবর্তী পর্যায়ে বিদেশি অনুদান (নিয়ন্ত্রণ) আইন বা এফসিআরএ (সংশোধন) বিল সংসদে উত্থাপন ও পাস করানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও বিলটির বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবে বিদেশি অর্থসাহায্য গ্রহণকারী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, ট্রাস্ট ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের উপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের কাঠামো আরও কার্যকর করার উদ্দেশ্যেই সংশোধন আনা হতে পারে বলে প্রশাসনিক মহলের ধারণা। অতীতে এফসিআরএ আইন নিয়ে সরকার ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মধ্যে একাধিকবার মতবিরোধ দেখা গিয়েছে। ফলে নতুন সংশোধনীও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসতে পারে।
এ ছাড়া জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন (সংশোধন) বিল-ও সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। এই বিলের মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যুর নথিভুক্তিকরণ প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও সমন্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশাসনিক পরিষেবা, নাগরিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে এই তথ্যভান্ডারকে আরও নির্ভুল ও কার্যকর করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, সরকার গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের বিষয় এড়িয়ে বিতর্কিত আইন দ্রুত পাস করাতে চাইছে। কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দল ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এবং সরকারের জবাব দাবি করেছে। তাদের অভিযোগ, আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং সেই বিষয়ে সরকার সংসদকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
বিরোধীদের কৌশল স্পষ্ট—প্রথমে ছাত্র আন্দোলন, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা নিশ্চিত করা, তারপর অন্য আইন প্রণয়নের দিকে এগোনো। কিন্তু সরকার চাইছে নির্ধারিত আইন প্রণয়ন সূচি অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের সংঘাত সংসদের অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রক অবশ্য আশাবাদী যে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের হবে। সরকার বিরোধী দলগুলির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগও বজায় রেখেছে বলে সূত্রের খবর। তবে যদি বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলি পাস করাতে সরকার অধিবেশনের শেষ পর্বে অতিরিক্ত সময় বরাদ্দ বা দীর্ঘ সময় ধরে অধিবেশন চালানোর পথও বিবেচনা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্যতম শর্ত। বিরোধীদের প্রতিবাদ যেমন সংসদীয় গণতন্ত্রের অংশ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে বিশদ আলোচনা ও সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণও সমান জরুরি।
ফলে আগামী কয়েক দিনের অধিবেশন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে। সরকার একদিকে যেমন এফসিআরএ-সহ গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করাতে চাইছে, অন্যদিকে বিরোধীরা ছাত্র আন্দোলন এবং পুলিশি পদক্ষেপের প্রশ্নে সরকারকে চাপে রাখতে বদ্ধপরিকর। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই নির্ধারিত হবে চলতি অধিবেশনের সাফল্য এবং সরকারের আইন প্রণয়নের কর্মসূচির ভবিষ্যৎ।