হাইলাইটস:
- আন্দোলনকারী শেখ ইরশাদ মনসুরির শরীর থেকে অস্ত্রোপচারে ধাতব বিদেশি বস্তু (Metallic Foreign Bodies) বের করার দাবি।
- মেডিকো-লিগ্যাল নথি ও হাসপাতালের চিকিৎসা-রিপোর্টে গুরুতর আঘাতের উল্লেখ।
- দিল্লি পুলিশের আগের অস্বীকারের মধ্যেই নতুন চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
- বিরোধীদের অভিযোগ, প্রতিবাদ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়েছে; নিরাপত্তা বাহিনীর তরফে এখনও বিস্তারিত সরকারি ব্যাখ্যা আসেনি।
বাংলাস্ফিয়ার: যন্তর-মন্তরে ছাত্র-আন্দোলন ঘিরে বিতর্ক আরও গভীর হল। আন্দোলনকারী শেখ ইরশাদ মনসুরির শরীর থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ধাতব বিদেশি বস্তু (Metallic Foreign Bodies) অপসারণ করা হয়েছে বলে মেডিকো-লিগ্যাল রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমস-এর হাতে আসা চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, তাঁর শরীরে এমন একাধিক ধাতব কণা বা বস্তু ছিল, যা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বের করতে হয়েছে।
এই নতুন তথ্য সামনে আসার পর প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। এতদিন দিল্লি পুলিশ দাবি করে আসছিল, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পেলেট গান ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু হাসপাতালের রিপোর্ট, মেডিকো-লিগ্যাল নথি এবং পরে প্রকাশ্যে আসা পুলিশ ডায়েরির তথ্য সেই দাবির সঙ্গে স্পষ্ট অসঙ্গতি তৈরি করছে।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ ইরশাদ মনসুরি ২০ জুলাইয়ের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, কনট প্লেস সংলগ্ন এলাকায় প্রথমে কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটার পর তিনি কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না। সেই অবস্থাতেই মুখ, গলা এবং বুকে প্রচণ্ড আঘাত অনুভব করেন। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।
চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর শরীর থেকে ধাতব বিদেশি বস্তু অপসারণ করা হয়েছে। এই বস্তুর প্রকৃতি কী, তা নিয়ে এখনও সরকারি ফরেন্সিক ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়নি। তবে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ এবং অস্ত্রোপচারের বিবরণ আন্দোলনকারীদের অভিযোগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এর আগে আরও কয়েকজন আহত আন্দোলনকারীর মেডিকো-লিগ্যাল রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসে। এক সাংবাদিকের রিপোর্টে “পেলেট আঘাতের চিহ্ন” এবং “পেলেট বন্দুকের আঘাত” সংক্রান্ত উল্লেখ ছিল। আরেক আহত মহিলা আন্দোলনকারীর রিপোর্টে “সন্দেহজনক গুলিবিদ্ধ আঘাত”-এর কথাও লেখা হয়েছিল। এসব নথি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার দৈনিক ডায়েরির একটি নথি প্রকাশ্যে আসে। সেই নথি অনুযায়ী, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF) ঘটনাস্থলে কাঁদানে গ্যাস, বিভিন্ন ধরনের শেল এবং অ্যান্টি-রায়ট গান থেকে দুই দফা প্লাস্টিক পেলেট নিক্ষেপ করেছিল। ওই ডায়েরিতে অভিযান চলাকালীন ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিবরণও নথিভুক্ত রয়েছে।
যদিও সরকারি সূত্রের একাংশ দাবি করেছে, অ্যান্টি-রায়ট গানে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পেলেট সাধারণ ধাতব পেলেটের মতো নয় এবং সেগুলি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর। কিন্তু আহতদের চিকিৎসা-রিপোর্টে ধাতব বিদেশি বস্তু অপসারণের উল্লেখ থাকায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, আহতদের শরীরে যে বস্তু পাওয়া গিয়েছে তার উৎস কী। এই প্রশ্নের এখনও স্পষ্ট সরকারি উত্তর মেলেনি।
এদিকে সিআরপিএফ সদর দপ্তর ইতিমধ্যেই ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের তরফে কী পরিস্থিতিতে বলপ্রয়োগ করা হয়েছিল, আদৌ পেলেট ব্যবহার করা হয়েছিল কি না এবং হলে কেন, সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার জেরে বিষয়টি আদালতের দোরগোড়াতেও পৌঁছেছে। প্রাক্তন আইপিএস অফিসার যশোবর্ধন আজাদ এবং কয়েকজন আহত আন্দোলনকারী সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়ে জনতা নিয়ন্ত্রণে ধাতব বা আংশিক ধাতব পেলেট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার দাবি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, এ ধরনের অস্ত্র গুরুতর শারীরিক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মোকাবিলায় এর ব্যবহার মানবাধিকারবিরোধী।
সংসদেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে। বিরোধীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের জবাব দাবি করেছেন এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনাটি নিয়ে প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হবে।
শেখ ইরশাদ মনসুরির চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিতে ধাতব বিদেশি বস্তু অপসারণের উল্লেখ সামনে আসায় পুরো ঘটনার তদন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ একদিকে সরকারি বক্তব্যে প্লাস্টিক পেলেট ব্যবহারের কথা বলা হলেও, অন্যদিকে চিকিৎসা-রিপোর্টে ধাতব বস্তুর উপস্থিতির উল্লেখ নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। এই অসঙ্গতির ব্যাখ্যা কী, তা নির্ভর করবে ফরেন্সিক পরীক্ষা, তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার চূড়ান্ত রিপোর্টের উপর।