Home International হরমুজে আটকে জাহাজ, সমুদ্রে ‘সুপার-স্প্রেডার’ আতঙ্ক!

হরমুজে আটকে জাহাজ, সমুদ্রে ‘সুপার-স্প্রেডার’ আতঙ্ক!

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
15 views 3 minutes read
A+A-
Reset

দুবাই: যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে মাসের পর মাস আটকে থাকা হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ এবার শুধু অর্থনীতি বা বাণিজ্যের জন্যই নয়, বিশ্বের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন স্থির হয়ে থাকা জাহাজের তলায় তৈরি হওয়া সামুদ্রিক জীবের আস্তরণ বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে পৌঁছে ছড়িয়ে দিতে পারে আক্রমণাত্মক বিদেশি প্রজাতি বা ইনভেসিভ স্পিসিজ

গবেষকদের মতে, পরিস্থিতি এতটাই অস্বাভাবিক যে এটিকে ইতিমধ্যেই ‘সামুদ্রিক জীব-আক্রমণের সুপার-স্প্রেডার ঘটনা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মাসের পর মাস নোঙর, জাহাজের তলায় তৈরি ‘নতুন দুনিয়া’

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যিক চলাচল কার্যত থমকে যায়। এরপর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে ১,৫০০-রও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সাধারণত কোনও জাহাজ বন্দরে এক থেকে তিন দিনের বেশি নোঙর করে না। ফলে জাহাজের পানির নিচের অংশে সামুদ্রিক জীবের বড় কলোনি তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে না।

এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।

মাসের পর মাস একই জায়গায় স্থির থাকায় জাহাজের তলায় অণুজীব, শৈবাল, বার্নাকল, ঝিনুক এবং বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণী জমে তৈরি হয়েছে ঘন জীবসমাজ। জাহাজগুলি ফের আন্তর্জাতিক জলপথে চলতে শুরু করলেই সেই জীবেরা পৌঁছে যেতে পারে বিশ্বের নানা প্রান্তের বন্দরে।

‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বলছেন বিজ্ঞানী

গবেষণার প্রধান লেখক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক মারিও তামবুরি পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন।

তাঁর মতে, এত বড় সংখ্যক জাহাজের এত দীর্ঘ সময় ধরে এক জায়গায় আটকে থাকা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য একেবারে ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ তৈরি করেছে।

গবেষণাপত্রেও এই ঘটনাকে সামুদ্রিক জীবের আক্রমণাত্মক বিস্তারের সম্ভাব্য ‘সুপার-স্প্রেডার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, অতীতে এত বিপুল সংখ্যক জাহাজ এত দীর্ঘ সময় একই এলাকায় আটকে থাকার নজির কার্যত নেই।

নতুন বন্দরে পৌঁছে বিপদ বাড়াবে কারা?

জাহাজের তলায় জন্মানো বার্নাকল, শৈবাল, ঝিনুক এবং অন্যান্য প্রাণী যখন নতুন কোনও বন্দরে পৌঁছবে, তখন তারা স্থানীয় প্রজাতির সঙ্গে খাদ্য ও জায়গার জন্য প্রতিযোগিতায় নামতে পারে।

ফল হতে পারে ভয়াবহ—

  • স্থানীয় সামুদ্রিক প্রজাতির সংখ্যা কমে যেতে পারে
  • রোগ ও পরজীবী ছড়াতে পারে
  • কোনও কোনও স্থানীয় প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে পড়তে পারে
  • মৎস্যসম্পদের ক্ষতি হতে পারে
  • সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে

শুধু পরিবেশ নয়, এর সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। আক্রমণাত্মক প্রজাতি মৎস্যশিল্পের ক্ষতি করার পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের শীতলীকরণ ব্যবস্থাতেও সমস্যা তৈরি করতে পারে। এগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতেও বিপুল অর্থ খরচ হয়।

ভারত-সিঙ্গাপুরও কি ঝুঁকিতে?

গবেষকদের মতে, পারস্য উপসাগর ইতিমধ্যেই সামুদ্রিক বিদেশি প্রজাতি ছড়ানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। অতীতে বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে বহু বিদেশি প্রজাতি এই অঞ্চলে ঢোকার প্রমাণ মিলেছে।

আর উপসাগরের উষ্ণ ও লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকা জীবগুলি কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত। ফলে নতুন পরিবেশেও তাদের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই কারণেই ভারত ও সিঙ্গাপুরের মতো উপসাগরের কাছাকাছি জলবায়ু ও লবণাক্ততার বৈশিষ্ট্য থাকা বন্দরগুলিকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুধু জাহাজের গায়ে নয়, বিপদ ব্যালাস্ট জলেও

সমস্যা শুধু জাহাজের তলায় জন্মানো জীবেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকদের আশঙ্কা, এতদিনে প্রতিটি জাহাজ থেকে উপসাগরের জলে লক্ষ লক্ষ লার্ভা ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে।

এছাড়া জাহাজের ব্যালাস্ট জল, পরজীবী এবং রোগজীবাণুও এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে একটি জাহাজই কার্যত হয়ে উঠতে পারে সামুদ্রিক জীবের আন্তর্জাতিক ‘পরিবহণ ব্যবস্থা’।

জাহাজ ছাড়ার আগেই পরিষ্কার করার পরামর্শ

বিজ্ঞানীদের পরামর্শ, হরমুজ প্রণালি ছাড়ার আগে জাহাজগুলির পানির নিচের অংশ যতটা সম্ভব পরীক্ষা ও পরিষ্কার করা উচিত। যে বন্দরগুলিতে এই জাহাজগুলি পৌঁছবে, সেখানেও বিদেশি প্রজাতি শনাক্ত করার জন্য নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা বা IMO-ও স্বীকার করেছে, জাহাজের গায়ে জন্মানো সামুদ্রিক জীব বিদেশি প্রজাতি ছড়ানোর অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এই ঝুঁকি কমাতে আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্যতামূলক বিধি তৈরির কাজও চলছে।

যুদ্ধের আরেক অদৃশ্য ক্ষত

প্রবাল প্রাচীর, সামুদ্রিক ঘাসের তৃণভূমি এবং ঝিনুকের প্রাকৃতিক আবাস—বিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ই অবশ্যই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। কিন্তু হরমুজের এই ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধের ক্ষতি শুধু মানুষ ও অর্থনীতিতে থেমে থাকে না—তার ঢেউ সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রেও পৌঁছতে পারে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles